লোপচিহ্ন

Nuzmus Sadat Sompod এর ছবি

আজ অনেকদিন পর ঢাকায় আসলাম।

সবকিছু ঠিক থাকলে আমি ঢাকায় স্থায়ী হয়ে যেতাম। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন একটি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আমি। তৃতীয় বর্ষ হতে পারত যদি না আমি এক বছর গ্যাপ দিতাম। গ্যাপ যে দিতে হবে এটাও কখনও আমি চিন্তা করিনি।

মোটামুটি ধনী ঘরের ছেলে ছিলাম আমি। আমার বাবার নাম জহিরুল ইসলাম। আমার যে দাদা সে ছিল ব্রিটিশ আমলের এক জমিদারের নায়েব। সূর্যাস্ত আইনে যখন সে তার জমিদারি খোয়াল, তখন আমার দাদা নিলামে সে জমিদারি কিনে নেয়। কিন্তু জমিদারি কিনে নেওয়ার পরও লোকজন নায়েবকে জমিদারের সম্মান দিতে চায়নি। তাই আমার দাদা জমিদারি কিনে নিয়েও জমিদার হতে পারলেন না।

দাদার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে বাবা অনেক সম্পত্তি পেয়েছিলেন। আমার বাবা দুই বিবাহ করেছিলেন। আমার যে বড়মা সে অত্যন্ত রূপবতী ছিলেন। অত্যন্ত সৌন্দর্যের কারণেই হোক আর অন্য কারণে হোক আমার বড়মা ছিলেন বাচা মেয়ে মানুষ। তার কোন সন্তান ছিলনা। অনেক চেষ্টা করেও যখন বড়মার সন্তান হচ্ছিল না তখন বড়মার উপদেশে বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। আমার যখন ছয় বছর তখন আমার বড়মা মারা যান। তারপর থেকেই বাবা কেন যেন মাকে পছন্দ করতে পারছিলেন না। আমি ঢাকা আসার এক বছর পর বাবা মাকে তালাক দিলেন।

তখন আমি পড়লাম সমস্যায়। হয় মায়ের সাথে থাকতে হবে নাই বাবার সাথে থাকতে হবে। বাবা অনেক ক্ষমতাবান মানুষ তার আমাকে না হলেও চলবে। কিন্তু মা একা অসহায় মেয়ে মানুষ। তাই আমি মায়ের সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। মায়ের সাথে নানাবাড়ি থাকতে লাগলাম। আমার নানাবাড়িতে নানী একলা থাকে। মামারা সব দেশের বাইরে থাকেন। মায়ের একটা জিদ ছিল সে বাবার থেকে কোন খরচ নেবেন না। এমনকি আমি বাবার সাথে থাকলে আমিও বাবার থেকে কোন খরচ নিতে পারব না। তাই আমার ঢাকায় পড়াশোনার সাময়িক ইতি ঘটেছিল।

আমাদের ম্যাচ ম্যানেজার রাকিব ভাইকে বলে রেখেছিলাম যদি কোন ব্যবস্থা করতে পারেন তাহলে আমাকে খবর দেবেন। গত সপ্তাহে রাকিব ভাই খবর দিয়েছেন আজ আমি চলে এসেছি। রাকিব ভাই খুবই ভাল মানুষ। আমি এসে দেখলাম আমার জন্য একটা সিটও খালি রেখেছেন। তাকে এ কথা জিজ্ঞেস করতেই বলল, 'আমি সিট খালি রাখিনি। খালি হয়েছে তারপর তোমাকে খবর দিয়েছি। টিউশনি তো দুইমাস ধরেই হাতে ছিল। কিন্তু অন্য ম্যাচে কিভাবে উঠবে, তোমার তো অগ্রিম দেওয়ার মত টাকা নাই। হাতমুখ ধুয়ে আসার পরই হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'যাও নাস্তা করে আস। তোমার জন্য মিলের ব্যবস্থা করিনি। আমার গেস্ট মিল সব শেষ। এই ভাঙ্গা মাসে আর তোমার মিল দেওয়া সম্ভব না। আমি অফিসে যাব ফিরতে রাত হবে। তুমি বিকেল চারটায় এই ঠিকানায় যাবে। দুটি বাচ্চা পড়াতে হবে। একবার তোমার কলেজের খবর নিও।

এখন সময় তিনটা বেজে চুয়ান্ন মিনিট। আমি রাকিব ভাইয়ের দেওয়া ঠিকানার বাসার সামনে দাড়িয়ে আছি। এ পর্যন্ত দুইবার কলিং-বেল চেপেছি। এতক্ষণ খুলে যাওয়ার কথা কিন্তু এখনও দরজা বন্ধ। কলিং-বেল মনে হয় নষ্ট। কিন্তু তৃতীয় বার বেল চাপার সাথে সাথে দরজা খুলে দিল একটা মহিলা। মুখে এক রাশ বিরক্তি নিয়ে বলল আপনি কে,কাকে চান?

উত্তরে যখন আমি আমতা -আমতা করছি তখন একটা পৌঢ় মহিলা এসে বলল,'আজকে রুনু-টুনুকে নতুন স্যার পড়াতে আসার কথা। ইনি মনে হয় নতুন স্যার। আসেন ভেতরে আসেন।

এখানে আমার যে দুজন ছাত্র তারা খুব পড়ুয়া। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তারা কিছুই মনে রাখতে পারেনা। সেইজন্যে প্রত্যেক মাসে মাসে তাদের শিক্ষক পাল্টাতে হয় কিন্তু পরিবর্তন কিছুই হয় না। সমস্যা যেখানে সেখানে মেরামত না করে অন্য জায়গায় মেরামত করলে পরিবর্তন হওয়া সম্ভবও না। আমি বুঝতে পারলাম এ টিউশনির ভাগ্য আমার বেশিদিনের না, নতুন একটা খুঁজতে হবে।

মেসে এসে শুনলাম, একটা লোক আমার খোঁজে এসেছিল। আমি মোটামুটি অবাক হলাম। কারণ ঢাকায় আমাকে মেসে খোঁজ করার মত মানুষ আছে বলে আমার জানা নাই। লোকটা আবার কাল আসবে। আমাকে মেসে থাকতে বলেছে। এমনিতেই জার্নির ধকল ছিল তাই অল্পেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

রাতে ভাল ঘুম হয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, চেয়ারে কে যেন বসে আছে। আমি আর রাকিব ভাই এক রুমে থাকি,যে লোকটা চেয়ারে বসে আছে সে রাকিব ভাই নয়। লোকটা কে হতে পারে এটা চিন্তা করতে করতে আমি আড়মোড়া ভাঙ্গছি। এমন সময় লোকটা বলল,'আসামিদের তোমার ঘুম ভেঙ্গেছে তাহলে। বাজে কত জান, আমি প্রায় আধঘণ্টা বসে আছি।

লোকটা কে বুঝতে পেরে আমি সত্যিই অবাক হলাম। এতো দেখছি ছোটমামা। ছোটমামা মানে আমার বড়মার ছোট ভাই। আমাদের বাড়িতে থাকে। তাকে দেখে অবাক হওয়ার পেছনে দুইটা কারণ আছে। প্রথমত, তার থাকার কথা আমাদের গ্রামে। আমার বোঝার ক্ষমতা হওয়ার পর থেকে তাকে কখনও আমাদের গ্রামের বাহির হতে দেখিনি। দ্বিতীয়ত,আমি এখানে থাকি সেটা তার জানার কথা না।

ছোটমামা এখানে আসার এবং আমি এখানে থাকি সেটা কারণ সংক্ষেপে এরকম।

গত দুই মাস যাবত বাবার শরীরের অবস্থা ভাল না। ডাক্তার দেখানোর জন্য প্রায়ই ঢাকায় আসতে হয়। তাই বাবা এখানে ছোট একটা বাসা ভাড়া করেছেন। বাবা এখানে থাকেন তাই মামাও এখানে থাকেন। বাবার অসুখ হওয়ার কারণে তার মন কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই সে আমাকে দেখতে চেয়েছেন। সেজন্য মামা আমার বর্তমান ঠিকানা খুঁজে বের করেছে।।

মামা আমাকে বলল, 'চল দুলাভাই তোমার সাথে কথা বলবেন।

আমি মামার সাথে বেরিয়ে পড়লাম। ভাবলাম অসুস্থ মানুষ তার সাথে দেখা না করার কোন মানেই হয়না। তাছাড়া মা তার থেকে সাহায্য নিতে বারণ করেছেন। দেখা করা সম্পর্কে তো কিছু বলেননি।

বাবার চেহারা দেখেই তার শরীরের অবস্থা আন্দাজ করা যায়। খাটের সাথে ঠেস দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে আছেন৷ আমাকে বলল,'সামিদ ভাল আছ?

-হ্যাঁ ভাল আছি আপনার শরীরের অবস্থা কেমন?

-শরীরের অবস্থা জিজ্ঞেস কর ক্যান? তুমি দেখতে পারতেছ না।

আমি বুঝতে পারলাম অসুখের পরও বাবা বদমেজাজ নামক মানসিক অসুখ থেকে মুক্তি পায়নি।

আমি কিছু বলার আগেই বাবা আবার শুরু করলেন, 'তুমি রোজ আইস্যা আমার সাথে দেখা কইরা যাবা। তোমার মা অতি বদ মানুষ, সে জানলে আসতে দিবে না। তারে জানতে দিবা না।

-আচ্ছা আমি আসব। -তোমার মা অতি বদ মেয়ে-লোক, কিন্তু তালাক দেওয়া ঠিক হয় নাই। সে তালাক পাওয়ার মত কিছু করে নাই। আমি ঠিক করছি তাকে আবার ফিরাইয়া আনব। অতি বদ মেয়ে-লোক মনে হয় না আসবে।

-হুম,আমারও তাই মনে হয় তবে চেষ্টা করেন।

-তোমার থাইক্যা উপদেশ চায় নাই। এহন যাও কাল আসবা। বেশিক্ষণ কথা বলতে মন চায় না।

বাবার থেকে এরকম ব্যাবহার আশা করায় উচিত।

ছোটমামা ঘর থেকে বাইরে এসেই বলল,'চল সামিদে দুপুর হয়ে গেছে কিছু খাওয়াও। তোমার বাবা দুই বেলা খান, তাই আমিও দুই বেলা খাই। কিন্তু আজ কেমন যেন ক্ষুধা লাগতেছে।

ছোটমামার এরূপ আবদার অস্বাভাবিক না। ছোটমামার সাথে আমার বয়সের পার্থক্য অনেক হলেও তার সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কিন্তু আমার পকেট যে শূন্য মামার তা জানার কথা না।

- মামা এম্পটি পকেট নিয়ে ঢাকায় আসছি। আপনাকে তো খাওয়াতে পারবনা।

-হুম,আমিও এরকম ধারনা করেছিলাম।তবে এখন তুমি মোটামুটি সাত -আট হাজার টাকার মালিক,তোমার আব্বা তোমাকে দিয়েছেন।

এখন আমি একটা সিনেমা হলে বসে সিনেমা দেখছি। স্লামডগ মিলিনিয়ার নামের একটা সিনেমা হচ্ছে। সিনেমাটা ভাল। খাওয়া শেষে মামা বলল তার নাকি ঘুমানো দরকার। তার বিছানায় প্রচুর ছারপোকা হয়েছে তাই রাতে ঘুমাতে পারেনি।রেস্টুরেন্টের সামনেই একটা সিনেমা হল ছিল। মামা বলল চল সিনেমা দেখি। মামা সিনেমা হলে ঢুকেই সোজা ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি একা একা সিনেমা দেখছি। সিনেমা হলে অধিকাংশ মানুষই আসে জোড়া জোড়া। আজও তার ব্যতিক্রম না। আমি মামাকে কখনও আমাদের গ্রাম ছেড়ে কোথাও যেতে দেখিনি। মামা কি আগে কখনও সিনেমা দেখতে এসেছে। তা না হলে কিভাবে বুঝতে পারল, সিনেমাহল এত ভাল ঘুমানোর জায়গা। হয়ত মামাও আগে কাউকে সাথে নিয়ে সিনেমা দেখতে আসত।

সিনেমা হল থেকে বেরিয়েই মামা চলে গেছে। আমার কাছে কিছু নতুন পাঁচশ টাকার নোট দিয়ে গেছে। আমি এখনও গুনে দেখিনি। গুনে না দেখার পেছনে কিছু কারণ আছে। প্রথমত,অনেকদিন যাবত হাত ফাকা। টাকা ছাড়া জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই টাকার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছি। দ্বিতীয় কারণ টাকাটা আমি নেব কিনা সেটা এখনও ঠিক করতে পারিনি।

অনেকক্ষণ যাবত এ রাস্তা সে রাস্তায় হাঁটছি। অনেকদিন পরে ঢাকায় এসেছি তাই হাটতে ভাল লাগছে। আমার কাছে পাঁচশো টাকার নোট ছাড়াও কিছু খুচরা টাকা আছে। খাবারের বিল দিয়ে যে টাকা বেচে গেছে সেটা। রাস্তায় যে ভিক্ষুক আছে তাদের ধারাবাহিকভাবে ভিক্ষা দিচ্ছি। অধিকাংশ ভিক্ষুকই টাকা নেওয়ার পর আমার দিকে কিভাবে যেন তাকাচ্ছে। হয়তো তারা আমার মত কারো থেকে ভিক্ষা আশা করেনা। একজন-তো মনে হল পারলে টাকাটা ফেরত দিয়ে দিত। কিন্তু টাকাটার লোভ সংবরণ করতে পারছে না।

অনেক্ষন রাস্তায় রাস্তায় হেটে আমি এখন মেসে ফিরছি। মেসের সামনে একটা সিএনজি দাড় করানো। আমি আগে কখনও কাউকে সিএনজি দাড় করিয়ে মেসের ভিতরে যেতে দেখিনি। সিএনজি চালককে জিজ্ঞেস করলাম কে এসেছে?সে বলল একটা লোক এসেছে যার নাকি ভুরু নাই।

সিএনজি চালকের কথা শুনেই আমি বুঝতে পারলাম ছোটমামা এসেছে। কোন এক অজানা কারণে ছোটমামার ভুরু নেই। কিন্তু ছোটমামা এখন আবার কেন এসেছে।

সিঁড়িতেই মামার সাথে দেখা হল। সে বলল, 'তাড়াতাড়ি চল দুলাভাইয়ের শরীরের অবস্থা ভাল না। আমি হাসপাতালে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম,কিন্তু তিনি যাবেননা। তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে।

আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আমরা পৌঁছানোর আগেই বাবা মারা যাবেন। কোথায় যেন পড়েছি অতি ক্ষমতাবান মানুষের মৃত্যু ঘটে একাকীত্বের মাঝে। আমার বাবা কি ক্ষমতাবান, হ্যাঁ তার বৃত্তের ভেতর যথেষ্ট ক্ষমতাবান।

আমরা যখন পৌছালাম তখন সব শেষ। ঘরের ভেতর শুধু বাবা এবং রহিম চাচা আছে। বাবা কথা আরও অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। ইশারায় আমাকে তার পাশে বসতে বললেন। আমি বসা মাত্র তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন।

বাবার এক অন্যরকম মৃত্যু ঘটল। কান্না-হীন শোকহীন আলাদা সে মৃত্যু। আমার এক অন্যরকম অনুভূতি হল কিন্তু কিছুতেই কান্না পাচ্ছিলনা। তার জন্যে আমার ভালবাসা নেই এরকম না কিন্তু কিছুতেই আমি কাঁদতে পারলাম না।

আমরা যখন বাক্যের ভেতর থেকে কোন শব্দ তুলে নেই তখন লোপ-চিহ্ন বা ইলেকচিহ্ন দিয়ে তা প্রকাশ করি। কিন্তু জীবন্ত প্রাণ যখন লোপ পায় তখন স্রষ্টা কোন চিহ্ন আঁকেন?

ভোট: 
Average: 5.8 (4 votes)

মন্তব্যসমূহ

শেষ দিকটায় এসে আমার বাবার মৃত্যুর দিনটা চোখে সামনে ভেসে উঠছিল 

 

করণিক আখতার এর ছবি

*****

এবং সুন্দর।