

৩৫ বছর আগে কোনো এক গভীর রাতের আঁধারে আমার পরিবার একত্র হয়েছিল একটি ধার করে আনা ভিসিআরের সামনে। টেলিভিশনের পর্দায় যে চিত্র ভেসে উঠেছিল, সেটা দেখতে গিয়ে বারবার আমার মনে হচ্ছিল, যেন নিষিদ্ধ কোনো দৃশ্য দেখছি। ফিলিপাইনের শাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের পতন নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র ছিল সেটি। নেপালের বর্তমান বিপ্লবের চিত্র দেখতে গিয়ে আমার সেই সময়টার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
নেপাল তখন ছিল পঞ্চায়েত ব্যবস্থার অধীনে। দেশে চলছিল দলবিহীন এক স্বৈরাচারী শাসন, যেখানে বাকস্বাধীনতা ছিল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। সেই পরিস্থিতিতে নিজের ঘরে বসে স্বৈরতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, এমন চলচ্চিত্র দেখার ঘটনাকেও সহজেই রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ড বলে চালিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু দমনচক্র চিরকাল টিকে থাকে না। ১৯৯০ সালের শুরুতেই উন্মুক্ত প্রচারপত্র থেকে শুরু করে ভিত্তিহীন গুজব, সবই মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে শুরু করল।
ধীরে ধীরে গোপন আলাপচারিতা রূপ নিল প্রকাশ্য বিক্ষোভে। জনসমুদ্র রাস্তায় নেমে এলো পরিবর্তনের দাবিতে। অবশেষে রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেব নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ত্যাগ করে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের পথ বেছে নিলেন। বাধ্য হয়ে উন্মুক্ত করে দিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ। আমার স্মৃতিতে প্রথমবারের মতো আমরা পেলাম সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও যথার্থ সমালোচনার সুযোগ।
১৫ বছর বয়সী আমি তখন এক নতুন আশাবাদে ভরপুর। প্রথম জনআন্দোলনের সামনে ছিলেন নতুন প্রজন্মের গণতান্ত্রিক নেতারা, যাদের মধ্যে শের বাহাদুর দেউবা এবং কেপি শর্মা অলির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তখন কিন্তু তাদের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। কারণ, এক উন্মুক্ত নেপালি সমাজের স্বপ্নে কারাবাস ও নির্যাতন সহ্য করেছিলেন তারা।
কিন্তু পরিবর্তনের প্রত্যাশায় শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হলেও সেই রূপান্তরের অনুভূতি সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব রূপ নেয়নি। বৈষম্য ও বঞ্চনা রয়েই গেল; অনেকের কাছে সুরক্ষিত কর্মসংস্থান অধরাই থেকে গেল। টালমাটাল সরকার গড়ে উঠল বারবার। প্রতি দুই বছর অন্তর ঘটতে থাকল ক্ষমতার পালাবদল। দুর্নীতি ও দায়মুক্তি শাসনব্যবস্থা কলুষিত করে তুলল। তাই নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি এসে তরুণদের ভেতরে আবারও ছড়িয়ে পড়ল গভীর হতাশা।
একপর্যায়ে এ ক্ষোভই বিদ্রোহের উর্বর ভূমি হয়ে উঠল। বামপন্থি নেতা পুষ্পকমল দাহাল, যিনি ‘প্রচন্ড’ নামে খ্যাত ছিলেন, তার নেতৃত্বাধীন মাওবাদী বিদ্রোহ তরুণদের সেই হতাশাকে পতাকার রূপ দিল। সংসদীয় সংস্কারে আস্থা হারানো হাজারো মানুষ অস্ত্র তুলে নিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। ১৯৯৬ সালে নেপাল রাষ্ট্রটি ধাবিত হলো গৃহযুদ্ধের দিকে।
এরপর ২০০১ সালে আবারও সবকিছু পাল্টে গেল। রাজপ্রাসাদে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারালেন রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ, রানি ঐশ্বর্য রাজলক্ষ্মী দেবী শাহসহ প্রায় পুরো রাজপরিবার। দেশ স্তম্ভিত হয়ে পড়ল। গুজব ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। আর রাজতন্ত্রের ওপর নেপালি প্রজাদের বিশ্বাস ভেঙে গেল। তারপরও রাজা বীরেন্দ্রর ভাই জ্ঞানেন্দ্র শাহ সিংহাসনে বসলেন। তখনই জনগণ রাজতন্ত্রের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিল। এ সবকিছুর মধ্যে ২৫ বছর বয়সী আমি বুঝতে পারলাম যে, নেপালের রাজনৈতিক ভিত্তি ভীষণ নড়বড়ে।
১৯৯০ সালের গণতান্ত্রিক আশ্বাস হয়তো স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; কিন্তু ২০০১ সালের ঘটনা প্রমাণ করল সেই প্রতিশ্রুতি ব্যর্থ। গৃহযুদ্ধ চলাকালে রাজপ্রাসাদের হত্যাকাণ্ডের পর ২০০৫ সালে রাজা জ্ঞানেন্দ্র জরুরি অবস্থা জারি করলেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করে নেওয়া হলো। তখন রেডিওতে আর খবর শুনতে পাওয়া যেত না। সারাদিন বাজত শুধু গান। সংবাদপত্রে প্রতিবাদের পাতাগুলো ফাঁকা রয়ে যেত। কেটে দেওয়া হয় অসংখ্য ফোনের লাইন। এ পরিস্থিতিতে নেপাল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল পুরো বিশ্ব থেকে।
দীর্ঘকাল ভয় দেখিয়ে দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু তাতে শাসকগোষ্ঠীর কোনো ফায়দা হয়নি। উল্টো সেই দমননীতির কারণেই গড়ে উঠল নতুন প্রতিরোধ। ২০০৬ সালের এপ্রিলে টানা ১৯ দিন পুরো দেশব্যাপী বিক্ষোভ আর ধর্মঘটে কেঁপে উঠল নেপাল। একজন তরুণ সাংবাদিক হিসেবে আমি নিজ চোখে দেখেছিলাম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যুবসমাজ কেমন করে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছিল। অতঃপর আন্দোলন শেষে মাওবাদীরা মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করল।
২০০৮ সালের মে মাসে গণপরিষদ রাজতন্ত্রের সঙ্গে বন্ধন ছিন্ন করল। এক মাস পর আমি জনতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম রাজা জ্ঞানেন্দ্র তার শেষ ভাষণ দিচ্ছেন। ভাষণ শেষে তিনি বিদায় নিলেন প্রাসাদ থেকে। নেপাল প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। ক্ষণিকের জন্য সত্যিই মনে হয়েছিল, এবার আমরা হয়তো এক জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব।
কিন্তু সেই সম্ভাবনার বাস্তব রূপ আর দেখা গেল না। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক যে নতুন প্রজাতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বরাবরের মতোই ব্যর্থ হলো। দলিত, মাধেশি ও অন্যান্য জাতিগত সম্প্রদায় সমঅধিকার ও স্বীকৃতির দাবিতে রাস্তায় নেমে এলো। কিন্তু রাষ্ট্রীয় দমনচক্র পুরোপুরিভাবে নিঃশেষ করা গেল না। একটি নতুন শব্দ নেপালিদের মধ্যে ব্যবহৃত হতে শুরু করল—পিয়ন (পি.ই.অ.ন), যা দিয়ে বোঝায় ‘পার্মানেন্ট এস্টাবলিশমেন্ট অব নেপাল’। অর্থাৎ সেই গোষ্ঠী, যারা প্রজাতন্ত্র বাস্তবায়ন ও ফেডারেল ব্যবস্থা কায়েমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
দেউবা, অলি ও প্রচন্ডদের মতো নেতারা, যারা একসময় পরিবর্তনের প্রতীক ছিলেন, তারা ক্রমেই হয়ে উঠলেন উদাসীন। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন তারা। দেশে দুর্নীতি জেঁকে বসল। রাজনীতের প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে সেবা খাতসহ সব জায়গায় স্বজনপ্রীতি অলিখিত নীতিতে পরিণত হলো। মানুষ জনপ্রতিনিধিদের নতুন নামে ডাকতে শুরু করল—‘নতুন দিনের রাজা’।
আমার প্রজন্মের বহু মানুষ, যারা একসময় সংস্কারের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিল, তারা এই অনন্ত ন্যায়সংগত প্রতিনিধিত্বের লড়াইয়ে ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। আমাদের ভেতরে জন্ম নিল এক ধরনের সংশয় আর ক্রোধ। আজ ৫০ বছর বয়সে আমি আবারও প্রত্যক্ষ করছি এক নতুন অস্থিরতা। তবে এবার পরিবর্তনের গতিধারা খানিকটা ভিন্ন। এবার নতুন অধ্যায়ের সূচনাটা রাজপথে হয়নি, হয়েছে অনলাইনে।
২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির সরকার ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করলে তা সঙ্গে সঙ্গেই যুবসমাজের ক্রোধের স্ফুলিঙ্গ হয়ে ওঠে। প্রতিবাদের আহ্বায়করা ভিড় জমালেন অনলাইনে বিভিন্ন চ্যাটরুমে। যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিছুদিন আগেও ছিল শুধু বিনোদনের মঞ্চ, সেটা পরিণত হলো রাজনৈতিক প্রতিবাদের মঞ্চে।
বস্তুত জনসাধারণের মধ্যে অনেক দিন ধরেই ছিল চাপা ক্ষোভ। অর্থনৈতিক হতাশা, কর্মসংস্থানের অভাব আর অভিজাত শ্রেণির নির্লিপ্ত ভোগ-বিলাস দেশের সাধারণ নাগরিকদের বিরক্ত ও বিতৃষ্ণ করে তুলেছিল। ক্ষমতাধরদের পরিবারের সদস্যরা তাদের বিদেশ ভ্রমণ, দামি পোশাক, বিলাসবহুল জীবনযাপনের চিত্র দেখিয়ে বেড়াচ্ছিল আর সেসব দৃশ্যের বিপরীতে একই সময়ে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ছিল দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নেপালি শিশুদের ছবি। দেশের তরুণ সমাজের সহ্যের সীমালঙ্ঘন হয়ে গেল।
৮ সেপ্টেম্বর যখন ‘জেন-জি’ রাস্তায় নামল, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। সহিংস দমন অভিযানে প্রাণ গেল ১৯ জনের। তারপরই শুরু হলো বিশৃঙ্খলা। সংসদ ভবন, আদালত; এমনকি ঐতিহাসিক সিংহদরবার পর্যন্ত জ্বলে উঠল আগুনে। ভেঙে পড়ল জনপরিকাঠামো, কারাগার থেকে হাজারো কয়েদি পালাল, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটতে শুরু করল আইনশৃঙ্খলার অবক্ষয়। এর মধ্যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রাথমিক সংগঠকরা আরও আক্রমণাত্মক গোষ্ঠীদের কাছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন।
পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর অগত্যা প্রধানমন্ত্রী অলি পদত্যাগ করলেন। ক্ষমতাসীন নেতাদের ওপর শুরু হলো হামলা। তাদের বাড়িঘর ধ্বংস করা হলো। আদর্শ থেকে জন্ম নেওয়া এক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হয়ে উঠল বিশৃঙ্খল ও জ্বালাময়ী। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী দায়িত্ব নিল। এরই মধ্যে ঘটে যায় ৭০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানির ঘটনা। গুজব, ভ্রান্ত তথ্য আর ক্ষমতা গ্রহণের পাল্টাপাল্টি দাবিতে দেশ এক দোদুল্যমান অবস্থায় এসে দাঁড়াল।
দুদিনের আলোচনার পর অবশেষে প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত করা হলো সুশীলা কার্কিকে। তিনি নেপালের প্রথম নারী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। এর মধ্য দিয়ে সততা ও দৃঢ়নীতির জন্য পরিচিত সাবেক প্রধান বিচারপতি কার্কি দক্ষিণ এশিয়ায় ইতিহাস গড়লেন। কারণ, তিনি কোনো রাজনৈতিক বংশপরম্পরার উত্তরাধিকার নন। প্রথমবারের মতো দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক পরিবারের ক্ষমতাচর্চা বা দলীয় প্রতিনিধি হওয়া ছাড়া কোনো নারী একটি রাষ্ট্র এবং তার সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
যদিও এ পালাবদলে নেপালের জেনারেশন জেড বা জেন-জিই নেতৃত্ব দিয়েছিল, তথাপি আন্দোলনের দরুন সহিংসতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিল, সবচেয়ে ন্যায়সংগত আন্দোলনও কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত রূপ ধারণ করতে পারে। এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আবারও ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে পড়ে কিংবা আমরা যদি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাকে স্থায়ী সংস্কারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি, তবে কঠোর সংগ্রামে অর্জিত স্বাধীনতা আবারও হারিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কাজেই, জনগণ ও সরকার উভয়কেই সচেতনতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হবে। সামনের দিনগুলো বেশ সংকটপূর্ণ হতে যাচ্ছে, শত বিপত্তির মুখেও দিশা হারানো চলবে না। আজকের নেপাল আমাকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, যতই শঙ্কা থাকুক না কেন, আশাবাদই গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অবিচল প্রেরণা।
লেখক: যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত নেপালি লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্যান ফাউন্ডেশনের ফেলো। নিবন্ধটি তুর্কি গণমাধ্যম ‘টিআরটি ওয়ার্ল্ড’-এর মতামত বিভাগ থেকে অনুবাদ করেছেন অ্যালেক্স শেখ