

আকাশবাণীর মহালয়ার মহিষাসুরমর্দিনীতে সনাতন হিন্দুধর্মের হাজার বছরের দর্শন আর সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখা যায়। এর দার্শনিক দিক হৃদয়াঙ্গম করা কষ্টকর হলেও তা মনোমুগ্ধকর শব্দচয়ন, ভাষার আলংকারিক প্রয়োগ আর সংগীতের মাধুর্যে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে দেবী মহামায়ার মাহাত্ম্য প্রচারের মধ্য দিয়ে অতি সুনিপুণভাবে সনাতন ধর্মের মূল বিষয়বস্তু ও দার্শনিক ভাবনা ধরা পড়ে। এক কথায় অতুলনীয় ও কালোত্তীর্ণ। শ্রী বাণী কুমার রচিত ও শ্রী পঙ্কজ কুমার মল্লিক কর্তৃক সংগীত পরিচালনায় অনন্য অসাধারণ কাজ সাধারণের কাছে ভক্তিসুধাসহ কণ্ঠের সুনিপুণ শ্লোক পাঠ ও গ্রন্থনা করে বাঙালির শারদীয় দুর্গাপূজার মহালয়ায় এ অনুষ্ঠান প্রাতঃস্মরণীয় করেছেন শ্রী বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র।
শ্রী চণ্ডীর ধ্যান শ্লোক ০২-এর বর্ণনার মাধ্যমে শুরু, যেখানে সংক্ষেপে দেবীর মাহাত্ম্য প্রকাশিত হয়েছে চণ্ডিকা মধুকৈটভাদি-দৈত্যনাশিনী ও মহিষাসুরমর্দিনী। তারপর বাংলায় আশ্বিনের শারদপ্রাতে শারদীয় দুর্গাপূজার প্রকৃতির অপরূপ বর্ণনা শ্রবণেন্দ্রিয়কে করে বিমোহিত, মানবমানবী শুনতে আগ্রহী হয়ে ওঠে ভদ্রমহোদয়ের অপূর্ব কণ্ঠে উচ্চারিত হয়—‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর; ধরণির বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা; প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমনী বার্তা।’
পৃথিবীর মেঘমালার সঙ্গে প্রকৃতির শরৎকালের রূপে যে পূজার আয়োজন তাতে দেবীর আগমনের বহিঃপ্রকাশ। আনন্দময় শ্যামলী মা, যিনি চিন্ময়ী তাকে মৃণ্ময়ী রূপে আবাহন করা হয়। এটায় মায়ের আগমন, ভাবগত থেকে বস্তুগত, চিন্ময় থেকে মৃণ্ময়, মানব চক্ষুর সম্মুখে মা-এর রূপে। এমন আগমন আর কোথায় হয়। সর্বশেষ লাইন ‘চিৎ-শক্তিরূপিণী বিশ্বজননীর শারদ-স্মৃতিমণ্ডিতা প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে ধ্যানবোধিতা’ এখানে চমৎকারভাবে শারদীয় দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য বর্ণিত—চিৎ অর্থাৎ মনের আরাধ্য বিশ্বজননীকে মন্দিরে মন্দিরে ধ্যানযোগে আরাধনার মহাপ্রয়াস।
এরপর শ্রীশ্রী চণ্ডী, মহাসরস্বতীর ধ্যান, শ্লোক পঠিত হয় অসাধারণ ছন্দে, যেখানে দেবীর রূপ বর্ণিত। কিন্তু তার পরই বাংলায় অত্যন্ত সহজ কিন্তু ছন্দময় স্বরে ঈশ্বরে এক ও সাকার-নিরাকার দার্শনিক মত দেবীর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপের মাধ্যমে বর্ণিত—‘মহামায়া সনাতনী, শক্তিরূপা, গুণময়ী। তিনি এক, তবু প্রকাশ বিভিন্ন—দেবী নারায়ণী, আবার ব্রহ্মশক্তিরূপা ব্রহ্মাণী, কখনো মহেশ্বরী রূপে প্রকাশমানা, কখনো বা নির্মলা কৌমারী রূপধারিণী, কখনো মহাবজ্ররূপিণী। ঐন্দ্রী, উগ্রা শিবদূতী, নৃমুণ্ডমালিনী চামুণ্ডা, তিনিই আবার তমোময়ী নিয়তি। এই সর্বপ্রকাশমানা মহাশক্তি পরমা প্রকৃতির আবির্ভাব হবে, সগুলোক তাই আনন্দমগ্ন।’ যেখানে দেবীই সবকিছুর কারণ; এমনকি শেষে তমোময়ী নিয়তি অর্থাৎ মৃত্যু বা মহাপ্রলয় কিন্তু তার জন্য সবাই আনন্দমগ্ন, সৃষ্টি ও বিনাশের মাঝে পরিলক্ষিত হয় আনন্দের জয়গান। কবিগুরুর লেখায় তা যেন এরই প্রতিধ্বনিত রূপ—‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’
সংগীতের মধ্যে প্রকৃতি ও পূজা বর্ণনার পর ফের ব্যক্ত হয় সনাতন ধর্মের মূল সত্ত্বঃ, রজঃ ও তমোঃ গুণের বর্ণনা। যেখানে দেবী দুর্গাকে ত্রিগুণাত্মিকা বলা হলো, তিনিই মহামায়া, ... হে ভগবতী মহামায়া, তুমি ত্রিগুণাত্মিকা; তুমি সত্ত্বগুণে ব্রহ্মার গৃহিণী বাগদেবী, রজগুণে বিষ্ণুর পত্নী লক্ষ্মী, তমোগুণে শিবের বর্ণিতা পার্বতী আবার ত্রিগুণাতীত তুরীয়াবস্থায় তুমি অনির্বচনীয়...। এ তিন গুণের মধ্যেই জীবনের জীব সত্তা, যা জীবনে প্রতিক্ষণে অনুভূত হয় আর তাই চিন্ময়ীরূপে গুণের আধার এ মহামায়া। পরক্ষণেই ‘এই ঊষালগ্নে, হে মহাদেবী, তোমার উদ্বোধনে বাণীর ভক্তিরসপূর্ণ বরণ কমল আলোক শতদল মেলে বিকশিত হোক দিকে-দিগন্তে’ ভাষায় শব্দবিন্যাসের উৎকর্ষতার মাধ্যমে এত মনোনিবিষ্ট প্রার্থনা বিরল। এখানে বাণী তথা স্তব বা সংগীত বা জ্ঞান যার সঙ্গে ভক্তিরস তথা প্রেমসুধা নিয়ে বরণ করার কথা উল্লেখ করে বলা হলো, যার তুলনা প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো বিকশিত হবে সবদিকে। এমন করে প্রার্থনা হয়ে ওঠে জীবন আনন্দের প্রতিচ্ছবি। ফের একটি গান গীত হয়, যা মনোজগতে দেবীসত্তাকে জাগরিত করার প্রার্থনা। এর পরই সনাতন ধর্মের মূল সৃষ্টিকর্তার রূপতত্ত্ব এক লাইনে বিধৃত—দেবী চণ্ডিকা সচেতন চিন্ময়ী, তিনি নিত্য, তার আদি নেই, তার প্রাকৃত মূর্তি নেই, এই বিশ্বের প্রকাশ তার মূর্তি। অর্থাৎ বিশ্ববহ্মাণ্ডের যা কিছু তাই দুর্গা, যা উপনিষদের সর্বেশ্বরবাদ। যা শ্রীমদ্ভাগবত গীতার সারমর্ম, যা বিধৃত হয়েছে পরিষ্কারভাবে দশম অধ্যায়ে ভগবানে বিভূতির শেষ নেই, একাংশ নিয়ে প্রকাশিত এ ব্রহ্মাণ্ড। তিনি নিরাকার কিন্তু আবার সাকার রূপে আবির্ভূত হন—তারই এক উদাহরণ মধুকৈটভ-অসুরদ্বয় বধের কাহিনি। তারপর অপরূপ গানে আর স্তবে বর্ণিত হয় দুর্গাপূজার মূল প্রতিমায় মহিষাসুরমর্দিনীর সেই মহিষাসুর বধের কাহিনি। সে কাহিনির শুরুতে চণ্ডী গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতির পাশাপাশি বাংলায় দেবীর আবির্ভাব বর্ণিত, যা সনাতনধর্মের প্রধান তিন দেবতা ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিবের থেকে জ্যোতির আবির্ভাব ও তাতে সমস্ত দেবতাকে সমন্বিত করার বর্ণনা অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর—শান্ত যোগীবর মহাদেবের সুগৌর মুখমণ্ডল ক্রোধে রক্তজবার মতো রাঙা বরণ ধারণ করলে আর শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী নারায়ণের আনন ভ্রুকুটিকুটিল হয়ে উঠল। তখন মহাশক্তির আহ্বানে গগনে গগনে নিনাদিত হলো মহাশঙ্খ। বিশ্বযোনি বিষ্ণু রুদ্রের বদন থেকে তেজোরাশি বিচ্ছুরিত হলো; ব্রহ্মা ও দেবগণের আনন থেকে তেজ নির্গত হলো। এই পর্বতপ্রমাণ জ্যোতিপুঞ্জ প্রজ্বালিত হুতাশনের মতো দেদীপ্যমান কিরণে দিঙ্মণ্ডল পূর্ণ করে দিলেন। ওই তেজরশ্মি একত্র হয়ে পরমা রূপবর্তী দিব্যশ্রী মূর্তি উৎপন্ন হলো। তিনি জগন্মাতৃকা মহামায়া। দেবীর অপ্রাকৃত রূপের বর্ণনার পাশাপাশি এক ও অসীমের যে লীলা, তাই মহামায়া তা সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধ করানোর সহজ প্রয়াস। আবার এর মধ্যে বহুত্ব মিলে একাকার হওয়া চিরন্তন দর্শনবিধৃত। আবার মহাবিশ্বের শূন্যতার মাঝে যে আলোকরশ্মির রহস্য, যা সীমাহীনভাবে বিস্তৃত তাই দেবীর স্বরূপ।
আবার দেবীর ওই বাণীকে শাশ্বত অব্যয় বলা হলো যা হলো—‘ইত্থং যদা যদা বাধা দানবোত্থা ভবিষ্যতি। তদা তদাবতীর্যাহং করিষ্যাম্যরিসংক্ষয়ম্।।’; যা শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় ভগবানের সেই অমৃতবাণী যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনং সৃজামহাম্-এর সমার্থক এবং অবতারের মূল বক্তব্য।
এরপর আবার পাঠ করা হলো—‘অপূর্ব স্ত্রীমূর্তি মহাশক্তি দেবগণের অংশসম্ভূতা; দেবগণের সমষ্টিভূত তেজোপিণ্ড এক বরবর্ণিনী শক্তিস্বরূপিণী দেবীমূর্তি ধারণ করলেন’—এ থেকে প্রতিয়মান দেবীদুর্গা সমস্ত সমন্বয়ে শক্তিস্বরূপিণী দেবী, সুতরাং তিনিই সব। মহিষাসুর বধের বর্ণনায়, গানে ছন্দে অনন্য সমন্বয় শ্রোতাকে করে বিমোহিত এবং একই সঙ্গে দেবী বন্দনার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডই যে দুর্গা তাই বর্ণিত হয় ‘দেবী নিত্য, তথাপি দেবগণের কার্যসিদ্ধিহেতু সর্বদেবশরীরজ তেজঃপুঞ্জ থেকে তখন প্রকাশিত হয়েছেন বলে তার এই অভিনব প্রকাশ বা আবির্ভাবই মহিষমর্দিনীর উৎপত্তিরূপে খ্যাত হলো। মহিষাসুরনিধন পর্বের পর শ্রীশ্রী চণ্ডীর থেকে বীরেন মহোদয় ভক্তিময় কণ্ঠে পাঠ করেন, যাতে দেবীবন্দনার পাশাপাশি অবলোকিত উচ্চমানের বাচিকশিল্পের। শেষের দিকে এ গানে প্রকৃতি আর দেবী একাকার হয়ে যান, যা ভারতবর্ষের সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতির মূল উপজীব্য—‘হে চিন্ময়ী, হিমগিরি থেকে এলে, এলে তারে রেখে নির্মল প্রাতে। বসুন্ধরা যে সুবিমল সাজে অঞ্জলি হাতে। নবনীলিমায় বাজে মহাভেরী, দিকে দিকে তব মাধুরি যে হেরি, সুললিত তালে তালে সুধা আনে আলোকেরি সাথে।’
সবশেষে উচ্চারিত হয় ত্রিশক্তির মহাত্মা—‘শ্রীশ্রী চণ্ডিকা গুণাতীতা ও গুণময়ী। সত্ত্বগুণ অবস্থায় দেবী চণ্ডিকা অখিলবিশ্বের প্রকৃতি স্বরূপিণী। তিনি পরিণামিনী নিত্যাদিভ্যচৈতন্য সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় যে শক্তির মধ্য দিয়ে ক্রিয়াশীলরূপে অভিব্যক্ত হন, সেই শক্তি বাক্ অথবা সরস্বতী; তার স্থিতিকালোচিত শক্তির নাম শ্রী বা লক্ষ্মী; আবার সংহারকালে তার যে শক্তির ক্রিয়া দৃষ্ট হয় তা-ই রুদ্রাণী দুর্গা। একাধারে এই ত্রিমূর্তির আরাধনাই দুর্গোৎসব। এই তিন মাতৃমূর্তির পূজায় আরত্রিকে মানবজীবনের কামনা, সাধনা সার্থক হয়, চতুর্বর্গ লাভ করে মর্তলোক।’ চতুর্বর্গ বলতে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষকে বোঝায়; যা সাধিত হয় দুর্গাপূজায়। উৎসবের আবহে হয় মহামিলন, যেখানে সকলের মাঝে নিজকে হারিয়ে ফেলে ভক্ত হন দেবীগত প্ৰাণ। এসবই সহজ করে বর্ণিত মহালয়ার মহিষাসুরমর্দিনীতে। সনাতন ধর্মদর্শনের মূল লক্ষ্য যে মোক্ষলাভ, তাই বলা সবশেষে। আজকেও আকাশবাণীর মহালয়ার মহিষাসুরমর্দিনী মহালয়ার দিন দুর্গাপূজাসহ যে কোনো পূজাউৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু শ্রবণে নয়, তার অন্তর্নিহিত ভাবও উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
লেখক: স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ। সহযোগী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়