মুফতি আরিফ খান সাদ
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আশুরার মাহাত্ম্য, ইতিহাস ও করণীয়

আশুরার মাহাত্ম্য, ইতিহাস ও করণীয়

হিজরি বর্ষের প্রথম মাস ‘মহররম’। মহররম অর্থ মর্যাদাপূর্ণ। এ মাসের ১০ তারিখে পালিত হয় পবিত্র ‘আশুরা’। আশুরা অর্থ ‘দশম’। পৃথিবীর সৃষ্টি ও মানবজাতির সূচনাকাল থেকেই নানা ঘটনাপ্রবাহের ঐতিহ্য বহন করছে পবিত্র মহররম মাস ও এ মাসের দশম দিবস—আশুরা। আসমান-জমিন সৃষ্টিসহ পৃথিবীর অনেক স্মরণীয় ও যুগান্তকারী ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এই দিনে। স্বয়ং আল্লাহ এ মাসকে ‘মর্যাদাপূর্ণ’ বলে ঘোষণা করেছেন। ‘মুহররম’ শব্দের অর্থও সম্মানিত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গণনা হিসাবের মাস হলো বারোটি। যেদিন থেকে তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, এর মধ্যে চারটি মাস বিশেষ সম্মানিত।’ (সুরা তাওবা : ৩৬)। এ আয়াতের তাফসিরে বলা হয়েছে, ‘বারো মাস হলো—মহররম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউস সানি, রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ। আর হারাম বা সম্মানিত চারটি মাস হলো—মহররম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ। (তাফসিরে বাগাভি : ৪/৪৪)। হাদিসেও এটাকে ‘শাহরুল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর মাস হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ঐতিহাসিক কারবালার রক্তঝরা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মহররম মাস আরও স্মরণীয় হয়ে রয়েছে ইতিহাসের পাতায়। ইরাকের ফুরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে নবী-দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনার বহু আগে থেকেই আশুরার গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। এই দিনে হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়, হজরত নুহ (আ.) মহাপ্লাবনের শেষে জুদি পাহাড়ে অবতরণ করেন, হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি দেওয়া, হজরত মুসা (আ.) তুর পর্বতে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেন, তার শত্রু ফেরাউনের নীল নদে ভরাডুবি হয়। এই দিনে হজরত আইয়ুব (আ.) রোগ থেকে মুক্তি পান। হজরত ইয়াকুব (আ.) তার প্রিয় পুত্রকে ফিরে পান। হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে দজলা নদীতে বের হয়েছিলেন এই দিনে। হজরত সুলাইমান (আ.) এই দিনে পুনরায় রাজত্ব ফিরে পান। হজরত ইসা (আ.) পৃথিবীতে আগমন করেন এবং তাকে আকাশে তুলে নেওয়া হয় এই দিনেই। হজরত জিবরাইল (আ.) সর্বপ্রথম আল্লাহর রহমত নিয়ে রাসুল (সা.)-এর কাছে আগমন করেছিলেন। মহররমের কোনো এক শুক্রবার ইসরাফিল (আ.)-এর শিঙ্গায় ফুঁৎকারের মাধ্যমে পৃথিবী ধ্বংস হবে। এ ধারাবাহিকতায় এই দিনেই প্রিয় নবীর (সা.) প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হোসাইন (রা.) কারবালা ময়দানে ফোরাত নদীর তীরে সপরিবারে শাহাদাতবরণ করেন। মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসেবে সাহাবি হজরত মুয়াবিয়া (রা.) ২০ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার পর ৬০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে মজলিসে শূরা ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে তিনি তার পুত্র ইয়াজিদকে পরবর্তী ‘শাসনপ্রার্থী’ হিসেবে মনোনয়ন দেন। কারণ মক্কা-মদিনা অঞ্চলে হজরত উসমান (রা.)-এর হত্যা-পরবর্তী বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজমান ছিল। তথাপি শাম অঞ্চল ছিল অনেকটাই স্থিতিপূর্ণ। ফলে তিনি তার পুত্রকে ‘শাসনপ্রার্থী’ নির্বাচন করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর ইয়াজিদ খেলাফতের দাবি করে বসেন, শাম অঞ্চলের কিছু মানুষ তা মেনেও নেন। পক্ষান্তরে মদিনার অধিকাংশ মানুষ, ইরাকের অনেকে বিশেষ করে কুফার জনগণ তা মানতে অস্বীকার করেন। কুফার জনগণ নবী-দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.)-কে খলিফা হিসেবে গ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কুফার লক্ষাধিক মানুষ ইমাম হোসাইনকে খলিফা হিসেবে বাইয়াতপত্র প্রেরণ করেন। এ পত্রে তারা দাবি করেন, সুন্নাহ পুনরুজ্জীবিত এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে অবিলম্বে তার দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রয়োজন। তবে মদিনায় অবস্থানরত সাহাবিরা এবং ইমাম হোসাইনের নিকটাত্মীয়রা ইমামকে কুফায় যেতে বারণ করেন। কারণ তারা আশঙ্কা করছিলেন, ইয়াজিদের পক্ষ থেকে বাধা এলে ইরাকবাসী ইমাম হোসাইনের পক্ষ ত্যাগ করবে। এ অবস্থায় ইমাম হোসাইন (রা.) তার চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে ইরাকের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রেরণ করেন। তাকে তিনি এ নির্দেশ প্রদান করেন যে, যদি সে পরিস্থিতি অনুকূল দেখে এবং ইরাকবাসীদের অন্তরকে সুদৃঢ় ও সুসংহত পায়, তাহলে যেন তার কাছে দূত প্রেরণ করে। মুসলিম ইবনে আকিল কুফায় আগমন করার সঙ্গে সঙ্গে ১৮ হাজার কুফাবাসী তার কাছে এসে ইমাম হোসাইনের পক্ষে বাইয়াত গ্রহণ করে এবং তারা শপথ করে বলে, অবশ্যই আমরা জানমাল দিয়ে ইমাম হোসাইনকে সাহায্য করব। তখন মুসলিম ইবনে আকিল ইমাম হোসাইন (রা.)-এর কাছে পত্র পাঠিয়ে জানালেন যে, কুফার পরিস্থিতি সন্তোষজনক, তিনি যেন আগমন করেন। এ সংবাদের ভিত্তিতে ইমাম হোসাইন (রা.) তার পরিবারের ১৯ জন সদস্যসহ প্রায় ৫০ জন সঙ্গী নিয়ে কুফার উদ্দেশে রওনা হন। এ খবর ইয়াজিদের কাছে পৌঁছলে কুফার গভর্নর নোমান ইবনে বশির (রা.)-কে পদচ্যুত করে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে কুফার গভর্নরের দায়িত্ব প্রদান করেন এবং তাকে এই মর্মে নির্দেশ দেন, ইমাম হোসাইন (রা.) যেন কোনোভাবেই কুফায় প্রবেশ করতে না পারে। ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ কুফায় পৌঁছে সেখানকার জনগণকে কঠোর হস্তে দমন করে এবং মুসলিম বিন আকিলকে হত্যা করে। এরপর ইমাম হোসাইন (রা.)-কে প্রতিরোধ করতে চার হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করে।

ইবনে জিয়াদের বাহিনী কারবালার প্রান্তরে অবরোধ করলে হোসাইন (রা.) বললেন, আমি তো যুদ্ধ করতে আসিনি। তোমরা আমাকে ডেকেছ বলে আমি এসেছি। এখন তোমরা কুফাবাসীরাই তোমাদের বাইয়াত পরিত্যাগ করছ। তাহলে আমাদের যেতে দাও, আমরা মদিনার ফিরে যাই অথবা সীমান্তে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি অথবা সরাসরি ইয়াজিদের কাছে গিয়ে তার সঙ্গে বোঝাপড়া করি। কিন্তু ইবনে জিয়াদ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে তার হাতে আনুগত্যের শপথ নিতে আদেশ দেয়। ইমাম হোসাইন (রা.) ঘৃণাভরে তার এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন। অতঃপর আশুরার দিন (১০ মহররম) সকাল থেকে ইবনে জিয়াদের বাহিনী হোসাইন (রা.)-এর ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে এবং ফুরাত নদী থেকে পানি সংগ্রহের সব পথ বন্ধ করে দেয়। হজরত হোসাইন (রা.)-এর শিবিরে শুরু হয় পানির জন্য হাহাকার। হোসাইন (রা.) দুশমনদের কাছে মাথানত না করে সাথীদের নিয়ে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। এ যুদ্ধে একমাত্র পুত্র হজরত জায়নুল আবেদিন (রহ.) ছাড়া পরিবারের শিশু, কিশোর ও মহিলাসহ পুরুষ সাথীরা সবাই একে একে শাহাদাতের অমিয়সুধা পান করেন। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত ইমাম হোসাইন একাই বীরবিক্রমে লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত নির্মম ও নির্দয়ভাবে ইমাম হোসাইনকে শহীদ করা হয়। প্রথমে দূর থেকে তাকে ঘোড়ায় আরোহণ অবস্থায় গলায় তীর বিদ্ধ করা হয়। তারপর আহত হয়ে মরুভূমির বালুতে পড়ে গেলে সিনান বা শিমার নামক এক পাপিষ্ঠ তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। শাহাদাতের পর ইমাম হোসাইন (রা.)-এর ছিন্ন মাথা বর্শার ফলকে বিদ্ধ করে এবং তার পরিবারের জীবিত সদস্যদের দামেস্কে ইয়াজিদের কাছে প্রেরণ করা হয়। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর কর্তিত মাথা দেখে ইয়াজিদ ভীত ও শঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং বাহ্যিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে বলে, আমি তো ইমাম হোসাইনকে শুধু কুফায় প্রবেশে বাধা দিতে নির্দেশ দিয়েছিলাম, তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিইনি। এরপর তার পরিবার-পরিজনকে সসম্মানে মদিনায় প্রেরণ করা হয়। (সূত্র : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

আশুরার ঐতিহাসিক বর্ণনা ও মাহাত্ম্যের কারণে মুসলিম উম্মাহর কাছে দিনটি একদিকে যেমন বেদনার, অন্যদিকে আনন্দ ও ফজিলতেরও বটে। এ মাস অতি সম্মানিত, বরকতময় ও তাৎপর্যপূর্ণ। আশুরার এদিনে অনেক নবী-রাসুল আল্লাহতায়ালার সাহায্য লাভ করেন এবং কঠিন বিপদ-আপদ থেকে মুক্তিলাভ করেন। এ সাহায্যের শুকরিয়া হিসেবে নবী-রাসুলরা ও তাদের উম্মতরা এদিনে রোজা পালন করতেন। এসব ফজিলতের কারণে মুসলমানদেরও বেশি বেশি নফল রোজা রাখতে হয় এবং তওবা-ইস্তেগফার করতে হয়। এ মাসের রোজার ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, একবার হজরত আলি (রা.)-কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিলেন, রমজানের পর আর কোনো মাস আছে কি, যাতে আপনি আমাকে রোজা রাখার আদেশ করেন। হজরত আলি (রা.) বললেন, এই প্রশ্ন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছেও এক সাহাবি করেছিলেন। তখন আমি তার খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‘রমজানের পর তুমি যদি রোজা রাখতে চাও, তাহলে মহররম মাসে রাখো। কারণ এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহতায়ালা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন।’ (তিরিমিজি : ১১৫৭)

এ মাসে বেশি বেশি তওবা-ইস্তেগফার করাও একটি বিশেষ আমল। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মহররম হলো আল্লাহতায়ালার কাছে একটি মর্যাদাবান মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যাতে তিনি অতীতে একটি সম্প্রদায়কে ক্ষমা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অপরাপর সম্প্রদায়কে ক্ষমা করবেন।’ (তিরমিজি : ৭৪১)।

আশুরা হচ্ছে আদর্শ সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে কারবালার লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা সংঘটিত

হয়েছিল—সে আদর্শ ও ইসলামী মূল্যবোধ জাগ্রত করার শপথ গ্রহণের দিন।

লেখক : মুহাদ্দিস ও ইসলামী চিন্তাবিদ

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্যারিসে একুশের কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

রাশিয়ার ভয়ে পিছু হটল ন্যাটো

নসিমন-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ২

২৮ ফেব্রুয়ারি : কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

বুধবার রাজধানীর যেসব এলাকায় যাবেন না

২৮ ফেব্রুয়ারি : নামাজের সময়সূচি

কর্ণফুলী নদীতে ৩ দিন বন্ধ থাকবে ফেরি চলাচল

মিয়ানমার সীমান্ত এখন শান্ত, ফের গোলাগুলি শুরুর আশঙ্কায় আতঙ্ক

বোনাস দাবিতে সার কারখানা শ্রমিকদের মানববন্ধন

সিলেটে পরিবহন শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু আজ

১০

হাসপাতালে রেখে তরুণ-তরুণী উধাও, ছোটমণি নিবাসে ঠাঁই হলো নবজাতকটির

১১

চট্টগ্রামে শাস্তির মুখে ৮ ল্যাব-হাসপাতাল

১২

এবার বাড়ছে সব ধরনের ছোলা ও ডালের দাম

১৩

বিধবা মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার পথে চলন্ত ট্রেনে বাবার মৃত্যু

১৪

দুই সন্তানের জননীকে নিয়ে ‘উধাও’ ইউপি সদস্য

১৫

স্বামী কারাগারে, সন্তান ফেলে উধাও গৃহবধূ

১৬

বেসরকারি ৩ ক্লিনিককে দেড় লাখ টাকা জরিমানা

১৭

আগুনে পুড়ে দাদি-নাতির মৃত্যু

১৮

আমতলী পৌরসভা নির্বাচন / আচরণবিধি ভঙ্গ করে মিছিল, মেয়র প্রার্থীর সমর্থককে সাজা

১৯

স্কুলের সামনে ছাত্রীদের ইভটিজিং, অতঃপর...

২০
X