

ফিলিস্তিনির গাজায় প্রায় দুই বছর ধরে ইসরায়েল যে নজিরবিহীন গণহত্যা চালাচ্ছে, পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে গণহত্যা হিসেবে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানালেও, জাতিসংঘ এটাকে এবারই প্রথম গণহত্যা বলে স্বীকৃতি প্রদান করল। জাতিসংঘের তরফ থেকে ফিলিস্তিন প্রশ্নে এ অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন যে প্রতিবেদন মঙ্গলবার প্রকাশ করে, সেখানে বলা হয়েছে যে, ২০২৩ সালে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কোনো সংঘাত বা যুদ্ধে যে কর্মকাণ্ডগুলো করলে তা গণহত্যা বলে গণ্য হয়, গাজার ক্ষেত্রে এমন পাঁচটি কাজের চারটিই সংঘটিত করেছে ইসরায়েল। এ সময় ইসরায়েলি সৈন্যরা, একটি গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা করেছে; তাদের গুরুতর ক্ষতি করেছে শারীরিক ও মানসিকভাবে। এ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে ওই গোষ্ঠীটি ধ্বংস করার জন্য পরিকল্পিত পরিস্থিতি তৈরির পাশাপাশি জন্ম রোধ করার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধ তারা করেছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা বলে স্বীকৃত। এ ছাড়া জাতিসংঘ তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন ইসরায়েলের নেতাদের বিবৃতি এবং তাদের সেনাবাহিনীর আচরণের ধরনকে গণহত্যার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অবশ্য এ প্রতিবেদনকে প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা এ প্রতিবেদনকে ‘বিকৃত ও মিথ্যা’ বলে নিন্দা জানিয়েছে।
আমরা জানি, ফিলিস্তিনের গাজা থেকে হামাস ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামলা চালায়। এতে দেশটির প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়। আহত হয় অনেকেই। নজিরবিহীন হামলার পর থেকেই মূলত গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এর পর থেকে প্রায় দুই বছরে গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তারা। এখন পর্যন্ত ৬৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের প্রায় সবাই বেসামরিক বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, নিহতের মধ্যে বড় একটি অংশ নিরপরাধ নিষ্পাপ শিশু। এর সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। আহতের সংখ্যা প্রায় পৌনে দুই লাখ। বাস্তুচ্যুত প্রায় পুরো গাজাবাসী অর্থাৎ ২৩ লাখ। দুই বছরের এ অভিযানে গাজা এখন একটি ধ্বংসস্তূপ। সেখানে শুরু হয়েছে দুর্ভিক্ষ। না খেয়ে মারা যাচ্ছে শিশুরা। এখন পর্যন্ত না খেতে পেয়ে মারা গেছে ৪০৪ শিশু। শুধু ত্রাণ নিতে গিয়েই মৃত্যু হয়েছে প্রায় দেড় হাজার। এ ছাড়া ত্রাণকর্মী চিকিৎসক-সাংবাদিক কেউই রেহাই পাচ্ছেন না ইসরায়েলের বর্বরতা থেকে। এখন পর্যন্ত দুই হাজার ত্রাণকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে প্রায় আড়াইশ সাংবাদিককে। এ ছাড়া ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার বোমা হামলায় গাজার ৯০ শতাংশেরও বেশি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ইসরায়েলি আগ্রাসনের ফলে এখন গাজায় চলছে তীব্র খাদ্যসংকট, মানে দুর্ভিক্ষ। প্রযুক্তির কল্যাণে ইসরায়েলের এ নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ এখন পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষই জানছে। অথচ আধুনিক সভ্যতার এ যুগেও নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষের ওপর এ অনাচার ঘটছে, ঘটাচ্ছে এবং ঘটতে দেওয়া হচ্ছে! এ সভ্যতায় এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ও লজ্জার আর কী হতে পারে?
আমরা মনে করি, ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ওপর হত্যাযজ্ঞকে শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের ‘গণহত্যা’ স্বীকৃতির প্রভাব চলমান হত্যাযজ্ঞ থেকে ইসরায়েলকে বিরত করতে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পারবে। বিলম্বে হলেও জাতিসংঘের এ ভূমিকাকে সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের ওপর এ নারকীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সমগ্র বিশ্ব একই ভূমিকা নেবে এবং অচিরেই এর অবসান হবে।