

বাংলাদেশি প্রবাসীরা শুধু বিদেশে কর্মরত নাগরিক নন, তারা একেকজন জীবন্ত রাষ্ট্রদূত। যেখানে দাঁড়ান, যেভাবে কথা বলেন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা লেখেন—সবকিছুতেই বাংলাদেশের ছায়া প্রতিফলিত হয়। তাদের আচরণ শুধু ব্যক্তিগত নয়; তা অনিচ্ছাসত্ত্বেও পুরো জাতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
বিদেশে পরিচয় দিতে গিয়ে যখন বলা হয়, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি’; তখনই কাঁধে ভর করে দেশের সুনাম বা অসম্মানের ভার। তাই প্রতিটি পদক্ষেপে সচেতনতা, সংযম ও দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য।
একটিমাত্র শালীন মন্তব্য বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারে, তেমনি অসচেতন আচরণ মুহূর্তেই সেই ইমেজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতি আলোচনায় আছে। প্রবাসীদের উচিত নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করা, যাতে বাংলাদেশ পরিচিত হয় পরিশ্রমী, শান্তিপ্রিয় ও মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে।
সত্য, যুক্তি ও ভদ্রতার মাধ্যমে মতপ্রকাশ করলে প্রবাসীরা হবেন দেশের প্রকৃত দূত; বিভাজন, হিংসা বা অপমানের আশ্রয় নিলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু নিজেদের নয়, পুরো বাংলাদেশ।
সম্প্রতি জাতিসংঘ অধিবেশনের সময় নিউইয়র্কে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনা দেশের জন্য গভীর চিন্তার বিষয়। কিছু প্রবাসী বাংলাদেশি তাকে ঘিরে বিক্ষোভ করেছেন, ‘গো ব্যাক’ ধরনের স্লোগান উচ্চারণ করেছেন, আবার অনেকে স্বাগত জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিনিধির ওপর ডিম ছোড়া এবং গালাগালি—এটি শুধুই রাজনৈতিক ভিন্নমতের প্রকাশ নয়; এটি দেশের ভাবমূর্তির ওপর সরাসরি আঘাত।
প্রশ্ন আসে—প্রবাসী বাংলাদেশিরা কি বুঝছে তাদের আচরণের আন্তর্জাতিক প্রভাব? বিদেশে এমন বিভাজন দেশের নাম কতটা দুর্বল করে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কীভাবে প্রবাসীদের মধ্যে সচেতনতা, সংযম ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করা যায়, যাতে ব্যক্তিগত মতামত কখনো দেশের ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে?
যদি প্রবাসীরা এ দায়িত্বকে হালকাভাবে নেন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু ব্যক্তিগত ইমেজ নয়, পুরো জাতির মর্যাদা। আর যদি তারা সচেতনভাবে নিজেদের আচরণ পরিচালনা করেন, তবে তারা দেশের প্রকৃত দূত হয়ে দাঁড়াবেন। বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট বার্তা দেয়—প্রবাসী বাংলাদেশির আচরণ আর দেশের ভাবমূর্তির মধ্যে সম্পর্ক এতই গভীর যে, এ বিষয়ে অবহেলা কোনো বিকল্প নয়।
এখানে বিষয়টা হলো, এমন প্রকাশ্য বিরোধ বিদেশি মিডিয়ার কাছে সবসময় দেশের ইতিবাচক ইমেজ তৈরি করে না। সাধারণ বিদেশিরা তো বাংলাদেশের রাজনীতি বোঝে না, তারা শুধু দেখে আমরা নিজেদের মানুষকে নিয়ে চিৎকার করছি, ব্যানার নিয়ে ঝগড়া করছি। এতে করে দেশের ভেতরের বৈধ সমালোচনা বা অভিযোগও অনেক সময় অকার্যকর হয়ে যায়।
অবশ্যই কথা বলার অধিকার সবার আছে। কেউ যদি সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা বলেন, মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এ বক্তব্য প্রকাশের ধরনটা যেন ভদ্র, তথ্যভিত্তিক আর সংযমী হয়—এটাই মূল প্রত্যাশা। বিদেশে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত অপমান, গালি বা শারীরিক হুমকি দেখালে সেটা আর রাজনৈতিক দাবি থাকে না, বরং দেশের মর্যাদা ছোট করে।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বিদেশে প্রবাসীরা শুধু ব্যক্তি নয়, তারা বাংলাদেশের মুখপাত্রও বটে। আমরা যদি ভদ্রভাবে, প্রমাণসহ কথা বলি, তাহলে আমাদের অবস্থান বিদেশিদের চোখে বিশ্বাসযোগ্য হবে। আর যদি শুধু ঝগড়া, উত্তেজনা আর বিভক্তির ছবি তুলে ধরি, তাহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাই আজকের বাস্তব শিক্ষা হলো—যে দলেরই সমর্থক হই না কেন, প্রবাসী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব দেশের নাম ও মর্যাদা রক্ষা করা। সমালোচনা করা অবশ্যই উচিত, কিন্তু তা হতে হবে সংযম, যুক্তি এবং সভ্যতার মাধ্যমে, যাতে বৈধ কথাবার্তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছায়। বিদেশে যে একটিমাত্র আচরণও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করতে পারে, তা প্রমাণিত। তাই আমাদের উচিত এমনভাবে নিজেদের উপস্থাপন করা, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে একটি সংহত, দায়িত্বশীল ও মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে দেখে। এ সচেতনতা শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি দেশের কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান দৃঢ় করার একটি অঙ্গ।
লেখক: দুবাই প্রতিনিধি
দৈনিক কালবেলা