ফকির লালান সাই ও তার বাউল ধর্ম ১

পাগল দেবা এর ছবি

ফকির লালন সাই-কে নিয়ে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই আসে বাউল পথের কথা। এই পথ কি? এর উৎপত্তিস্থল কোথায়, কিভাবে ইত্যাদি নানা কথা। তাই লালন সাই-কে জানার পূর্বে আমরা একটু বাউল সম্পর্কে আলোচনা করে নেই।

 

 

বাংলার বাউল ধর্মের উদ্ভভ মধ্যযুগে। তবে সঠিক কোন সমাধান আজও পাওয়া যায়নি। উপেন্দ্র ভট্টাচার্য মনে করেন, আনুমানিক ১৬২৫ খ্রিস্টাব্ধ থেকে আরম্ভ করে ১৬৭৫ খ্রিস্টাব্ধ এর মধ্যে বাউল ধর্ম এক পরিপূর্ণ রুপ নিয়ে আবির্ভূত হয়। অপরদিকে আহমদ শরীফ যথার্থ বলেন, উনিশ শতকে লালন ফকিরের সাধনা ও সৃষ্টির মাধ্যমেই এর পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। লালনকেই তাই বাউল গানের মহত্তম জনক ও বাউল সাধনার শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার হিসেবে চিহ্নিত করা চলে।

 

 

বৃহত্তর বাংলার গ্রামীণ জীবনে তিনি একটি জাগরণ এনেছিলেন, জনচিত্তে জাগিয়েছিলেন ব্যাপক সাড়া। লালনের প্রধান পরিচয় তার গানে। সেই গানই তাঁকে বাচিয়ে রেখেছেন আমাদের মাঝে। তার গানের প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

 

তার জন্ম নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ লোকাইত রয়েছেতিনি নিজেও এই বিষয়ে ছিলেন নীরব। “হিতকরী” নামক এক তৎকালীন পত্রিকায় পাওয়া যায় তার জন্ম ১৫ কার্তিক ১২৯৭/৩১ অক্টোবর ১৮৯০। কিন্তু প্রচলিত মতে, লালন সাই ১৭৭৪ সালে সেই সময়ের নদীয়া জেলার অধীন কুষ্টিয়ার কুমারখালি থানার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত গড়াই নদীর তীরবর্তী ভাঁড়ারা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। হিন্দু কায়স্ত পরিবারের একমাত্র সন্তান ছিলেন লালন। বাবা- মাধব কর ও মাতা- পদ্মাবতী। শৈশবেই তিনি বাবাকে হারান। অর্থের অভাবে পড়াশুনাও করতে পারেননি। সেই সময় সেই জন্মস্তল ছিল লোকসংস্কৃতির একটি বিশেষ কেন্দ্র। আর সেখানেই লালন কীর্তন, কবিগান করে বেশ পরিচিতিও লাভ করেছিলেন অনেক কম বয়সেই।

 

 

অতি অল্প বয়সেই বাবা মারা যাওয়ায় সংসারের সকল দায়িত্ব তার উপর এসে পরে। অল্প বয়সে তিনি বিয়েও করে ফেলেন। লালন দাসপাড়ায় থাকতেন। এই দাসপাড়ার প্রতিবেশী বাউল দাস এর সহিত লালন মুর্শিদাবাদ যান গঙ্গা স্নানে। সেই গঙ্গা স্নানে যাবার পর লালন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তার সঙ্গীরা কোন রকম মুখাগ্নি করে নদীতে ভেলায় চড়িয়ে ভাসিয়ে দেন। এদিকে এক মুসলিম নারী লালনকে মূমুরষ অবস্থায় দেখে নিয়ে যায় তার বাড়িতে। অনেক সেবার পর লালন সুস্থ হয়। সুস্থ হয়ে ফিরে যায় নিজ গ্রামে মা ও স্ত্রীর কাছে। কিন্তু, তৎকালীন হিন্দু সমাজ মুসলমানের জল স্পর্শের জন্যে তাঁকে আর গ্রহণ করেনা। এই থেকেই লালনের মধ্যে সৃষ্টি হয় সমাজ বেবস্থার প্রতি একটা ঘৃণা। এই জাতি ভেদের কথা নিয়ে তার অনেক ক্ষুব্ধ প্রকাশও লক্ষ করা গেছে। তাই তিনি নিজ পরিচয় গোপন রেখে সবসময় চলেছেন। তাই তারই একটি গানে প্রকাশ পেয়েছে এই জাতের কথা-

 

 

জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা

সত্য কাজে কেউ নয় রাজি সব দেখি তা না না না ।।

 

 

যখন তুমি ভবে এলে

তখন তুমি কী জাত ছিলে

যাবার বেলায় কী জাত নিলে

                    এ-কথা আমায় বল না ।।

 

 

ব্রাম্মন-চন্ডাল চামার-মুচি

একই জলে সব হয় গো শুচি

দেখে শুনে হয় না রুচি

                  যমে তা কাউকে ছাড়বে না ।।

 

গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়

তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়

লালন বলে জাত কারে কয়

                 এই ভ্রম তো গেল না ।।

 

 

                                                                        (চলবেই)......           

 

ভোট: 
Average: 8.3 (4 votes)