সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

সড়কে বিচারহীনতার সংস্কৃতি

সময় যত যাচ্ছে ঝালকাঠির বাস দুর্ঘটনার নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে এবং সেগুলো সবই সহজে অনুমেয়। এখন জানা যাচ্ছে, বাসটির চালকের ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্স ছিল না এবং তিনি আদতে চালকই নন, হেলপার। বাসটিরও ফিটনেস ছিল না।

গত শনিবার ২২ জুলাই সকালে ভাণ্ডারিয়া থেকে বরিশাল যাওয়ার পথে ঝালকাঠির গাবখান ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের ছত্রকান্দা এলাকায় যাত্রীবাহী বাসটি উল্টে পানিতে পড়ে গিয়ে ১৭ জন নিহত হয়েছেন। যদিও তদন্ত কমিটি হয়েছে; কিন্তু এই রিপোর্ট যে আর কখনো প্রকাশিত হবে না এবং কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হবে না, সেটি আমরা নিশ্চিত। তবে প্রাথমিকভাবে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বাসটিতে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন ছিল এবং এরপরও বারবার থামিয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছিল। এ নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে তর্কাতর্কি হচ্ছিল বাসের সুপারভাইজারের। একপর্যায়ে চালক গাড়ি চালাতে চালাতে সেই তর্কে যোগ দেন এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের পুকুরে পড়ে যায়। যদি আমরা একটু পেছনে ফিরে যাই, তাহলে মনে পড়বে ২০১৮ সালের ২৯ জুলাইয়ের কথা। সেদিন রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় মারা যায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী। সেদিন তাৎক্ষণিকভাবে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা রাস্তায় নেমে আসে। সড়কে নিরাপত্তা দাবি করে গড়ে তোলে ইতিহাসের বৃহত্তম আন্দোলন। আর এসব দাবি বাস্তবায়নে আইন সংশোধন করে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ জাতীয় সংসদে পাস হয়; কিন্তু আইনটি পাসের পরপরই সড়ক খাতের মালিক-শ্রমিক এক হয়ে এর বিরোধিতা করতে শুরু করে। এমনকি সড়ক পরিবহন শ্রমিক নেতা সংসদে এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তিনিও বাইরের এর বিরোধিতা করে কার্যত আইনটিকে অচল করে রাখেন। চার বছরের মাথায় গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর জারি হয় সেই বিধিমালা; কিন্তু এর কোনো প্রয়োগ মানুষ দেখতে পাচ্ছে না। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের চাপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন বাস্তবায়নে কঠোর হতে পারছে না। বলা হয় যে, ক্ষমতার উচ্চস্তর থেকে এদের প্রতি প্রশ্রয় আছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিরাপদ সড়কের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিষয় এই আইন ও বিধিতে আসেনি। সারা দেশে উন্নয়নের নামে সড়ক-মহাসড়কে ব্যাপক কাজ হচ্ছে; কিন্তু সড়কে গণহত্যাও বেড়ে চলেছে। দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুহার দুই-ই ক্রমবর্ধমান। সড়ক দুর্ঘটনার একটি প্রধান কারণ—এ খাতে নৈরাজ্যের পক্ষে মালিক-শ্রমিক ঐক্য এবং এদের প্রতি রাজনৈতিক মদদ। নিয়ম ভাঙলে মালিকদের কাছে যে কঠোর বার্তা যেত, তা যায় না বলে চালকদের আইন ভাঙার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বেসরকারি সংগঠনগুলো প্রতিবছর তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পুলিশও তথ্য সংগ্রহ করে এ-সংক্রান্ত মামলার নিরিখে। ফলে দেখা যায়, এসব তথ্যে বেশ গরমিল থাকে। বাংলাদেশে দুর্ঘটনা নিয়ে সমন্বিত, বহুমাত্রিক, গ্রহণযোগ্য তথ্যব্যাংক থাকা দরকার। এটি তৈরি করতে হবে সরকারকেই; কিন্তু সরকারকে বেশি যেটি করা দরকার তা হলো, এই নৈরাজ্যপ্রবণ মালিক-শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ থেকে সড়ক পরিবহন খাতকে বের করে আনা। আইন হলো, অথচ এরা সেটি বাস্তবায়ন করতে দিল না। সরকারও উদ্যোগী হলো না। এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের উদাসীনতা ও বড় দুর্বলতা। আমরা দেখেছি ২০১৮ সালের আইনটি পাসের পর এটি যাতে কার্যকর হতে না পারে, সে জন্য সড়কে পুলিশের নাকের ডগায় সহিংসতা করা হয়েছে, সাধারণ নাগরিকের মুখে তারা পোড়া মবিল লাগিয়ে দিয়েছে। সহিংসতা করে তারা সফল হয়েছে এই আইনটিকে আটকে রাখতে। গতিসর্বস্ব উন্নয়নের নজির উন্নত সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি। আর এই উন্নয়নের ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণাম’ ক্রমবর্ধমান দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু আর পঙ্গুত্ব। দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব দুর্ঘটনার কারণে বছরে মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ হারাচ্ছে বাংলাদেশ। এটা অবশ্য আর্থিক ক্ষতির হিসাবমাত্র, দুর্ঘটনায় হতাহতের ক্ষতি অপূরণীয়, বিশেষ করে দরিদ্র দেশের গরিব মানুষের পক্ষে।

এই মৃত্যু এবং ক্ষয়ক্ষতির মিছিল থামানো কি সত্যিই খুব কঠিন কাজ? নিরাপদ সড়কের দাবিতে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনের পর সংশ্লিষ্ট সবাই নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; কিন্তু সেগুলো আর আলোর মুখ দেখেনি।

কী কী কারণে এত বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, কী কী পদক্ষেপ নিলে দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা সম্ভব— এসব বহুল আলোচিত। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো ও ঝুঁকিপূর্ণ যান চালানোর কারণেই প্রায় ৮০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ব্যাপক হারে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনের ব্যবহার ও ড্রাইভারের অসতর্কতার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ নমুনা ঝালকাঠির মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনা। এখানে চালক একদম সচেতন ছিলেন না। অল্প দক্ষ বা অদক্ষ চালক দিয়ে গাড়ি চালানোই সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ; কিন্তু এর চেয়ে ভয়ানক যেটি তা হলো, বিচারহীনতার সংস্কৃতি। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বাস, ট্রাক অর্থাৎ গাড়ির মালিক ও শ্রমিকদের কিছু বলা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে ধর্মঘট ডাকা, অচলাবস্থা সৃষ্টি করা এবং রাস্তায় নেমে সহিংসতা করা এই মালিক-শ্রমিকদের কাছে স্বাভাবিক বিষয়। এদেশে উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়েও ধর্মঘট করার, নৈরাজ্য করার নজির আছে পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষ থেকে। সব দুর্ঘটনা চালকদের অসতর্কতায় বা বেপরোয়া গতির কারণে ঘটে, তাও নয়। আমাদের সড়কের বেহাল দশা, সড়কের ভুল নকশা ও ব্যবস্থাপনা, একই সড়কে অতি গতিশীল ও অতি ধীর অযান্ত্রিক বা ছোট যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক (যেমন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশা) গাড়ি চলাচলও এর জন্য দায়ী। আমাদের সড়ক পরিবহনের মালিকরা এত এত মুনাফা করেছেন; কিন্তু আজ পর্যন্ত নিজেদের বিনিয়োগে একটা ভালো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি। চালক ও সহযোগীকে গাড়ি চালাতে দক্ষ করা, সড়কের নিয়মকানুন জানানো এবং এই কাজটি যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, সে বিষয় জ্ঞান দানের কোনো প্রচেষ্টা নেই। চালকদের নিয়োগপত্র দিয়ে নিয়মিত বেতন কাঠামোর মধ্যে আনতে পারলেও তাদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমে আসত। গত বছর যে বিধিমালা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ মোটরযান, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী ব্যবস্থার আলোকে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা প্রণীত হয়নি। এ ছাড়া সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উল্লিখিত সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্যও আইন ও বিধিমালা করা হয়নি। আইন বা বিধিতে সড়ক অবকাঠামো, যানবাহনের নিরাপত্তা, সিটবেল্ট, শিশু নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়নি। নেশাগ্রস্ত ও মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো সংক্রান্ত বিষয়ে স্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। দুর্ঘটনা-পরবর্তী আহত ব্যক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত কোনো বিধান নেই। দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিকে সহযোগিতার বিষয়ে সেবা প্রদানকারীদের আইনি সুরক্ষার বিষয়টি উল্লেখ নেই। পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলে কয়েকটা বিষয় পরিষ্কার হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রায় শতভাগ অতি সাধারণ মানুষ। তাই সাধারণের মৃত্যুতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষ, পরিবহন খাতের নেতৃত্ব এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন সচেষ্ট নন ব্যবস্থা গ্রহণে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা হয়নি। পথচারীদেরও গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, বিশেষ করে ট্রাফিক আইন মেনে চলার ব্যাপারে আমাদের মানসিকতার আমূল বদল চাই।

বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে এবং মানুষের জীবনের মর্মান্তিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য একটি ব্যাপক কর্মসূচি তৈরি করতে হবেই। অন্যথায় এর মূল্য আমাদের গুনতে হচ্ছে এবং হতেই থাকবে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, গ্লোবাল টেলিভিশন

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যশোরে ভাষা শহীদদের স্মরণে ৫২শ মোমবাতি প্রজ্বলন

শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের ঢল

সাভারে খঞ্জনকাঠি খাল উদ্ধার করল উপজেলা প্রশাসন

শোক ও গৌরবের একুশে আজ

২১ ফেব্রুয়ারি : নামাজের সময়সূচি

ইতিহাসের এই দিনে যত ঘটনা

গ্রিজমানদের খালি হাতেই ফেরত পাঠাল ইন্টার মিলান  

একটি হুইল চেয়ারের আকুতি প্রতিবন্ধী সিয়ামের

ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে চবিতে ফুলের দাম বেড়েছে ৩ গুণ

সীমান্তে শেষবারের মতো সরুকজানের লাশ দেখল স্বজনরা

১০

‘উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করতে চাই’- প্রাণিসম্পদমন্ত্রী

১১

‘ডাল ভাত খেয়েও যুদ্ধ করতে পারি’

১২

ভাষা শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

১৩

কোম্পানি রিটার্নের মেয়াদ ২ মাস বাড়ানোর দাবি এফবিসিসিআইর

১৪

ন্যায্যতা সম্পর্কিত সংসদীয় ককাস / উন্নয়নমূলক পদক্ষেপে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান 

১৫

এমপিদের থোক বরাদ্দের আগে জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবি টিআইবির

১৬

চাকরি গেল জাবির আলোচিত সেই শিক্ষকের

১৭

পঞ্চগড়ে বন্যহাতির আক্রমণে যুবক নিহত

১৮

অনলাইনে ভিডিও দেখে গামছা বিক্রেতার ছেলের মেডিকেলে চান্স

১৯

বাড়ছে বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম

২০
X