

‘এইটা কী হোলো!! না না, এ তো হবার কথা নয়। ঢাবির প্রগতিশীল মুক্তমনা জেন-জি, কী কোরে এ্যামন ভোট দিল যে আমাদের চক্ষু-চড়ক গাছ! আরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমিই তো ডাকসুতে নির্বাচন করে, প্রগতিশীল বাম ঘরানার আধুনিক মনোভাবসম্পন্ন ছাত্রছাত্রীদের ভোটে বিজয়ী হোয়েছি। আর বর্তমানের জেন-জির ছাত্ররা আমাদের হাজার বছরের পিছুটান দিচ্ছে। এটা কি মানা যায়? নাকি মানা উচিত?’
‘বাইডি, আন্নে চ্যেতেন ক্যা! হ্যেতারা তরুণ প্রজন্ম। হ্যেতা-হ্যেতিরা যুদি আন্নের মতে হাজার বছর হিছে মানে অতীতে যাইতে চায় তো আন্নের পুপ...পুপ...জ্বলে ক্যা?’
‘কী বলছিস তুই, জ্বলবে না! তুই এই জ্বালা বুঝিস, আমরা ৭১ সালে, আগরতলায় বামাদের ঘরে, এক মেঝেতে ষাট-সত্তরজন মুক্তিযোদ্ধা শুয়েছি। কোনোদিন নাস্তা জুটেছে, কোনোদিন জোটেনি, ডাইরেক্ট দুপুরের ভাত, ডাল আর আলু ছানা দিয়ে খাবার খেয়ে তরুণরা রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বর্বর পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই কোরেছি, লক্ষ লক্ষ ভাই প্রাণ দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে কি এই দৃশ্য দ্যেখার জন্য! যারা বাংলাদেশের জন্মের বিরুদ্ধে ফাইট করল আজ তারাই দেশ পরিচালনা কোরবে! এই কি প্রগতিশীল জেন-জির, তরুণদের মানসিকতা!’
‘মনু আন্নে চ্যেতেন ক্যা! হ্যেতারা এইচএসসি পাস প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ। হ্যেতাগো যারে মন চায় তারে ভুট দিব। এইডা তো কুনো পার্টি পলিট্রিক্স ন, এইডা তো ছাত্রগো নিজস্ব বিষয়, এহানে আন্নে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এইসব ধরি টানেন ক্যা?’
‘বলিস কি, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, এসব নিয়ে টানব না। মাত্র চুয়ান্ন বছরের মাথায় পাবলিক অধৈর্য হয়ে আবার দাও ফিরে সে অরণ্য! এটা হয় নাকি!’
‘এই চুয়ান্ন বছরে আন্নেরা বাঘা বাঘা টাইগররা দেশ চালাইবার নামে চামে চামে খালি মাল কামাইলেন, স্বৈরাচারী পাকিস্তানি সরকার আয়ুব খানের বিরুদ্ধে যে কারণে ফাইট দিলেন, হেইডা তো পালন করলেন না। কোই ছিলেন কেউ খাবে কেউ খাবে না, তা হবে না তা হবে না। কিন্তু যহনই প্রশাসনে গ্যেছেন, তহনই খালি মাল কামায়ছেন। একলা খাইছেন। একই ব্যাডার ইংল্যান্ডে ৩৬০টা বাড়ি লজ্জা করে না! শহীদ মুক্তিযোদ্ধার রক্তের লগে আপনেরা বেইমানি করেন নাই? বুকে হাত দিয়া কন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাগো লগে আপনেরা বেইমানি করেন নাই?’
‘বিষয়টা এভাবে দেখলে তো হবে না। তুই দ্যেখ, ইসলামের স্বর্ণালি সময়ে আব্বাসীয় বংশ বাদশাহ হারুনর রশিদের মতো বাদশাহ নিয়ে প্রায় পাঁচশ বছর দেশ পরিচালনা কোরেছেন। সারা বিশ্ব তখন ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধায় কুর্ণিশ কোরেছে; ওমর খৈয়ম, আল জাবুর, আল বেরুনি, ইবনে সিনা, আবুল হাইত্তাম...’
‘তো আন্নে কি বলতে চাচ্ছেন যে, আপনাদের দেশ পরিচালনার স্টাইল দেখে সারা বিশ্ব বাংলাদেশকে ছেলাম দিবে যে?’
‘আরে আমি বলছিলাম আব্বাসীয় বংশ বাদশাহ হারুনর রশিদের মতো বাদশাহ নিয়ে প্রায় পাঁচশ বছর দেশ পরিচালনা কোরেছেন, আর আমাদের তো মাত্র চুয়ান্ন বছরের মতো, তাহলে আমাদের পাঁচশ না হোক একশ বছর সময় দিলেই আমরা সোনার বাংলাকে হীরার বাংলায় পরিণত করতাম।’
‘ও বাব্বারে, এ্যমনে চলে না, আবার ত্যানা প্যেঁচায়া। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই যারা দেশ পরিচালনার সুযোগ পাইল তাগোরে ফ্যামিলি শুদ্ধা ফুডা কোরলেন, সারা দেশে একটা প্রতিবাদ হয় নাই। উল্টা দেশে-বিদেশে অনেক জায়গায় মাইনষ্যে মিষ্টি বিলাইছে। তারপর আরেক মুক্তিযোদ্ধারে পাবলিকে মাথায় কোইরা আইন্না দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিল। মানি ইজ নো প্রবলেম কয়া হ্যেরেও ফুডা কোরলেন। দশ বছর না যাইতেই খালি ফুডা আর ফুডা, একশ বছর থাকলে তো সোনার বাংলা, আকাশের তারার মতো ফুডার বাংলায় রূপ লোইতো।’
‘না বলছিলাম, ভালো কাজের জন্য টাইম দিতে হয়। দেখিস না, ঘাস কত তাড়াতাড়ি জন্মায় কিন্তু বটগাছ জন্মাতে সময় লাগে। তাই বলছিলাম তোরা আর একটু ধৈর্য ধরে আমাদের অন্তত একশ বছর সময় দেওয়া উচিত ছিল।’
‘ক্যা, এই অল্প সময়েই আপনেরা, হাজার হাজার কুটি ট্যাকা বিদেশে থুয়া আইছেন, ঘরের ভিতর বস্তা বস্তা ট্যাকা ফালায়া রাখছেন, ক্যাসিনো কাণ্ড চালাইছেন। গুম কোরছেন, খুন কোরছেন, একশ টাকার বিরিয়ানি তিন হাজার টাকায় কিনছেন, তনু হত্যা, সাগর-রুনি হত্যার বিচারও করেন নাই।’
‘আরে ব্যাটা সাগর-রুনি অন্য কেস। দেখিস না তোর ফুটানি মারা প্রশাসন সাগর-রুনি নিয়ে এখন আর কোনো কথা বলে না!! তাই বলছিলাম সব স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দেওয়া উচিত নয়।’
‘তো আপনিই বলে দ্যেন যে স্পর্শকাতর জায়গায় হাত না দিয়া কোথায় হাত দিব?’
‘সবসময় উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর কথা মনে রাখবি, “সব শালাকে ছেড়ে দিয়ে, বেঁড়ে শালাকে ধর...” মানে কক্সবাজারে ওসি ধরবি, বুয়েটের হত্যার রহস্য উন্মোচন কোরবি, সাগিরা হত্যা মামলার সমাধান কোরবি, এইসব আর কি।’
‘আন্নের কি মনে লয় না, চুয়ান্ন বছরে আন্নেরা যা কোরছেন অহন তার কর্মফল ভোগ কোরতাছেন।’
‘ইনে ওয়ে তুই ঠিকই বলেছিস। চুয়ান্ন বছরে দরজার চৌকাঠ পর্যন্ত খুবলে নিয়েছে একশ বছর থাকলে হয়তো কবর থেকে তুলে তুলে এনে আগুন দিয়ে পোড়াত!’
‘থাক খামখা আর মোন খারাপ কোইরেন না। যা হওনের হোইছে, অহন দ্যেখেন সামনের জাতীয় নির্বাচনে কী হয়।’
‘ঠিক আছে তোর কথামতো ওয়েট কোরি। ওয়েটিং ফর স্যামুয়েল বেকেটে, ওয়েটিং ফর গোডো... ওয়েটিং ফর কামিং নির্বাচন...’
লেখক : রম্যরচয়িতা ও চলচ্চিত্রকার