

ফিলিস্তিনে চলমান মানবিক সংকট দিনকে দিন চরম আকার ধারণ করছে। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে। বিধ্বস্ত অবকাঠামো, পানির অভাব, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং খাদ্যের সংকট গোটা অঞ্চলে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—আন্তর্জাতিক ত্রাণ কার্যক্রমে ইসরায়েলি বাধা।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন জাতিসংঘ, রেড ক্রস, ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামসহ অন্যান্য এনজিও গাজায় খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে চাইলেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাতে তা বাধাগ্রস্ত করছে। কখনো নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে, কখনো আবার প্রশাসনিক অনুমতির নামে দিনের পর দিন ত্রাণবাহী ট্রাক সীমান্তে আটকে রাখা হচ্ছে। এতে করে আহত শিশু, অসুস্থ বৃদ্ধ ও অভুক্ত মানুষগুলো আরও দুর্বিষহ পরিস্থিতির মুখে পড়ছে।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা সমুদ্রপথে গাজায় ত্রাণ নিয়ে যাওয়ার একটি বৈশ্বিক প্রচেষ্টা। এ নৌবহরে রয়েছে ৪০টির বেশি বেসামরিক নৌযান। এ বহরে প্রায় ৪৪টি দেশের ৫০০ মানুষের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়ামসহ ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচিত প্রতিনিধি, আইনজীবী, অধিকারকর্মী, চিকিৎসক ও সাংবাদিক। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার প্রথম বহর ৩১ আগস্ট স্পেনের বার্সেলোনা থেকে যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৩ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর তিউনিসিয়া ও ইতালির সিসিলি দ্বীপ থেকে আরও নৌযান এ বহরে যুক্ত হয়। এ ছাড়া গ্রিসের সাইরাস দ্বীপ থেকে পরবর্তী সময়ে আরও কিছু নৌযান ত্রাণ নিয়ে বহরে যুক্ত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই অভিযান সফল হয়নি।
‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ আন্তর্জাতিক নৌবহরের ওপর বাধা দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামুদ্রিক অবরোধ ভাঙার প্রচেষ্টা কোনো বড় ঘটনা ছাড়াই শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার ‘উসকানি’ শেষ হয়েছে। হামাস-সুমুদের কোনো উসকানিমূলক নৌকা সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ বা ‘বৈধ নৌ অবরোধ’ ভাঙার প্রচেষ্টায় সফল হয়নি।
এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে তিনি লিখেছেন—গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার ওপর ইসরায়েলের বাধা দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। এ জাহাজগুলোতে নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিক এবং গাজার জন্য জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু তাদের বাধা দেওয়া হয়েছে। একটি মানবিক মিশনকে বাধা দিয়ে ইসরায়েল শুধু ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের প্রতিই নয়, বরং বিশ্বের বিবেকের প্রতিও চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এতে দুই বছরে সেখানে ৬৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি গাজা অবরোধ করে উপত্যকাটিতে তীব্র খাদ্যসংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে অনাহার-অর্ধাহারে থাকতে হচ্ছে গাজার বাসিন্দাদের।
ত্রাণসামগ্রী মানবিক অধিকার। যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো অঞ্চলে সাধারণ মানুষের কাছে খাদ্য ও চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া কোনো দয়ার বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অংশ। এমন অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে—বিশ্ব নেতৃত্ব কী করছে? কই সেই আন্তর্জাতিক চাপ, কই সেই নিন্দার ঝড়? নিছক বিবৃতি আর উদ্বেগ প্রকাশের রাজনীতি দিয়ে কি মানুষের জীবন বাঁচানো যাবে?
আমরা মনে করি, এ অবস্থায় শুধু উদ্বেগ প্রকাশ যথেষ্ট নয়। জাতিসংঘসহ প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর উচিত অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া—যাতে ত্রাণসামগ্রী বাধাহীনভাবে ফিলিস্তিনে প্রবেশ করতে পারে। যারা ত্রাণ আটকে রাখে, তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে।