

রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা এবং এর ফলে জনদুর্ভোগের বিষয়টি নতুন নয়। বলা বাহুল্য, নগরবাসীর জন্য এ এক নিয়তির নাম, যা ক্রমেই চিরস্থায়ী রূপ পরিগ্রহ করছে! অথচ এ দুর্ভোগ থেকে মুক্ত করতে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয় দুই সিটি করপোরেশনকে। পাঁচ বছর আগে ওয়াসা থেকে নালা-খালের দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশন নেওয়ার পর প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও জলাবদ্ধতা কমেনি; বরং এ তালিকায় যোগ হয়েছে নতুন নতুন এলাকা। বেড়েছে ভোগান্তি। এটা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুঃখজনক।
বুধবার কালবেলায় প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনটিতে দেখানো হয়েছে, শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন জলাবদ্ধতা না কমে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোগান্তি না কমে যে বেড়েছে, তারইবা কারণ কী। চূড়ান্তভাবে প্রতিবেদনটি যে স্পষ্ট চিত্র দেয়, তা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং প্রকল্পগুলোয় বিরাজমান অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা।
রাজধানীবাসীকে এ তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে বছরের পর বছর। যেমনটা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে, সামান্য বৃষ্টি হলেই অনেক এলাকা হাঁটু থেকে কোমরপানিতে তলিয়ে যায়। যানজট, দুর্ঘটনা, রাস্তার ধস, দুর্ভোগ—বৃষ্টির দিনে এসবই নিয়মিত চিত্র। অথচ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বিপুল অর্থ ব্যয়ের সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না তেমনটা। বরং অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের নামে দেখানো কাজ বাস্তবে হয়েছে তার অর্ধেক, কিংবা হয়নি মোটেও। পুরান ঢাকার নবাবগঞ্জ, রায়েরবাজার, আজিমপুর, সায়েদাবাদ, শনির আখড়া থেকে শুরু করে শান্তিনগর, মৌচাক, মগবাজার, বাড্ডা, বনানী, উত্তরা, কারওয়ান বাজার—এ শহরের এমন কোনো এলাকা নেই, যেখানে বৃষ্টি হলে মানুষ পানিবন্দি হয় না। এসবই অনিয়মের ফল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা মূলত ড্রেনেজের পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্ক না থাকা ও খাল সংরক্ষণের ব্যর্থতা। জলাবদ্ধতা নিরসনে চারটি ধাপে কাজ করার কথা বলছেন তারা। সঠিক পরিকল্পনা, প্রকৌশলগত বাস্তবায়ন, ব্যবস্থাপনা ও দখল প্রতিরোধ করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নয় বরং সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর জোর দেন তারা। আমরা যদি ঢাকা শহরের ভৌগোলিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাবে এ শহরের প্রায় চারপাশেই ছিল একাধিক নদী। এ ছাড়া শহরের মধ্যে জলাধার ছিল পর্যাপ্ত। ফলে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পথ ছিল স্বয়ংক্রিয়। বেপরোয়া দখল, ভরাট আর অবহেলার কারণে অধিকাংশ খালেরই অস্তিত্ব আজ নেই বললে চলে। নদীগুলো অস্তিত্ব সংকটে। কারণ, শহরটি নিয়ে কখনোই একটি দীর্ঘমেয়াদি সুপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। হয়নি যে, তার ফল আজকের ঢাকার অন্যান্য সমস্যার মধ্যে শুধু জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি দেখেও উপলব্ধি করা যায়। অর্থাৎ, পর্যাপ্ত জলাধার খাল-নালাভিত্তিক পানি নিষ্কাশনের একটি যথাযথ ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে সুযোগ ছিল, তা সম্ভব হয়নি। এখন বলা হচ্ছে, অতিবৃষ্টির সময় নদীর পানি ড্রেনের মাধ্যমে নগরে ঢুকে পড়ে, এতে জলাবদ্ধতা বাড়ে। অথচ জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে বুড়িগঙ্গা ও অন্যান্য নদীর সঙ্গে যুক্ত স্লুইসগেটগুলোও বছরের পর বছর পড়ে আছে অকেজো হয়ে।
আমরা মনে করি, শুধু জনগণের কষ্টার্জিত কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢাললেই হবে না। ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগ কমাতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত সুপরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সবার আগে আবশ্যক আন্তরিকতার। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন তো বটেই; সরকার, রাজনীতিক, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞসহ অত্যাবশ্যকীয় সব মহলের আন্তরিক সংযুক্তি ঘটাতে হবে।