মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:২৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি

আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক অবিচ্ছেদ্য নাম। মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং স্বাধীনোত্তর সময়ে রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্ব তাকে বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে খেমকারান রণাঙ্গনে জিয়াউর রহমানের সাহসী নেতৃত্ব তাকে একজন দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত করে। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে তার দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ছিল এক মানসিক শক্তির উৎস। মার্কিন কূটনীতিক আর্চার কে. ব্লাড পরে লিখেছেন—জিয়ার ঘোষণা বাঙালি প্রতিরোধ আন্দোলনে ‘মনস্তাত্ত্বিক নেতৃত্বের প্রতীক’ হয়ে ওঠে।

২৫ মার্চের ভয়াল রাতে পাকিস্তানি সেনারা অপারেশন সার্চলাইট চালিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিচ্ছিন্ন করে দিলে, এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে মেজর জিয়া ঘোষণা দেন—‘আমি মেজর জিয়া, বাংলাদেশের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।’

এরপর তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা বারবার প্রচার করেন। এ পদক্ষেপ শুধু একটি বিবৃতি ছিল না; বরং তা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধকে নতুন শক্তি দেয় এবং আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও জিয়া কখনো এ ঘোষণাকে ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে ব্যবহার করেননি। বরং তিনি বারবার বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। এ সংযমই তাকে আত্মপ্রচারবিমুখ অথচ দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ইতিহাসে আলাদা করেছে।

১৯৭৫-এর রাজনৈতিক অস্থিরতার পর জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। সেনাবাহিনী ও রাজনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তিনি বহুদলীয় রাজনীতির দ্বার উন্মুক্ত করেন। গবেষক এস. আকবর জাইদি লিখেছেন—এ সময়ে জিয়া সামরিক শাসনের বাইরে এক ‘সিভিল-পলিটিক্যাল অর্ডার’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।

শেখ মুজিবের একদলীয় শাসনের প্রেক্ষাপটে জিয়া নতুন রাষ্ট্রদর্শন দেন—বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এর মূল স্তম্ভ ছিল—১. স্বাধীন জাতিসত্তার পরিচয়; ২. জনগণের ঐক্য ও গণতন্ত্র; ৩. আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি; ৪. স্বাতন্ত্র্য ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রমনা বটমূল চত্বরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠিত হয়। ঘোষণাপত্রে দলটির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়—বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জাতীয় ঐক্য গঠন এবং আত্মনির্ভরশীল উন্নয়ন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা জয়লাভ করে। নিউইয়র্ক টাইমস মন্তব্য করেছিল—‘President Zia’s leadership has given Bangladesh an unexpected stability and a chance to rise above its image as a bottomless basket.’ (The New York Times, 19 February, 1979)। মালয়েশিয়ার Business Times লিখেছিল—‘Zia has virtually declared war against the endemic problems that once made Bangladesh synonymous with despair.’

জিয়ার উন্নয়ন দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল গ্রামীণ অর্থনীতি। তার জনপ্রিয় স্লোগান—‘গ্রাম হবে শহর’। এ দর্শনের আলোকে তিনি ‘গ্রাম সরকার’, ‘খাল খনন’, ‘যুব পুনর্বাসন’, ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ ইত্যাদি কর্মসূচি চালু করেন। ডক্টর বারকাত-এ-খুদার মতে, এটি ছিল ‘গ্রামীণ অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা’ গড়ার এক নতুন রূপরেখা।। লক্ষণীয় যে, এসব প্রকল্পে কখনো তার নাম ফলক লাগানো হয়নি কিংবা ব্যক্তিগত প্রচার চালানো হয়নি।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও তিনি ছিলেন বাস্তববাদী। বাংলাদেশকে ভারতকেন্দ্রিক নির্ভরশীলতা থেকে বের করে এনে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তার অন্যতম ঐতিহাসিক অবদান ছিল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা—SAARC-এর ধারণা প্রদান। গবেষক রেহমান সোবহান (১৯৯০) উল্লেখ করেছেন, জিয়ার এই প্রস্তাব দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার এক নতুন কাঠামো তৈরি করে, যা পরবর্তীকালে আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। সার্বিকভাবে, জিয়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে এক বাস্তববাদী ও বহুমাত্রিক রূপ দিয়েছিলেন, যেখানে জাতীয় স্বার্থই ছিল প্রধান নিয়ামক। তার এ দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের কূটনীতিকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকঅঙ্গনে নতুন পরিচিতি দেয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আত্মপ্রচার একটি সাধারণ প্রবণতা হলেও জিয়া ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি কখনোই নিজের নামে কোনো স্কুল, কলেজ বা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেননি। খালেদা জিয়া একাধিকবার বলেছেন, ‘জিয়া জীবনে কোনোদিন নিজের নামে কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাস্তার নামকরণে আগ্রহী ছিলেন না।’

জনসভায় বা সংসদে তিনি কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ না করে সর্বদা রাষ্ট্র, উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের কথা বলেছেন। তার জনপ্রিয় স্লোগান ‘উৎপাদন বাড়াও, দেশকে ভালোবাসো’ ছিল জাতির উদ্দেশে একটি আহ্বান, নিজের উদ্দেশ্যে নয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। কিন্তু তার রেখে যাওয়া দর্শন—বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা ও স্বাধীন কূটনীতি—আজও বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শুধু মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক নন; তিনি আধুনিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণের অন্যতম প্রধান স্থপতি। তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি আজও জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারক হিসেবে রাজনীতিতে কার্যকর শক্তি হয়ে আছে। জিয়ার জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায়—রাষ্ট্রগঠন ও উন্নয়ন প্রচেষ্টার আসল শক্তি প্রচারে নয়, কাজে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তিনি তাই শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং এক নীরব নির্মাতা, কর্মই যার প্রকৃত পরিচয়।

লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক ও সাংবাদিক

দুবাই প্রতিনিধি, দৈনিক কালবেলা

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিশ্বকাপ টিকিট নিয়ে অনিয়ম করছে যুক্তরাষ্ট্র : ইরান

৬৬ জনকে চাকরি দেবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, এসএসএসি পাসেই আবেদন

লাল কার্ড দেখলেই ফ্রি পিৎজা

যুবদল নেতার ইয়াবা সেবনের ভিডিও ভাইরাল

ঢাকার দুই সিটির প্রশাসক সরকারি টাকায় নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন: আসিফ

রিকশায় যাওয়ার পথে জজ বান্ধবীর কথা স্মরণ করে অভিজ্ঞতা জানালেন মাহমুদা মিতু

আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা নিয়ে গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান ইরানের

যাত্রাবাড়ীতে ১৬ হাজার ইয়াবাসহ দক্ষিণাঞ্চলের কুখ্যাত মাদককারবারি গ্রেপ্তার

সীমান্তের ৮ পয়েন্ট দিয়ে শতাধিক নাগরিককে পুশইনের চেষ্টা

অর্থবছর হিসেবে জুন-জুলাইকে পরিবর্তনের দাবি বিরোধীদলের

১০

আ.লীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার 

১১

হাইকোর্টে জামিনের পর জেলগেটে ফের আটক আ.লীগ নেতা

১২

মেসির হ্যাটট্রিকের এই দিনে ব্রাজিলকে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা

১৩

পদ্মার চরে আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষ, গুলিবিদ্ধ যুবকের লাশ উদ্ধার

১৪

অসহায় বাবার আকুতি, সন্তানের চিকিৎসায় পাশে দাঁড়ালেন ছাত্রদল নেতা তারিক

১৫

বিপুল পুলিশ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে সিআইডির তল্লাশি

১৬

‘বেকারত্বের অভিশাপ মোচনের বাজেট ঘোষণা করুন’

১৭

তারল্য চাপ সামলাতে ১০ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চায় ইসলামী ব্যাংক

১৮

বাজেটে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সুখবর

১৯

বিশ্বনেতাদের সামনে শ্রমিক অধিকারের দাবি তুললেন শিমুল বিশ্বাস

২০
X