বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য মূল্যস্ফীতির আগুনে ঘি ঢালার সমান

বাজেট-পরবর্তী আলোচনায় মূল প্রবন্ধে র‌্যাপিড চেয়ারম্যান
উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য মূল্যস্ফীতির আগুনে ঘি ঢালার সমান

প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছর মূল্যস্ফীতিকে ৬ শতাংশ নামিয়ে আনা এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জনের প্রস্তাব করেছেন। এটিকে দেশের সংকটপূর্ণ সময়ে একমুখী পথচলায় দ্বিমুখী ও সাংঘর্ষিক পদক্ষেপ বলে মনে করছে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড)। সংস্থাটি দাবি করেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে মূল ফোকাস দেখা গেছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। যদিও সেখানে এ সম্পর্কিত কার্যকর পদক্ষেপ কম। তদুপরি সেখানে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পথ ব্যাহত করবে, যা অনেকটা আগুনে ঘি ঢালার সমান।

গতকাল বুধবার প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে র‌্যাপিড চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান প্রধান অতিথির বক্তব্যে র‌্যাপিড উপস্থাপিত এমন পর্যালোচনাকে সঠিক বলে স্বীকৃতি দিয়ে তিনি নিজেও দাবি করেন–এটা ঠিক, উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না। এ সময় তিনি সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্বীকার করে বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ট্রিগার থাকতে হবে সরকারের হাতে। বাজারে কোনো গোষ্ঠীর অযৌক্তিক কিংবা অনৈতিক কিছু দেখা গেলে তা নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক ট্রিগার চাপতে হবে, যা পেঁয়াজের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রয়োগ করতে পারেননি আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে র‌্যাপিড চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, দেশজুড়ে সবার মাথাব্যথা এখন মূল্যস্ফীতি। বর্তমানে এই মূল্যস্ফীতির গড় হার ৯-এর কাছাকাছি। এ অবস্থায় আমদানি বাড়িয়ে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো দরকার। কিন্তু আমরা ডলার সাশ্রয়ে আমদানিকে নিয়ন্ত্রণ করছি। সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ খোলাবাজারে পণ্য (ওএমএস) ও টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যের পণ্য বিক্রিতে ভর্তুকি বরাদ্দ কম রাখছি। অন্যদিকে সুদের হার ও বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি না। মুদ্রানীতির কঠোর প্রয়োগ জরুরি। যার মাধ্যমে বাজারে মুদ্রাস্ফীতি টেনে ধরা যায়। দেরিতে হলেও এগুলো যখন করব, উদ্দেশ্য থাকবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু এই বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকারও যেখানে মূল ফোকাস করছে মূল্যস্ফীতিকেই, তখন একই বাজেটে ৭ দশমিক ৫ শতাংশের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য উল্টো সেই মূল্যস্ফীতির আগুনে ঘি ঢেলে দেবে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যাবে। ফলে মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধিসহ বাজেটের আরও যেসব লক্ষ্য রয়েছে তার কোনোটাই অর্জিত হবে না।

তিনি প্রস্তাবিত বাজেটকে অর্থবহ করতে চূড়ান্ত পাস হওয়ার আগে এগুলো পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব রাখেন। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরাসরি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বাজেটের উন্নয়ন খাত ও পরিচালন ব্যয় থেকে বরাদ্দ কাটছাঁট করে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে আরও ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা যুক্ত করে সেই অর্থ খোলা বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ বাড়ানোর পরামর্শ দেন। এতে বাজারের ওপর পণ্যের চাপ কম হবে। একই সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

লুটের মালের মতো ডলারের দাম নিচ্ছে ব্যাংকগুলো: অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন দাবি করেন, দেশে এখন সবচেযে বড় সমস্যা হলো ডলার সংকট। আজকের মূল্যস্ফীতি এর থেকেই সৃষ্ট। কিন্তু ব্যাংকগুলো ডলার বিক্রিতে কোনো নীতি-নৈতিকতা মানছে না। নিজেদের ইচ্ছেমতো লুটের মালের মতো যেভাবে পারছে, তারা সেভাবে ডলারের দাম নিচ্ছে। বর্তমানে ১ ডলারের বিপরীতে ১১৪ থেকে ১১৫ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে।

অনুষ্ঠানে জসিম উদ্দিন অভিযোগ করে আরও বলেন, বিভিন্ন সমস্যা, অভিযোগসহ নানা বিষয়ে আলোচনার জন্য এফবিসিসিআই ও এনবিআরের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স আছে, কিন্তু তাদের বৈঠক হয় না। তিনি আরও বলেন, পণ্য আমদানিতে এইচ এস কোডের ভুলের জন্য ২০০ শতাংশ জরিমানা করা হয়, তার ২০ শতাংশ পায় কর কর্মকর্তা। বাজেটে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, তা কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা থাকলে ভালো হতো। এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেন এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশে এনবিআরকেও ডিজিটাল করতে হবে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে আয়কর ও ভ্যাট আদায় করতে হবে। উভয় পক্ষের মধ্যে যত কম দেখা হবে, ততই দুর্নীতি কমে আসবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে জসিম উদ্দিন বলেন, ‘১৬ টাকার গ্যাস ২৫ টাকা করার প্রস্তাব আমরাই দিয়েছিলাম। আমাদের শর্ত ছিল, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে হবে। ১৬ টাকার গ্যাসের দাম ৩০ টাকা করা হলো, কিন্তু এখন আমরা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাচ্ছি না। আবার অন্ধকারও বেশি ব্যয়বহুল। বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালাচ্ছি, প্রতি কিলোওয়াটের দাম পড়ছে ২৫ টাকা। অর্থনীতি টেকসই ও সেইসঙ্গে শিল্পোৎপাদন ধরে রাখতে হলে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আবু ইউসুফ, বিল্ডের সিইও ফেরদৌস আরা বেগম, দৈনিক প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন মাসুম, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সেরাজ প্রমুখ। ইআরএফ সভাপতি রেফায়েত উল্লাহ মৃধার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজপথ দখলে আবারও মাঠে নামছে ইমরান খানের পিটিআই

আ.লীগ নেতার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার

এক শর্তে জাহাজে হামলা বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করবে ইয়েমেন

গাজীপুরে মার্কেটে আগুন

শিক্ষার্থীকে শাসন করায় শিক্ষককে বেধড়ক মারধর

প্যারিসে একুশের কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভা

রাশিয়ার ভয়ে পিছু হটল ন্যাটো

নসিমন-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ২

২৮ ফেব্রুয়ারি : কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

বুধবার রাজধানীর যেসব এলাকায় যাবেন না

১০

২৮ ফেব্রুয়ারি : নামাজের সময়সূচি

১১

কর্ণফুলী নদীতে ৩ দিন বন্ধ থাকবে ফেরি চলাচল

১২

মিয়ানমার সীমান্ত এখন শান্ত, ফের গোলাগুলি শুরুর আশঙ্কায় আতঙ্ক

১৩

বোনাস দাবিতে সার কারখানা শ্রমিকদের মানববন্ধন

১৪

সিলেটে পরিবহন শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু আজ

১৫

হাসপাতালে রেখে তরুণ-তরুণী উধাও, ছোটমণি নিবাসে ঠাঁই হলো নবজাতকটির

১৬

চট্টগ্রামে শাস্তির মুখে ৮ ল্যাব-হাসপাতাল

১৭

এবার বাড়ছে সব ধরনের ছোলা ও ডালের দাম

১৮

বিধবা মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার পথে চলন্ত ট্রেনে বাবার মৃত্যু

১৯

দুই সন্তানের জননীকে নিয়ে ‘উধাও’ ইউপি সদস্য

২০
X