লিজ ভোগের পরিণামে

করণিক আখতার এর ছবি

রাষ্ট্রীয় কোনো খাস জমি কিম্বা যেকোনোভাবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অধিগ্রহণ বা রাষ্ট্রায়ত্ত ক’রে নেওয়া কোনো জমি, কোনো ব্যক্তি পর্যায়ে বা ভূমিহীনদের মাঝে কিম্বা বেসরকারী কোনো সংস্থাকে লিজ দেওয়ার নিয়মটি চালু রাখলে, সুযোগসন্ধানীদের মধ্যে কাটাকাটি হানাহানি জ্বালাও পোড়াও চলতেই থাকবে।

 

সম্পত্তি রেখে পালিয়ে গেলেও যাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত হয় না, সম্পত্তির মালিকের উত্তরাধিকারীরাও ফিরে এলে পরে পূর্বপূরুষের রেখে যাওয়া সম্পত্তি ফিরে পায়, --তাদের ঘরবাড়ি জ্বালানো-পোড়ানোতে আমরা অপব্যয় করি না। কখনো এদেশের বাইরে গিয়ে অন্য কোনো স্থানে বসবাস করলেও যাদের সম্পত্তিকে ‘শত্রু-সম্পত্তি’, ‘পরিত্যাক্ত সম্পত্তি’ কিম্বা ‘খাস জমি’ হিসেবে গণ্য ক’রে নিয়ে রাষ্ট্রীয়করণের বিধান নেই, রাষ্ট্রীয় আইনে তাদের সম্পত্তির ব্যক্তি-মালিকানা সুরক্ষিতই থাকে; কোনোভাবেই তাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের কাছ থেকে নেওয়া লিজের জোরে বেদখল করা সম্ভব নয়। অসম্ভবের পেছনে ছুটবার মতো আহাম্মক আমরা নই। তাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে আমরা কোনো লাভ খুঁজে পাই না জন্যেই তারা আমাদের দখলদারি চিন্তার বাইরে নিরাপদে থাকে। যাদেরকে হটাতে পারলে আমরা লাভবান হই, আমরা কেবল তাদেরকেই হটানোর সুযোগের অপেক্ষায় থাকি।

 

আমরা যারা ঘরবাড়ি জ্বলিয়ে পুড়িয়ে রাষ্ট্রের কোনো অ-সুরক্ষিত সম্প্রদায়কে ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য করি, এই আমরা কোনো ধর্মের সাথে সম্পর্কিত নই। আমরা কোনো বিশেষ দলের দলীয় মতধারী নই, বরং দলবদ্ধ ভোট-জুয়ারীরা তাদের ভোট-খেলায় জেতার লক্ষ্যে এই আমাদের-ই পদানত থাকে আমাদের দয়া পাওয়ার জন্যে।

 

যাদেরকে তাড়াতে পারলে জমি বেদখল করা যাবে, তাদের ঘরবাড়ি জ্বলিয়ে দেওয়ার আগেই কিছু নগদ অর্থ ব্যয় ক’রে রাষ্ট্রের বেতনজীবী চাকরদের মাধ্যমে আমরা লিজ নেওয়ার দাপ্তরিক কাজগুলো নথিপত্রে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে নিজেদের কাছে রাখি।

 

যাদেরকে যেকোনোভাবে ভিটেছাড়া করতে পারলেই সম্পত্তি বেদখল করা যাচ্ছে এবং রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় বিধানেই ঐ জমি-জায়গা লিজ হিসেবে দখলে নেওয়া যাচ্ছে, তাদেরকে ভয় দেখিয়ে আতঙ্কিত দশায় ফেলেই যদি তাড়ানো যায় তো, আমরা জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঝামেলায় নিজেদেরকে জড়াতে যাই না। একটুখানি হুমকি ধমকিতেই আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হ’লে, সমাজের গণ্যমান্যদের সারিতে যেমন ভদ্রবেশে থাকা যায়, তেমনি আগুন লাগানোর ঝুঁকিপূর্ণ কাজে এর-ওর-তার পেছনে ধাপে ধাপে ধাপ-পারানির খরচাটাও এড়ানো যায়।

 

কোনোভাবেই যাদেরকে ভয় পাইয়ে ভাগাতে পারি না, উত্তরাধিকারী হিসেবে পাওয়া পূর্বপূরুষের ভিটেমাটিকে যারা প্রাণপণে আঁকড়ে প’ড়ে থাকে, আমরা কেবল তাদেরই ঘরবাড়ি জ্বলিয়ে দিতে বাধ্য হই।

 

কোনো শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কারো ঘরবাড়ি জ্বালানোর মতো কোনো পরিকল্পনা আমরা করছি তা’ যদি সভ্য সাধারণের কাছে কেউ প্রকাশ করে, আমাদের অস্তিত্বই যে মারাত্মক সংকটের মধ্যে পড়বে তা’ আমাদের জানা। তাই আমরা যেকোনো সুযোগের অপেক্ষায় থাকি।

 

যেকোনো প্রকৃতিক দুর্যোগের মতো এখানে দলীয় কোন্দল, হরতাল, অবরোধ, কিম্বা যেকোনোভাবে রাষ্ট্রীয় কোনো অস্থির অশান্তিময় অস্থিতিশীল পরিবেশের সুযোগটির অপেক্ষায় আমরা থাকি। যাদের পালিয়ে যাবার জায়গা আছে, তারা পালিয়ে বাঁচে। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছাড়া অন্য কোথাও যাদের কোনো ঠাঁই-ঠিকানা নেই, তারা বিধাতাকে অভিশাপ দেয় আর মাটি কামড়ে প’ড়ে থাকে আগামীতে আবারও সপরিবারে অবহেলায় গ’ড়ে তোলা তাদের নিজেদের ঘরবাড়িগুলো জ্বলছে দৃশ্যটি ভীতসন্ত্রস্ত দূরত্বে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখার অপেক্ষায়।

 

আজ, আমি যদি লিজ হিসেবে পাওয়া আমার সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রকে ফিরিয়েও দিতে চাই, তোমাদের মধ্যেই অনেকে আছে, যারা সহজে তা’ মেনে নিতে পারবে না। আমার মতো অন্যান্যদের কাছ থেকে, এমনকী গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকেও লিজ হিসেবে দেওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তিগুলো রাষ্ট্র যদি ফিরিয়ে নিতে চায় এবং কোনো সম্পত্তির উত্তরাধিকারীদের জীবিত কাউকে খুঁজে পেলে তাকে ডেকে এনে সসম্মানে সম্পত্তি বুঝিয়ে দেবার লক্ষ্যে রাষ্ট্র পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় কোনো অভিশপ্ত আইনের সংশোধনীতে সভ্য সাধারণের পছন্দের আইন প্রবর্তনের আভাসটুকুও দেয়, তা’ দেখলেই মানবতার বুলিধারীদের মধ্যেও অনেকেই আছে যারা খেঁকিকুকুরের মতো আক্রমণাত্মক হ’য়ে উঠবে এজন্যেই যে, তারাও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে নিজেদের বৈধ উপার্জনে কেনা সম্পত্তির মতো ভোগ করছে। অথচ, কী মর্মান্তিক তামাশা! ধাপ্পাজীবী ধান্দাবাজ এই তোমরাই বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমেও ‘নিরস্ত্র দুর্বলদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়াটা মানবতাবিরোধী নৃশংসতা,’ --এমন ধর্মের বাণীও আওড়াচ্ছো নিষ্পাপ সাধু সেজে।

 

আমি একা পাপমুক্ত হ’তে চাইলেই যে, আর সকল অভিশপ্তরাও আমাকে অনুসরণ করবে, এমন দাবি অন্তত আমার মতো অন্তর্দৃষ্টিপ্রাপ্তদের জন্যে অশোভনীয়। নিজের পাপের ফল যে-ব্যক্তি এখনো ভোগ করেনি, সে তো অতিবৈজ্ঞানিক গৃহপালিত তেজোদীপ্ত বেড়াল-ছানাটির মতোই অতিধার্মিক এবং নিষ্পাপ।

 

আমি আমার পাপকে দেখেছি।

গাছকাটা অবরোধে -পীচঢালা রাস্তায় এ্যাম্বুলেন্সে- দু’হাজার তেরোর নভেম্বরে- সামান্য বুকব্যথা নিয়ে- সদ্যবিবাহিতা মেয়েটি আমার- পা-হাত সাপের মতো ঠাণ্ডাতবু ঘামছিল- মুখে সে না-বললেও বেশ বোঝা যাচ্ছিল তার শ্বাসকষ্ট- আমি তাকে বুঝতে দেইনি যে, অবরোধের নামে কেটে ফেলা ছোট-বড় বিভিন্ন জতের গাছের সাতচল্লিশটার মধ্যে বড় বড় পাঁচটি শিরীষ গাছের গুঁড়ি আমার ভাগে বাটোয়ারা করা আছে- কর্মীদেরকে গাছকাটার চুক্তিতে মজুরির অর্ধেক অগ্রিম দেওয়াই আছে- রাতারাতি গুঁড়িগুলো তারাই ঘটনাস্থল থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে আমার নির্দেশিত কাঠকরাতের মিলে পৌঁছিয়ে দেবে আর ওখান থেকেই অবরোধ কর্মীরা তাদের চুক্তির বাকী টাকা নগদে গুণে নেবে- আমার জীবনের দীর্ঘতম ঐ ছয়টি ঘণ্টা- পথে থেমে থাকার এক একটা মিনিট পার হচ্ছিল ঘণ্টার চেয়েও লম্বা সময় ধ’রে-  পথ আটকাতে যেখানে গাছের দু’একটা মোটা ডালই যথেষ্ট ছিল- আমার মেয়েও সুস্থতা ফিরে পেয়ে জেনে যেতে পারতো ঐ সাতচল্লিশটার রহস্য, যদি কোনোভাবে সে আমাকে বুঝতে দিত- যদি আমি আভাসেও বুঝতে পারতাম মেয়ে আমার মৃত্যুযন্ত্রণায় নিস্তেজ- আমাকে বুঝতে না-দিয়ে সে গোপনে পালিয়ে গেল- চাপা স্বভাবের মেয়েটি আমার- সুস্থ স্বাভাবিক স্বরে বলেছিল ‘কেমন যেন খারাপ লাগছে, আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো, -- না, না, তেমন কিছু না, এরকম আমার মাঝেমধ্যেই হয়, দম আটকে আসতে চায় আবার এমনিতেই ঠিক হ’য়ে যায়- না,না, ওকে কিছু না-জানানোই ভালো,-- তোমাদের জামাই ক্যামোন ভীতু তোমরা তো ভালোভাবেই জানো -- অবরোধের মধ্যে আসতেও পারবে না, শুধু শুধু ছট্‌ফট্‌ করতে করতেই হার্টফেল- ম’রে প’ড়ে থাকবে --অমন হা ক’রে সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছো ক্যানো- কী হয়েছে তোমাদের --কই এ্যাম্বুলেন্স ডাকছো না ক্যানো?’- মা রে, তোর চালাকি ধ’রতে পারিনি রে মা --এভাবে পালিয়ে গেলি --বুকটা আমার খালি ক’রে রেখে চ’লে গেলি -- এমনি এক পরিস্থিতিতে ওর বিকলাঙ্গ ছোট ভাইটির জন্যে তো এয়ার-এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেছিলাম, মেয়েটা তা’ জানতো, তারপরও যে ক্যানো সে তার মৃত্যুযন্ত্রণা এভাবে লুকিয়ে চিরকালের জন্যে পালিয়ে গ্যালো!? --

 

আট কিলোমিটার দূরে হাসপাতাল। এ্যাম্বুলেন্সও যেতে পারবে না, তা’ আগে জানা থাকলে কাঁচা রাস্তা তো বন্ধ ছিল না। ত্রিশ বত্রিশ কিলোমিটার, সে-ও ভালো ছিল। এখন এ্যাম্বুলেন্স ঘুরিয়েও লাভ নেই। পিছনেও প্রায় চার শ’ মিটার দূরে গাছ কেটে আড়াআড়িভাবে রাস্তার ওপরে ফেলা হয়েছে, দেখা যাচ্ছিল।

 

‘আমরা এখানে সাড়ে চার ঘণ্টা আটকে আছি, সামনে পিছনে দু’দিক থেকেই বন্ধ,’ ড্রাইভার যুবকটি পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল,‘কোনো নড়াচড়া তো দেখি না। দিদিমনির অবস্থা এখন ক্যামোন?’

‘অন্তর্দৃষ্টি’ শব্দটি আমি বিভিন্ন জায়গায় অনেক শুনেছি। এই প্রথম হঠাৎ আমার স্মরণশক্তির তীব্রতা এবং তীক্ষ্ণতা অনুভব করলাম।

 রহস্যময় হাসিভরা মুখে আধোখোলা অপলক চোখে মেয়ে আমার তাকিয়ে আছে যেন কোনো অচেনা আমার দিকে।

--‘ঘোষণার শান্তিপূর্ণ অবরোধ তো আগামীকাল পর্যন্ত, --দেখেছেন, গাছগুলো সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। --এ্যাতো ধীরে ধীরে সরাচ্ছে --দুই থেকে তিন ঘণ্টা লেগে যেতে পারে,-- ’

--সে তো আগেই চ’লে গ্যাছে, আর এখন ওরা অত তাড়াহুড়ো করছে, -বিচ্ছিরি ব্যাপার, যেকোনো সময়ে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

 

হঠাৎ সবকিছুকেই প্রচণ্ড দ্রুতগতিতে চলতে দেখলাম, এমনকী, এ্যাম্বুলেন্সের ঘড়িটাকেও। দু’ঘণ্টার ঘটনাবলী দু’মিনিটেরও কম সময়ে ঘটে গ্যালো।

 

--‘মারা গেছে কতক্ষণ আগে?’ টর্চের আলোতে মৃতদেহের চোখ দেখতে দেখতে যুবকটি জিজ্ঞেস করলো।

--‘দশ থেকে বারো মিনিট আগেও ভালোভাবেই শ্বাস নিচ্ছিলো,’ বল্লাম আমি।

--‘তা’ কী ক’রে সম্ভব!? আমি তো দেখছি, --এখন থেকে কমবেশি দু’ ঘণ্টা, --দেড় থেকে দু’ঘণ্টা আগে মারা গেছে।’

--‘তা-ও হ’তে পারে। ও কে তো চেনেন, আমাদের এ্যাম্বুলেন্সের চালক, ওকে জিজ্ঞেস করলে ও-ই সব ব’লে দিতে পারবে।’

--‘আমি তো জানি না। দিদি কখন মারা গেলেন কিভাবে বলবো?’

--‘তোমার দিদিমনি কেমন আছে, -তুমি যে জানতে চাইলে, -- সময়টা কতক্ষণ আগে? তখন সে তো চ’লে গেছে। --  সময়টা মনে আছে?’

--‘ও, হ্যাঁ, --দিদির অবস্থা ক্যামোন তখন, -আমি জানতে চাচ্ছিলাম, তার পরে-পরেই তো আপনি দেখলেন রাস্তা থেকে গাছগুলো সরানো শুরু হ’লো।’

--‘সেটাই তো জানতে চাচ্ছি রে বাবা, --এখন থেকে কতক্ষণ আগে?’

ঘড়ি দেখতে দেখতে আমাদের ড্রাইভার যুবকটি বলল,‘এখন থেকে দুই ঘণ্টা দশ এগারো মিনিট আগে, -হ্যাঁ, আমি যা’ বলছি, -হিসেবে ভুল নেই, ঘড়ির সাথে মিলিয়েও দেখতে পারবেন।’

হাসপাতালের জরুরী বিভাগের দাপ্তরিক কাজগুলো যেন ঝড়ের গতিতে শেষ হলো।

জরুরী বিভাগের টিকেট, মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে ইসিজি-র দলিল আর মৃত্যুর সনদপত্র হাতে হাতে বুঝিয়ে দেবার সময় ডাক্তার যুবকটি বলল,‘এই যে মৃতদেহের ইসিজি, এসবও আপনার কাছেই রাখুন, দেখবেন যেন আবার হারিয়ে না-যায়, --রেখে দিন, পরে হয়তোবা কাজে লাগতে পারে, --ইসিজি-তে একটা সরলরেখা দেখে তো মৃত্যুর কারণটা বলা যাচ্ছে না, --তবে, দেখা যায়, হৃদপিণ্ডের কোনো রক্তবাহী নালী বন্ধ হ’য়ে গেলে সাধারণত এধরণের মৃত্যুগুলো ঘটে।’

ডাক্তার তো এমন কিছুই বলেন যা’ প্রমাণ সহ অন্যকেও বুঝিয়ে দিতে পারেন, তবে, কোনো ডাক্তার কখনোই তার সত্য অনুমানটিকেও পরম সত্য বা চূড়ান্ত নির্ভুল ব’লে দাবি করতে পারেন না। কিন্তু অন্তর্দৃষ্টিধারী জ্ঞানপ্রাপ্ত আমি যা’ জেনেছি, সেখানে যেমন কোনো সন্দেহ ঢুকতেই পারে না, তেমনি আমার স্বতঃসিদ্ধ জানাটাও কোনোভাবেই অন্যকে বোঝানো সম্ভব নয়।

যে-ব্যক্তি হঠাৎ নিজেই জেনে ফেলেছে, সে-ই ব্যক্তিটাই সত্যকে বুঝতে পারে এবং তাকে বুঝানোর জন্যে কোনো ব্যাখ্যাকারী পণ্ডিতকে খুঁজে আনাটা যুক্তিতর্কময় কোন্দলকেই টেনে আনার সমান।

কেউ বুঝতে পারুক কিম্বা না-ই পারুক, -আমি চরম সত্যটা জেনেছি, --আমার মেয়ের ঘাতক এই পাপিষ্ঠ আমি।

আমার পাপেই আমার নিষ্পাপ মেয়েটি এভাবে আমাকে ফাঁকি দিয়ে চ’লে গ্যাছে। যথাসময়ে হাসপাতালে না-পৌঁছানোর একটাই কারণ, আমি দেখেছি অবরোধের নামে কেটে ফেলা ঐ শিরীষ গাছগুলো, যেগুলোর পাঁচটি গুঁড়ি এখনও ফারাইমিলে আমার ভাগে, আলকাতরা দিয়ে ‘ক. আ.’ সংকেতে চিহ্নিত, আজও যে-কেউ চাইলেই রাতের আঁধারে রাষ্ট্রকে ফাঁকি দিয়ে ওগুলো নিয়ে যেতে পারে।

‘--মেয়েটি যখন হাসিমুখে পালিয়ে গ্যালো, আমি বুঝতে পারিনি, কেবল আমার অস্তিত্বটুকু রেখে, সে আমার সব নিয়ে চ’লে গ্যাছে। সে আমার যাবতীয় আবেগ, সব অহংকার, আমার লালিত সকল পছন্দ অপছন্দ তৃপ্তি অতৃপ্তি হিংসা ক্রোধ ঘৃণা ভালো-মন্দ-ন্যায়-অন্যায়-যুক্তি-নীতিবোধ, সমস্ত বেদনাবোধ, আমার কামনা-বাসনা-লোভ-লালসা-ক্ষুধা-পিপাসা সমষ্টি, আমার হাসি কান্না সবকিছুই ওর সঙ্গে নিয়ে গ্যাছে।

সে যখন যাচ্ছিলো, আমি কিছু কান্না শুনেছিলাম এম্বুলেন্সে বসেই। আমার নির্দেশে জ্বালিয়ে দেওয়া ঘরবাড়ি থেকে বেরিয়ে আমার কান্নাই কেঁদেছিল তারা। মেয়ে আমার আমাকে কাঁদতেও দিল না, ওদের সঙ্গে মিশে আমার কান্নাই কাঁদিয়ে নিচ্ছিল সে ঐ বাস্তুহারাদেরকে দিয়ে।’ -এই এতটুকুই আমি জেনেছি। আর আমার এই জানাটুকু কোনোভাবেই অন্যকে বুঝানো সম্ভব নয়।

এখানে, এমন কিছু, -অন্যেরাও যা’ বুঝতে পারবে, -অনেকেই সেটা জানে জন্যেই আমিও প্রকাশ করতে পারি, -দখলদারদের মধ্যে দখল-স্বত্ব নিয়ে কাড়াকাড়ির সংঘর্ষে, -স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সম্মানিত এই ভূখণ্ডটি ততদিনই উদ্বাস্তুর ক্রন্দনের অভিশাপের মাশুল গুণে যেতে বাধ্য, যতদিন-না এখানে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে যেকোনো ধরণের লিজে বরাদ্দ দেওয়ার নোংরা নিয়মটাকে অবৈধ হিসেবে গণ্য বিবেচনায় আইন তৈরি ক’রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সম্পদকে কোনো ব্যক্তি বা দলের দখল থেকে মুক্ত করা হবে।

 

গণকরণিক : আখতার২৩৯            বাংলাদেশ : ১৪/০১/২০১৪খ্রি:

 

ভোট: 
No votes yet