The Uncertainty Principle । ভগবান ও ভবিষ্যত

মিয়া জাহাঙ্গীর এর ছবি

আমার জন্ম হয়েছিল অনিশ্চয়তার মাঝে  যে দিন পৃথিবীর প্রথম আলো দেখেছিলাম , কেঁদে উঠেছিলাম কারণ আমার কিছুই জানা ছিলনা   অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে হাত পা ছুঁড়ছিলাম, কোন দিকে ছুঁড়ব সেটাও নিশ্চত ছিল না বোধ-বুদ্ধি ছিল না তাই জীবনের অনিশ্চয়তা ছিল আরো বেশি আর এখন ! যখন মনে হয় আমার বোধ আমায় আলোর দিকে নিয়ে চলেছে, দেখি চারপাশে সবকিছুই অনিশ্চিত বরং বলা ভাল অনিশ্চয়তাই আমাকে নিশ্চয়তার কাছাকাছি পৌঁছে দেয় জন্ম দেয় বিজ্ঞানের , জন্ম দেয় শিল্প-কলার, জন্ম দেয় নতুনত্বের  ভূত-ভগবান কে একই জায়গায় এনে দাঁড় করায়

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তি সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে ১৯২৭ সালে ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ নামক এক জার্মান বিজ্ঞানী অনিশ্চয়তাবাদ (uncertainty principle) নিয়ে আস্ত একটা সূত্র দিয়ে বসেন ( যার জন্য পরে তিনি নোবেল প্রাইজও পান ) হাইজেনবার্গ বলেন যে, কোন কণার ভরকে তার গতিবেগের অনিশ্চয়তা দিয়ে গুন করে তাকে কণিকার অবস্থানের অনিশ্চয়তা দিয়ে গুন করলে গুণফল কখনোই একটি বিশেষ পরিমাণের কম হতে পারেনা এই বিশেষ মানটি হল প্লাঙ্কেরধ্রুবকযারমুলকথা,একটিকণা ভবিষ্যতে কোথায় অবস্থান করবে বা গতিবেগ সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করতে হলে তার বর্তমান অবস্থা ও গতিবেগ নির্ভুলভাবে মাপা প্রয়োজন এই পরিমাপ করা যেতে পারে কণাটির উপর আলোকপাত করে  কিছু আলোক তরঙ্গকে কণিকাটির উপর ফেললে কণিকাটি আলোকে প্রতিফলিত (বিক্ষেপ) করে দেবে , এর ফলে কণাটির অবস্থান নির্দেশ পাওয়া যাবে কিন্তু আলোকের দুটি তরঙ্গশীর্ষের দূরত্বের চাইতে বেশী নির্ভুলভাবে ঐ কণিকার অবস্থান নির্ধারণ করা যাবেনা এই অসুবিধা দূর করার জন্য ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকপাত করা যেতে পারে , যাতে কণিকাটির অবস্থান সঠিকভাবে মাপা যায় কিন্তু প্লাঙ্কের প্রকল্প অনুসারে আমাদের ইচ্ছে মত যেকোন ক্ষুদ্র পরিমাণ আলোক ব্যবহার করা সম্ভব নয়   অন্ততপক্ষে,এক কোয়ান্টাম (যেমন একটি দেওয়াল বানানোর ক্ষেত্রে একটি ইট কে এক কোয়েন্টাম ধরা যেতে পারে ) আলোক ব্যবহার করতে হবে কিন্তু এই কোয়ান্টাম আলোকে যে শক্তি আছে তা কণাটিকে অস্থির (excite) করে তুলতে পারে ফলে গতিবেগে এমন পরিবর্তন আনতে পারে, যে সে সম্পর্কে ঠিকঠাক ভবিষ্যতবাণী করা যাবেনা এটা ঠিক আলোকের তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত ক্ষুদ্র হবে কণাটির অবস্থানও তত নির্ভুল হবে , কিন্তু এক্ষেত্রে এক কোয়ান্টাম আলোক শক্তির পরিমাণও বেশি হবে, এবং কণিকাটির গতিবেগের স্থিরত্বকে বৃহত্তর শক্তি বিঘ্নিত করে তুলবে অন্যভাবে বলা যায়,একটি কণিকার অবস্থান যত নির্ভুলভাবে মাপার চেষ্টা করা যাবে,তার দ্রুতির মাপন হবে তত কম নির্ভুল এবং বিপরীত সত্য হব

 

কিন্তু অতীতে অনেক দার্শনিক অনিশ্চয়তাবাদের মর্ম সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারেন নি, আজও অনেকে মনে করেন বিজ্ঞানে নিশ্চিত ভাবে কোন ভৌতরাশির পরিমাপ করা সম্ভব   এমনকি uncertainty principle নিয়ে Albert Einstein ও অখুশি ছিলেন , তিনি  Niels Bohr  ও হাইজেনবার্গ কে চ্যলেঞ্জ পর্ষন্ত দিয়ে বসেন আইনস্টাইনের যুক্তিটি সহজ ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করি:  ধরুন একটি shutter যুক্ত বাক্সে কিছু  (radioactive) তেজষ্ক্রিয় পদার্থ আছে , এবার shutter টা একটি মুহুর্তের জন্য খুলে দিলে কিছু পরিমান বিকিরন বাইরে বেড়িয়ে যাবে আইনস্টাইনের যুক্তি ছিল যেহেতু আমরা shutter speed অর্থৎ বিকিরণ বেরিয়ে যাবার সময় নির্ভুলতার সাথে মাপতে পারি ফলে বিকিরণের সাথে যুক্ত পরিবর্তনশীল শক্তির পরিমাপ ও নির্ভুল ভাবে করতে পারব তিনি দাবী করেন যে বাক্সটির আগের ও পরের ভর পরিমাপ করে , ভর-শক্তির তুল্য সমীকরণ থেকে সহজেই কতটা শক্তি বাক্স থেকে নির্গত হয়েছে তা জানা যাবে আইনষ্টাইন মহাশয় সঠিক কথা বললেও তিনি যে ঘড়ি টা (বা অন্যন্য যন্ত্রপাতিগুলো) ব্যবহার করবেন সেটা যে ১০০ % সঠিক সময় (পাঠ) দেয় তার গ্যারান্টি কে দেবে ! তা ছাড়া কিছু শক্তি বেড়িয়ে গেলে সিস্টেমটার অবস্থার যে পরিবর্তন হবে তার জন্যও কিছু প্রভাব পড়তে পারে , যেটা নীলস বোর দেখিয়েছিলেন মোট কথা অনিশ্চয়তা থাকবেই , হাইজেনবাগের অনিশ্চয়তার নীতি তাই বিশ্বের একটি মূল ধর্ম

 

একবার আমি উভয় সংকটে পড়েছিলাম, আমার এক বান্ধবী কে প্রপোস করব কি না , ঠিক করে উঠতে না পেরে মাঠের মাঝখনে একটা কয়েন নিয়ে টস করি আর মনে মনে ভাবি যেন হেড পড়ে যদিও আমার আগে থকেই জানা ছিল ব্যপারটা অনিশ্চিত , হেড ও টেল পড়ার সম্ভাবনা ছিল 50-50 , তা জানি কিন্তু মাথায় একটা অন্য ভাবনাও এলো কয়েনটা একবার পাক খেতে কত বল (টর্ক) লাগে তা যদি জেনে যাই আর আমি আঙুল দিয়ে কত বল দিচ্ছি সেটা যদি মাপতে পারি তাহলে ত হেড পড়বে না টেল পড়বে বলা সহজ  আবেগে উত্তেজনায় এ সব ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ করে কয়েনটা আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছি ,যখন চোখ খুললাম তখন ঘন ঘাসের মধ্যে আমি কয়েনটাই খুঁজে পেলাম না আমার সব সম্ভবনার কথা জানা থাকলেও এই অনিশ্চয়তা মাথাতেই আসে নিআগামি কাল ভারত ক্রিকেটে হারবে না জিতবে , আপনি আগামিকাল টেনিদার দোকানে আড্ডা মারতে যাবেন কি যাবেন না, সবই সম্ভাবনা কেননা অনিশ্চয়তার নীতি আপনাকে অচল করে দিয়েছে

 

ভাবুন তো আপনি পুকুরে জাল ফেলার আগেই যদি জেনে যেতেন যে জালে কটা মাছ উঠবে , তাহলে কি আপনি আল্লাহ বা ভগবানের নাম নিয়ে জাল টা ফেলতেন ? বা ভাগ্য কথাটার জন্ম হত ? আসলে আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন অনিশ্চয়তা থেকেই যায় আর তখনই জন্ম হয় ভগবানের যদি এমন হয়, আপনি জাল ফেলে ফেলে সারা জীবন পার করলেন তাহলে বলতেই পারেন আপনার অভিজ্ঞতা বেশি , ফলে কোথায় জাল ফেললে মাছ উঠবে তার সম্ভাবনা আপনি দিতেই পারেন তবু কি নিশ্চিত মাছ উঠবেই ? যদি মাছ না উঠে জানবেন আপনার আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল, আর তখনি আপনি অন্য বিশ্বাসের উপর ভর করবেন , জন্ম দেবেন ভগবানের অথবা দোহাই দেবেন আপনার ভাগ্যটাই খারাপ

 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ঈশ্বরও কি এই নীতির ভেতরে পড়বেন ? অবশ্যই পড়েন, কেননা ঈশ্বর নিজেই নিয়মের ভেতরে নিয়মের বাইরে থেকে জগতের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা অসম্ভব নিজের বানানো নিয়ম কে তিনি মেনে চলবেন এটাই স্বাভাবিক আর তাহলে তিনি ভবিষ্যত বাণী করতে পারেন না বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ভবিষ্যত বাণীগুলো করা হয়েছে তা সম্ভাবনা  মাত্র অনিশ্চয়তা হাতে কলমে দেখিয়েছে যদি আপনি অস্তিত্বশীল হন তাহলে আপনি অক্ষম কোন কিছুই পূর্ব নির্ধারিত নয়

                                                              

ভোট: 
Average: 9.7 (13 votes)

মন্তব্যসমূহ

Stalin Nupur এর ছবি

nice

আকঞ্জী এর ছবি

চমৎকার লেখাটির জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। শুভ কামনা।

Rizwanah Syeda এর ছবি

Good

Md.Raihan Patwary এর ছবি

অনেক ভালো লিখেছেন ভাই...।