

পাহাড়ে আবারও ক্ষোভের আগুন। কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় বিক্ষোভ ও সহিংসতা কেন্দ্র করে গত রোববার গুলিতে তিনজন নিহত হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা উপজেলায় এ ঘটনায় ১৩ সেনাসদস্য ও ৩ পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। খাগড়াছড়িতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে দুষ্কৃতকারীদের হামলায় তিন পাহাড়ি নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়। এ বিবৃতিতে মেজরসহ ১৩ জন সেনাসদস্য, গুইমারা থানার ওসিসহ তিন পুলিশ সদস্য এবং আরও অনেকের আহত হওয়ার খবর জানিয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। আর মন্ত্রণালয় আশ্বস্ত করে বলেছে, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শিগগির তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
পাহাড়ি এক কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের প্রতিবাদে ‘জুম্ম-ছাত্র জনতা’র ব্যানারে গত শনিবার ভোর ৫টা থেকে অবরোধ কর্মসূচি চলছে। কর্মসূচির কারণে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি, খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। রোববার সকালে জেলার বিভিন্ন স্থানে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ও গাছের গুঁড়ি ফেলে বিক্ষোভ করে অবরোধকারীরা। গত মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টায় প্রাইভেট পড়ে ফেরার পথে ওই কিশোরী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ওইদিন রাত ১১টার দিকে অচেতন অবস্থায় একটি ক্ষেত থেকে তাকে উদ্ধার করেন স্বজনরা। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শয়ন শীল (২১) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাকে ছয় দিনের রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা বলেছেন, ১৪৪ ধারা জারির পরও এমন ঘটনা ঘটার কথা ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী তিনজনের বেশি মানুষ জড়োই হতে পারবে না। অথচ সেখানে দল বেঁধে মানুষ মিছিল করেছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং স্থানীয় নেতৃত্ব উভয়েরই অপরিপক্ব আচরণের জন্য এটা হয়েছে। কেউ তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি।
জুম্ম ছাত্র-জনতার ফেসবুক পেজে মিডিয়া সেলের নামে পোস্ট করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ ও সব ধরনের পর্যটন কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া ধর্ষণ মামলার বাকি দুই আসামিকে গ্রেপ্তার, পাহাড়িদের ওপর হামলার বিচার নিশ্চিত করাসহ আট দফা দাবি জানানো হয়েছে। জুম্ম ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, সংঘর্ষের সময় পাহাড়িদের বাড়িঘর ও দোকানপাট পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় বাঙালিরা এসব ঘটনার জন্য পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করছে।
সংঘর্ষের সূচনায় ‘কয়েকজন সেনাসদস্যের ওপর হামলা হয়েছে’—এমন খবর সামাজিক মাধ্যমে একটি পক্ষ প্রচার করলেও আইএসপিআর কিংবা জেলা প্রশাসন এ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করেনি।
আমরা মনে করি, সামাজিক ও গণমাধ্যমে এমন কোনো সংবাদ প্রকাশ করা উচিত হবে না, যা পাহাড়ের উত্তাপ বাড়িয়ে দিতে পারে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশ নানারকম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক ঘটছে বিব্রতকর ঘটনা। এসবই যে ঘটনার সাধারণ নিয়মে ঘটছে, এমনটি বলা যাবে না। এসবের পেছনে রাজনৈতিক অপশক্তির উসকানি রয়েছে। তবে এসব ঘটনা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বের’ মধ্যে ফেলে মূল ঘটনাকে উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। আমাদের প্রত্যাশা, পাহাড়ে তরুণী ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার করা হবে। আইনের আওতায় নিশ্চিত করা হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা গেলে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।