রাজকুমার নন্দী
প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

এজেন্ডাবিহীন সংলাপে আগ্রহী নয় বিএনপি

এজেন্ডাবিহীন সংলাপে আগ্রহী নয় বিএনপি

আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে এবার এজেন্ডাবিহীন কোনো সংলাপে যাবে না বিএনপি। মাঠের বিরোধী দলটির দাবি, সংলাপ নিয়ে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। সংলাপ ইস্যুতে দলটির অবস্থান হচ্ছে, সরকারকে আগে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ঘোষণা দিতে হবে। তারপর নির্বাচনকালীন সেই নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের ফরম্যাট কী হবে, সেটা নিয়ে সংলাপ হতে পারে। কেবল এই ইস্যুতে সংলাপের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দেওয়া হলে তাতে সাড়া দেবে বিএনপি। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকেও নিজেদের এই অবস্থান জানিয়েছে দলটি। তাই আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এবং সরকারের মন্ত্রীরা এখন বিএনপির সঙ্গে সংলাপ নিয়ে যে বক্তব্য দিচ্ছেন, সেটিকে আপাতত আমলে নিচ্ছে না দলটি।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, সরকার যদি চায় যে সংঘাত এড়িয়ে সামনের দিকে যাবে, তাহলে প্রথম কাজটা করতে হবে বিরোধী দলগুলোর দাবি পূরণ করা। অর্থাৎ সরকারকে পদত্যাগ করে আলোচনার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার পদত্যাগ না করে সংলাপের আহ্বান করলে তাতে বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিতে গত ২৪ মে মার্কিন ভিসা নীতি ঘোষণার পর ঢাকার কূটনীতিকপাড়ায় রাজনৈতিক দলের নেতাদের দৌড়ঝাঁপ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বেড়ে গেছে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাসের তৎপরতাও। ২৫ মে গুলশানে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসায় পিটার হাসের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতারা একত্রে বৈঠক করেন। জানা যায়, ওই বৈঠকে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। বৈঠক শেষে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে সব দলের সংলাপ আয়োজন ছাড়া সমাধানের পথ দেখছি না। মার্কিন রাষ্ট্রদূতও সে কথাই বলেছেন। গত রোববার পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠক করেন সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। আর গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। সেখানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিজিও উপস্থিত ছিলেন। একই দিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গেও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বৈঠক হয়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি, নির্বাচন ও আন্দোলন নিয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চাইলে তা পিটার হাসকে অবহিত করেন দলের মহাসচিব। বৈঠকে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী নির্বাচনসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়েও পিটার হাস বিএনপির বক্তব্য জানতে চান বলে মির্জা ফখরুল গণমাধ্যমকে জানান। তিনি বলেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না বলে তারা মনে করেন। এ বক্তব্যই তিনি তুলে ধরেন পিটার হাসের কাছে। এ ছাড়া বৈঠকে সংলাপ নিয়ে বিএনপির অবস্থানও মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে অবহিত করা হয় বলে জানা গেছে।

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এমন তৎপরতার মধ্যে গত মঙ্গলবার ১৪ দলের এক সভায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, বিএনপিকে এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করে লাভ নেই। প্রয়োজনে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় আমরা তাদের সঙ্গে মুখোমুখি সংলাপ করতে চাই। তবে গতকাল বুধবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, জাতিসংঘের মধ্যস্থতা বা হস্তক্ষেপ করতে হবে—এমন কোনো রাজনৈতিক সংকট দেশে এখনো তৈরি হয়নি। আমাদের দেশে আমরা আলোচনা করব—এটি নিজেদের সমস্যা, নিজেরাই সমাধান করব। তবে একই দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, সংলাপের মাধ্যমে সবকিছু সমাধান হতে পারে। আলোচনার কোনো বিকল্প নেই।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, কোথায় কোন সমাবেশে কে কী বলছেন, সেটার জবাব দেওয়া আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন করছি। আমাদের কাছে কেউ লিখিত প্রস্তাব দিলে সেটির জবাব দেওয়ার জন্য ভাবব। এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে গতকাল গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এ নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তার ভাষ্য, ‘এতেই বোঝা যায় আওয়ামী লীগের কী অবস্থা।’

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন এগিয়ে আসা এবং বাংলাদেশের জন্য মার্কিন ভিসা নীতি ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি বাস্তবায়নে আন্দোলনের পাশাপাশি কূটনৈতিক চ্যানেলে তৎপরতাও ফের বৃদ্ধি করে বিএনপি। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির সদস্যরা। ওই বৈঠকগুলোতে কেন এই সরকারের অধীনে বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে চায় না, তা ব্যাখ্যা করে দলটি। এর স্বপক্ষে দলীয় সরকারের অধীনে বিগত দুটি নির্বাচন কেমন হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে কীভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে, লিখিত ও অলিখিত ফরম্যাটে সেগুলো তুলে ধরেন নেতারা। বিএনপি যে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না, সেটিও স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে দলটির পক্ষ থেকে কূটনীতিকদের জানানো হয়, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা কী হবে, সে বিষয়ে সংলাপের আহ্বান এলে তাতে সাড়া দেবে বিএনপি।

গত ৮ মে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক গোয়েন লুইসের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি। বৈঠকে বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন রাজনৈতিক সংকট নিরসনে জাতিসংঘ যে বারবার উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি উল্লেখ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরেও বিশ্বসংস্থাটি বিশেষ ভূমিকা পালন করবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন দলটির নেতারা। এ সময় তারা বাংলাদেশে দশম সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে জাতিসংঘের তৎকালীন সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তারানকো ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় এসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা এবং সুশীল সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেন। তবে সংকট নিরসনে তিনি সফল হননি।

এ ছাড়া ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপে অংশ নেয় বিএনপি। ওই সংলাপ প্রসঙ্গে বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, সংলাপে প্রধানমন্ত্রী সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, নির্বাচনে কোনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই, প্রার্থীদের শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, গায়েবি মামলা দিয়ে নির্বাচনী মাঠ ফাঁকা করে ফেলা হয়েছে, নির্বাচনের আগের রাতে ভোট ডাকাতি করা হয়েছে। ওই তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে তারা এবার সরকারের সঙ্গে এজেন্ডাবিহীন কোনো সংলাপে যেতে আগ্রহী নয়।

তবে মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ কূটনীতিকদের সাম্প্রতিক দৌড়ঝাঁপের কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে, প্রকাশ্যে না হলেও সংকট নিরসনে পর্দার অন্তরালে সংলাপ হচ্ছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন যুগপৎ আন্দোলনের শরিক গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব নুরুল হক নুর সম্প্রতি বলেছেন, সরকার প্রকাশ্যে বিএনপির সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করলেও নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট নিরসনে তলে তলে বিভিন্ন সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আ.লীগ নেতার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার

এক শর্তে জাহাজে হামলা বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করবে ইয়েমেন

গাজীপুরে মার্কেটে আগুন

শিক্ষার্থীকে শাসন করায় শিক্ষককে বেধড়ক মারধর

প্যারিসে একুশের কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভা

রাশিয়ার ভয়ে পিছু হটল ন্যাটো

নসিমন-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ২

২৮ ফেব্রুয়ারি : কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

বুধবার রাজধানীর যেসব এলাকায় যাবেন না

২৮ ফেব্রুয়ারি : নামাজের সময়সূচি

১০

কর্ণফুলী নদীতে ৩ দিন বন্ধ থাকবে ফেরি চলাচল

১১

মিয়ানমার সীমান্ত এখন শান্ত, ফের গোলাগুলি শুরুর আশঙ্কায় আতঙ্ক

১২

বোনাস দাবিতে সার কারখানা শ্রমিকদের মানববন্ধন

১৩

সিলেটে পরিবহন শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু আজ

১৪

হাসপাতালে রেখে তরুণ-তরুণী উধাও, ছোটমণি নিবাসে ঠাঁই হলো নবজাতকটির

১৫

চট্টগ্রামে শাস্তির মুখে ৮ ল্যাব-হাসপাতাল

১৬

এবার বাড়ছে সব ধরনের ছোলা ও ডালের দাম

১৭

বিধবা মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার পথে চলন্ত ট্রেনে বাবার মৃত্যু

১৮

দুই সন্তানের জননীকে নিয়ে ‘উধাও’ ইউপি সদস্য

১৯

স্বামী কারাগারে, সন্তান ফেলে উধাও গৃহবধূ

২০
X