মিষ্টিজর্দার পান

গরম যে পরিমানে পড়েছে তাতে মনে হচ্ছে আকাশে সূর্য একটা না তিনটা।এই গরমের মধ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার কথা মনে হলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।সামনে সেমিস্টার ফাইনাল কিন্তু প্রচণ্ড গরমের কারনে হিমেল ইউনিভার্সিটি না গিয়ে বাসাতে থাকার সিধান্ত নিলো।বাসাতে থাকলে গরম থেকে রেহাই পেলেও মার থেকে রেহাই পাওয়া কঠিন।এতো বড় হওয়ার পরও মা ভার্সিটিতে না গেলে স্কুলের বাচ্চাদের মতো
বকাঝকা করে এবং সেই বকাঝকার প্রখরতা প্রায় সূর্যের প্রখরতার সমতুল্য।হিমেল অবশ্য কিছুদিন আগে মানুষের অপ্রয়োজনীয় কথা না শুনার একটা কার্যকরী উপায় বের করেছে।যখন কারও কথা শুনতে ইচ্ছা করে না হিমেল তখন জটিল কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করে,চিন্তাটা এতো গভীরভাবে করে যে সামনের মানুষ কি বলছে সেটা টার কানে যায়না।সবসময় যে জটিল বিষয়ে চিন্তা করে তা না।মাঝেমাঝে অবশ্য নিশিকে নিয়েও চিন্তা করে।নিশি হিমেলের বাবার বন্ধুর মেয়ে।নিশি সামনে এলে হিমেলের হার্টবিট বেড়ে যায়,নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় শুধু নিশি না হিমেল যদি নিশির বাড়ির আশেপাশে ও যায় তখনও একই অবস্থাহয়।হিমেল প্রায়ই খুব সুক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো না কোনো কারন তৈরি করে নিশির বাসায় যাওয়ারজন্য।হিমেল একজন পাকা অভিনেতা তার অভিনয় প্রতিভার গুনে নিশি এসবের কিছুই জানে না।নিশির সামনে সে এমন আচারন করে যেনো নিশিকে সে দুই চোখে দেখতে পারে না।নিশির একটা গেঁজদাত আছে,হাসলে তাকে কি যে অদ্ভুত সুন্দর লাগে।নিশির হাসির শব্দে হিমেলের বুকের ভিতরের হাড়গুলো পিয়ানোর মতো বাজতে থাকে।হিমেল ভয়ে থাকে কখন যে সেই পিয়ানোর সুর বাইরে চলে আসে অথচ হিমেল নিশিকে বলেছে হাসলে নিশিকে vampire এর মতো লাগে তাই নিশি যেন কম হাসে।মাঝেমাঝে হিমেল নিজের অভিনয় প্রতিভায় নিজেই এতো মুগ্ধ হয় যে অভিনয় জগতে career  করার চিন্তা করে নিছক অভিনেতারদের জন্য competition  তৈরি করতে চায় না বলেই আর সে দিকে আগানো হয় না।

বাসায় থাকলে আরেকটা সমস্যা হলো সময় কাটানো, ভার্সিটিতে থাকলে ক্লাস আর আড্ডা দিয়ে কখন যে সময় চলে যায় টের পাওয়া যায় না।বাসায় টিভি দেখার ও কোনো সুযোগ নাই,টিভি আগে থাকতো মা আর বীথি হিমেলের ছোট বোনের দখলে এখন থাকে পাশের ফ্ল্যাটের পিচ্চি শুভর দখলে।মায়ের আস্কারা পেয়ে পিচ্চি নিজের বাসা রেখে সারাদিনই এই বাসাতে বসেবসে  ডোরেমনকার্টুন দেখে।এতো ছোট বাচ্চা যে কি করে এতো দুষ্ট হতে পারে হিমেল ভেবেই পায় না।

পিচ্চিটা কার্টুন দেখেই সন্তুষ্ট থাকেনি,হিমেলের রুমের প্রতি তার প্রবলটান,সেই টানের ফলস্বরূপ হিমেলকে কিবোর্ড এর S এবং P হারাতে হয়েছে।হিমেল বাথরুমথেকে এসে যখন দেখলো পিচ্চি হিমেলের পিসি এর বারোটা বাজাচ্ছে হিমেল তখন কিছুই করেনি শুধু আস্তে করে একটা ধমক দি্যেছে,এতেই পিচ্চি এমন কান্না শুরু করে দিলো যেনো হিমেল তার হাত থেকে ললিপপ ছিনিয়ে নিয়েছি।কান্না শুনে হিমেলের মা আর পিচ্চি শুভর মা দৌড়ে হিমেলের রুমের চলে এলো।হিমেল তখন একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরলো।পিচ্চিকে শান্ত করার চেষ্টা করলো কিন্তু পিচ্চি তো কান্না থামালোই না বরং উল্টো বলতে লাগলো ভায়া(ভাইয়া)বেতাো(বেথা)দিতে(দিছে)।মানীর মান আল্লাহ রাখে একথার প্রমান হিমেল সেইদিন হাতেনাতে পেয়েছে।হিমেলের মা শুভর কথা বিশ্বাস করলেও শুভর মা শুভর কথা বিশ্বাস করেনি।পিচ্চিটার জন্য আজকে বাসাতে থাকার পরও পিসি রেখে মোবাইলে ফেসবুকে ঢুকতে হচ্ছে।অবশ্য মোবাইলের কারনে শুয়েশুয়ে ফেসবুকে চ্যাট করা যাচ্ছে এটাও খারাপ না।

সারাদিন শুয়ে বসে ফেসবুকে আড্ডা দিয়ে বেশ ভালোভাবে কাটছিলো দিনটা কিন্তু সুখ ক্ষণস্থায়ীএকথাটা প্রমান করার জন্যই মনে হয় মা বিকালে হিমেলের রুমে প্রবেশ করলো।

দোকানে যা তো একটু

অসম্ভব!!!আমাকে মেরেফেললেও আমি এই গরমের মধ্যে বাইরে যেতে পারবো না মা

বেশী কিছু না শুধু পোলাউয়ের চাল আনতে হবে

পোলাউয়ের চাল কেনো?বাসায় কি মেহমান আসবে নাকি?যেই আসুক না কেনো আজকে কিন্তু আমি  আমার রুম ছেড়ে ড্রয়িংরুমে আসবো না বলে দিচ্ছি

আমি কি শুধু মেহমান আসলেই পোলাউ রান্না করি?মেহমান ছাড়া কি তোরা মোরগ-পোলাউ খাস না?

খাবো না কেনো, তোমারতো সাপ্তাহিক মেনুলিস্ট আছে,তোমার সাপ্তাহিক মেনুলিস্ট অনুযায়ী আজ তো পোলাউ রান্না হওয়ার কথা না মা। মেহমান ছাড়া তোমার মেনুলিস্ট পাল্টায় না।কথাগুলো বলতে বলতে হিমেল ঠোট উল্টায়।

তোর সাথে এতো কথা বলার সময় নাই আমার।এইনে টাকা তারাতারি দোকানে যা।কোনো একটা কাজ করতে বললে হাজারটা কথা বলতে হয়।মা আর কথা বাড়ালো না হিমেলের রুম থেকে চলে গেলো।

আজ যে হিমেল ভার্সিটিতে যায়নি মা মনে হয় সেটা খেয়াল করেনি,করলে খবর ছিলো আজকে।তবে খেয়াল না করার কারনটা হিমেল ধরতে পারছে না।মারা স্বাভাবিক ভাবেই বিচক্ষণ হয়ে থাকে আর হিমেলের মা একটু বেশিই বিচক্ষণ,সংসারে কথায় কি হচ্ছে,ছেলেমেয়ে কে কি করছে কিছুই বাদ যায় না তাঁর চোখ থেকে। বাবার সীমিত আয় দিয়ে সংসার খরচ,হিমেল আর বীথির পাড়াশুনার খরচ তাদের নিত্যনতুন আবদার কি করে যে সামলায় একমাত্র মাই যানে।কমখরচে কীভাবে সুন্দর করে সংসার চালানো যায় এমন যদি কোনো প্রতিযোগিতা থাকতো তাহলে হিমেলের মা–ই প্রথম হতো এব্যাপারে হিমেল শতভাগ বিশ্বাসী।

দোকান থেকে ফিরে হিমেল যা দেখলো তাতে মেজাজ ঠিক রাখাটা সত্যি কঠিন হয়ে গেলো।গতকাল রাতে শরীরের ঘাম ঝরিয়ে যে শার্ট ইস্ত্রিকরে রেখেছিলো আজ ভার্সিটিতে যাওয়ায় জন্য।ভার্সিটিতে না যাওয়াতে সকালে শার্টটা বের করেও আর পরা হয়নি,খাটের উপর রাখা ছিলো শার্টটা।সেই শার্টের এক হাত দিয়ে পিচ্চি শুভ তার খেলনা গাড়িটাকে বাঁধছে আর শার্টের আরেক হাত সোফার পায়ার সাথে বেঁধে খেলা করছে।মনে হচ্ছে ওইটা গাড়ি না গরু।হিমেলকে দেখে শুভ দৌড়ে গিয়ে হিমেলের মায়ের পিছনে লুকালো...

মা এই পিচ্চি সারাদিন আমাদের বাসাতে থাকে কেনো?ওর বাপ মা নাই নাকি আমাদের বাসাটা Day care center ?

ফালতু কথা বলবি না।ছোট মানুষ একটু আকটু দুষ্টামি তো করবেই।তোরাও ছোট বেলাতে এরকম হাজার দুষ্টামি করছিস

করছি নিজের বাসাতে আরেকজনের বাসায় গিয়ে করিনি মা

এতো বসা বাসা করিস না।সারাদিন কতক্ষণ বাসাতে থাকিস তোরা?সারাটা দিনতো আমি বাসাতে একলাই থাকি।আর বাসাতে থাকলেও আমার সাথে সময় কাটানোর সময় তোদের কই?শুভ থাকলে হৈচৈ করে,দুষ্টামি করে কিন্তু আমার একজন সঙ্গী তো হয়...

মার কথা শুনে হিমেলের রাগে কিছুটা ভাটা পরল।মার কথা সত্য বাবা সকালে অফিস চলে যায় আর ফিরে সন্ধ্যায়।হিমেল আর বীথিও সকালে চলে যায় যে যার ভার্সিটি আর কলেজে,ফিরতে ফিরতে সেই বিকাল বা সন্ধ্যা।বাসায় ফিরারা পরও তো যে যার কাজ নিয়ে বেস্ত।ছেলেমেয়রা বড় হলে মারা আসলেই একা হয়ে যায়।হিমেল তার এই ভাবান্তর কথায় প্রকাশ করলো না পাকা অভিনেতনা বলে কথা।হিমেল তার কথায় যথেষ্ট বিরক্তি মিশিয়ে মাকে বলে দিল;শুভ সারাদিন এবাসাতে থাকুক আর দরকার হলে শুভকে পালক নিয়েনিক কিন্তু শুভ যদি হিমেলের কিছু নষ্ট করে তাহলে হিমেল শুভকে একটা আছাড় দিবে আর কিছু না।

রাত পৌনে ১১টা বাজে।বসাথেকে বের হবেনা হবেনা বললেও সন্ধ্যায় হিমেলকে বসাথেকে বের হতে হল।হিমেল একটা মাত্র দিন ঘর থেকে বের হয়নি তাতই অপদার্থ পোলাপানগুলা এলাকাতে একটা ঝামেলা পাকায়ে ফেললো।হিমেল না থাকলে এই এলাকা আর পোলাপানগুলার যে কি হবে আল্লাহ মাবুদই যানে।ঝামেলাটা মিটাতেমিটাতে কখন যে এতোটা সময় হয়ে গেলো হিমেল টেরই পেলো না।উফ আরও আগে ফিরা উচিত ছিল।এলাকার ঝামেলা মিটাতে গিয়ে মনে হচ্ছে আজ নিজের ঘরেই একটা ঝামেলা লেগে যাবে

হিমেল মুখস্ত করা সমস্ত দোয়া দুরুদ পড়তে পড়তে বাসার কলিংবেলে চাপ দিলো।কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল।দরজার ওপাশে খান সাহেব মানে হিমেলের বাবা মাজাহার খান দাড়িয়ে আছেন।দরজা খুলে খান সাহেব ভিতরে চলে গেলেন।আজ অন্যদিনের মতো শুভেচ্ছামূলক কোন বানী শুনালেন না।আজ মনে হয় খান সাহেবের মুড ভাল।হিমেল আর তার বাবার সম্পর্ক অনেকটা সরকারি দল আর বিরোধী দলের মতো।বাবার ছকে বাঁধা জীবনযাত্রা হিমেলের পছন্দ না আর হিমেলের জীবনযাত্রা তার বাবার পছন্দ না।হিমেল মাঝেমাঝে কৌতুক করে আড়ালে-আবডালে বাবাকে খান সাহেব বলে ডাকে।

খাবার টেবিলে গিয়ে হিমেল কিছুটা অবাক হল।খান সাহেব সাধারনত রাত নটার মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে নেন কেউ তখন খাক আর না খাক।আজ এখনও খায়নি।খবারের মেনুও শুধু মোরগ পোলাওতে সিমাবদ্ধ থাকেনি সেটা যথেষ্ট দীর্ঘ হয়েছে।আজ কি বিশেষ কোন দিন?না তেমন তো কিছু মনে পরছে না হিমেলের।ধুর এতো কিছু ভেবে কি লাভ? খাবার দেখে মনে হচ্ছে রান্না খুব ভালো হয়েছে হিমেল খাওয়াতে মন দিলো।

খাবার কিছুপরে হিমেল তার মোবাইলের চার্জারটা খুঁজছে।চার্জার হিমেলের রুমেই ছিল হিমেলের পক্কা মনে আছে।কিন্তু এখন আর সেটাকে পাওয়া যাচ্ছে না।এটা শুভর কাজ আর কারও না।পিচ্চিটা নিশ্চিত চার্জার টা অন্য কারও রুমে নিয়ে রেখেদিছে নয়তো ভেঙ্গে ফেলছে।হিমেল যখন এ রুম থেকে ওই রুমে চার্জার খুঁজাখুঁজি করছে তখনি শুনতে পেলো বাবা মাকে হিমেলের মা না ডেকে আজ নাম ধরে ডাকছে,রেহানা বলে ডাকছে।বড় হওয়ার পর মনে হয় হিমেল এই প্রথম বাবাকে মার নাম ধরে ডাকতে শুনলো।আজ কি বাবা মায়ের বিশেষ কোনোদিন?হবে হ্য়তো।মায়ের স্পেশাল রান্না,বাবার মাকে নাম ধরে ডাকা এসবতো তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে।ভাবতে ভাবতে হিমেল কখন যে মায়ের রুম এ চলে এলো টেরই পেলো না।দরজায় ধাক্কা খেয়ে টের পেলো।নাহ মায়ের রুমেও চার্জারটা নেই।হঠাৎ হিমেলের নজর পরল মায়ের ড্রেসিং টেবিলের উপর।ড্রেসিং টেবিলের উপরে একটা পিরিচে দুখিলি পান রাখা আছে। পানের কাছে না গিয়ে ও হিমেল বুঝতে পারল ওইটা মিষ্টিজর্দার পান।অনেক আগে প্রায় ছোট বেলাতে হিমেল দেখেছিলো বাবা মাকে একদিন মিষ্টিজর্দার পান এনে দিয়েছিলো আর মা পানটা এমন ভাবে নিয়েছিলো যেন কাগজে মোড়ানো পান না মা কাগজে মোড়ানো কোহিনূর হীরা নিচ্ছে।মা বা বাবা কেউই পান খান না তবে এই পানের রহস্য কি?পান কি খান সাহেবের  কোনো code language?খান সাহেব প্রায়ই চায়ে চুমুক দিয়ে চিল্লাচিল্লি করতে থাকেন চায়ে চিনি হয়নি কিন্তু মা যখন ওই কাপেই একটা চুমুক দিয়ে বলেন যে কই চিনি তো ঠিকই আছে তখন খান সাহেব কোন টুশব্দ না করে ওই চাটুকু-ই খান।অভিনয় প্রতিভা হিমেল মনে হয় বাবার কাছ থেকেই পেয়েছে।খান সাহবের অভিনয় ও খারাপ না।খান সাহেব কে হিমেলের যোগ্য বাবাই বলা যায়।

আচ্ছা নিশির জন্য একদিন মিষ্টিজর্দার পান নিয়ে গেলে কেমন হয়??? নিশি গাধীটা কি বুঝবে মিষ্টিজর্দার পান একটা code language???

 

ভোট: 
Average: 7.3 (3 votes)

মন্তব্যসমূহ

আকঞ্জী নিজাম এর ছবি

বেশ ভালো লেগেছে। কিছু টাইপো বা বানান বিভ্রাট আছে আর একবার পড়ে ঠিক করে দিলে ভালো হয়।