

দেশে ভুল চিকিৎসাসহ অবহেলাজনিত কারণে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। নিঃসন্দেহে এসব ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ভুল চিকিৎসায় যদি রোগীকে মৃত্যুবরণ করতে হয়, তা স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসকের দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শুক্রবার কালবেলায় প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে অতিসম্প্রতি তিনটি জেলার একাধিক চিকিৎসালয়ে মর্মান্তিক কয়েকটি ঘটনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যেসব ঘটনায় অস্ত্রোপচার করতে চিকিৎসক কোনো সদ্যোজাতের নাভি কেটে ফেলেছে, ফলে তার মৃত্যু হয়েছে। আবার কোনো জায়গায় চিকিৎসায় ত্রুটির কারণে সদ্যোজাতের মৃত্যু হলে তা বিস্কুট প্যাকেটে লুকানোর অভিযোগ উঠেছে। সিজার করতে গিয়ে নারীর মূত্রনালি কেটে ফেলার ঘটনাও রয়েছে অভিযোগের তালিকায়। বরগুনার তালতলী, ঝিনাইদহের মহেশপুর ও সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে এসব ঘটনা ঘটেছে।
দেশে হাসপাতালগুলোয় ভুল চিকিৎসা, চিকিৎসকের অদক্ষতা ও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অহরহই পাওয়া যায়। তবে এ নিয়ে বিশেষভাবে কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। চিকিৎসায় অবহেলা কিংবা ভুলের ঘটনায় মামলাও হয়। সেই মামলায় চিকিৎসককে গ্রেপ্তারের নজিরও রয়েছে। তবে তা অপ্রতুল। বিএমডিসির সনদ বাতিলের নজির বিরল। ভুল চিকিৎসার দায়ে মাত্র একজন চিকিৎসকের নিবন্ধন বাতিলের ঘটনা নয়, সাময়িক সময়ের জন্য কয়েকজনের নিবন্ধন স্থগিতের ঘটনাও রয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ২০ বছরে ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুসহ বিএমডিসিতে পাঁচ শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। তবে অর্ধেক অভিযোগই নিষ্পত্তি করতে পারেনি সংস্থাটি। তার মানে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ। একই ধরনের অভিযোগ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও জমা পড়ে। এর সংখ্যা কত, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা হিসাব পাওয়া যায় না। আবার ভুল চিকিৎসায় প্রতি বছর মৃত্যুর সংখ্যাও জানার উপায় নেই। মাঝেমধ্যেই ভুল চিকিৎসাজনিত খবর সামনে আসে। তখন কিছুটা নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। শুরু হয় অভিযান। কয়েক দিন পর আবার সব আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এমনকি ভুল চিকিৎসায় কেউ মারা গেলে কিংবা ক্ষতির শিকার হলে দোষী ব্যক্তিকে কঠোর শাস্তির আইনেও নেই অগ্রগতি। চিকিৎসক ও রোগীর সুরক্ষায় অতীতে আইন করার ব্যাপারে উদ্যোগ দেখা গেলেও তা বাস্তবায়ন আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। এভাবেই চলছে। অর্থাৎ ভুল কিংবা অবহেলায় যদি কোনো রোগীর মৃত্যু হয়, তাহলে ওই চিকিৎসক কিংবা সংশ্লিষ্টদের বিশেষ কোনো শাস্তির ভেতর দিয়ে যেতে হবে না বা জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থা যেখানে নেই; সেখানে ভুল চিকিৎসায় ক্ষতি-ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা বাড়বে বা কমানো যাবে না—এটাই তো স্বাভাবিক। হচ্ছেও তাই। দেখা যাচ্ছে, একজন ডাক্তারের হাতে সামান্য খতনা কিংবা অ্যাপেন্ডিক্সের মতো অস্ত্রোপচারেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক কিছু জরিমানা করা হয়। এতেই পার পেয়ে যায় সংশ্লিষ্টরা।
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, এভাবেই কি চলতে থাকবে নাকি রোগীর সুরক্ষায় রাষ্ট্র কোনো স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করবে? আমরা মনে করি, শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে জরিমানা করলেই এসব মর্মান্তিক ঘটনা কমানো যাবে না। দরকার এ-সংক্রান্ত আইন ও এর যথাযথ বাস্তবায়ন। একই সঙ্গে প্রয়োজন চিকিৎসকের মান, দক্ষতা ও আন্তরিকতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ। স্মরণে রাখা প্রয়োজন, চিকিৎসা একটি মহান পেশা। সেই মহত্ত্বকে ধারণ না করে শুধু বাণিজ্যিক প্রবণতার দিকে ঝোঁক থাকলে, ভালো সেবা প্রদান সম্ভব নয়। আমাদের প্রত্যাশা, স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি বাড়াতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।