

যৌতুক যেন অদৃশ্য আগুন, যা ধীরে ধীরে পরিবারের সুখ-শান্তি পোড়ায়, মেয়েদের স্বপ্ন ভস্ম করে দেয় আর সমাজকে অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দেয়। মেয়ের বিয়ের সময় যে হাসির উৎসব হওয়ার কথা, সেখানে যৌতুকের দাবি এক ভয়ংকর আতঙ্কে পরিণত হয়। এ শিকল মেয়েদের স্বপ্নকে আটকে দেয়, পিতামাতার কপালে আনে দুশ্চিন্তার ভাঁজ আর সমাজকে ঠেলে দেয় অমানবিকতার অন্ধকারে।
বাংলাদেশের সমাজে যৌতুকপ্রথার শিকড় অনেক গভীরে। বিয়ে যেখানে আনন্দময় উৎসব হওয়ার কথা, সেখানে যৌতুকের কারণে তা হয়ে ওঠে বোঝা। গ্রামের গরিব কৃষক হোক বা শহরের মধ্যবিত্ত পরিবার সবাই মেয়ের বিয়ের সময় যৌতুকের চাপের মুখে পড়ে। আইন করে এ প্রথাকে নিষিদ্ধ করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনেক পরিবার মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়, জমিজমা বিক্রি করে দেয় বা গোপনে ধার করে অর্থ জোগায়। অন্যদিকে যারা দিতে পারে না, তাদের মেয়েরা স্বামীর পরিবারে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়। এর ফলে অনেক সময় ভেঙে যায় সংসার অথবা ঘটছে আত্মহত্যা কিংবা খুনের মতো মর্মান্তিক ঘটনা।
দেশে যৌতুক-সংক্রান্ত নির্যাতনের অভিযোগ এসে থাকে প্রায় সময়ে। যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতার প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনা গ্রামীণ অঞ্চলে ঘটে, যেখানে সচেতনতা ও শিক্ষার ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। সমাজের মানুষের মানসিকতার সমস্যা বেশি। যৌতুকপ্রথা যেমন মৃত্যুর মতো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে, তেমনি ব্যক্তিগত অবস্থান নিলে পরিবর্তনের সূচনা ঘটানোও সম্ভব। দেশে এখনো যৌতুকপ্রথা প্রচলনের অনেক কারণ রয়েছে। এখনো অনেকেই মনে করেন, মেয়েসন্তান পরিবারের জন্য বোঝা। তাই বিয়ের সময় তাকে বিক্রি করে দেওয়ার মতো আচরণ করা হয়। কে কত যৌতুক পেল, তা নিয়ে অনেক পরিবার অহংকার করে। ফলে অন্য পরিবারগুলোও প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য হয়। অনেকেই মনে করেন, বিয়ে হলো সহজ উপায়ে সম্পদ সংগ্রহের মাধ্যম। গ্রামের অনেক মানুষ এখনো জানে না যে যৌতুক গ্রহণ একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন থাকলেও মামলা হয় কম, বিচার মেলে না, অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়।
সমাজ থেকে যৌতুকপ্রথা দূর করতে আইনের পাশাপাশি মানসিকতারও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যৌতুকের দাবিদারকে দ্রুত বিচার ও দৃশ্যমান শাস্তি দেওয়া হলে ভয় তৈরি হবে। মেয়েরা যখন শিক্ষিত ও কর্মসংস্থানে দক্ষ হবে, তখন তারা আর বোঝা হিসেবে গণ্য হবে না। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌতুকবিরোধী আলোচনার আয়োজন জরুরি। নাটক, সিনেমা, সংবাদ ও সামাজিক মাধ্যমে যৌতুকের কুফল স্পষ্টভাবে প্রচার করতে হবে। যারা যৌতুক নেয় বা দাবি করে, তাদের সঙ্গে আত্মীয়-পরিজন ও সমাজকেও সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। বিয়ে যেন লেনদেন না হয়ে সামাজিক বন্ধনের ব্যাপার হয়, এ বিষয়ে মসজিদের ইমাম, শিক্ষক ও সামাজিকভাবে অগ্রগামীদের ভূমিকা রাখতে হবে।
যৌতুক প্রথা শুধু আইনের জোরে থামানো যাবে না। মানুষের মানসিকতা না বদলালে এ প্রথা সমাজে নতুন নতুন রূপে ফিরে আসবে। বিয়ে মানে হওয়া উচিত দুটি পরিবারের মধ্যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের সম্পর্ক কোনো আর্থিক লেনদেন নয়। আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজ পরিবার থেকে শুরু করা, যে বিয়ে হবে সেখানে যৌতুকের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। সমাজ একসঙ্গে দাঁড়ালে এবং মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পারলে তবেই এ অমানবিক প্রথা একদিন চিরতরে ইতিহাস হয়ে যাবে।
ফারিহা জামান নাবিলা
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা