

কয়েক বছর ধরেই ধুঁকছে দেশের ব্যাংক খাত। খাতটি ঘিরে ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে সংকট। এ খাতে চলমান সংকটের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ খেলাপি ঋণ। দিনের পর দিন বাড়তে বাড়তে এ ঋণ এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির লাগাম টানার পাশাপাশি যে কোনো উপায়ে যত দ্রুত সম্ভব ঋণ আদায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হওয়া উচিত।
সোমবার কালবেলায় প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ব্যাংক খাত ঘিরে যে সম্ভাব্য সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে, তা উদ্বেগের। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, অন্যদিকে ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংখ্যাও বেড়েছে উদ্বেগজনক মাত্রায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ৭৬ লাখের অধিক। গত জুন শেষে মোট বিতরণ করা ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২১ লাখ। ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে খেলাপির সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ—অর্থাৎ মোট ঋণগ্রহীতার প্রায় এক-ষষ্ঠাংশই খেলাপি। এ বিপুলসংখ্যক খেলাপির কাছে আটকে আছে সাড়ে ৬ লাখ কোটির অধিক টাকা। অবলোপনকৃত ঋণসহ হিসাব করলে এ অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ৭ লাখ কোটি টাকা। শুধু ব্যাংক নয়, নিঃসন্দেহে এ চিত্র সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যই অশনিসংকেত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। এতদিন অনেক প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার ঋণ গোপন বা নিয়মিত হিসেবে দেখানো হতো। কিন্তু নতুন প্রশাসনের অধীনে এসব হিসাব পুনর্মূল্যায়নে বেরিয়ে আসছে প্রকৃত খেলাপির সংখ্যা ও অঙ্ক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, আগে ঋণ গোপন রাখা, বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী খেলাপি ঘোষণার সময়সীমা হ্রাস এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র-মাঝারি খাতের ঋণে বিশেষ সুবিধা বাতিল ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
বিগত আওয়ামী সরকারের একটানা দেড় দশক দেশ পরিচালনার শেষদিকে ব্যাংক খাত প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার সময় খেলাপি ঋণ ছিল ২০ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। ১৬ বছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ গুণ। এর পেছনের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রভাবশালীদের ঋণ গ্রহণ এবং তা খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়া। আর এসব কারবার করতে যা অনিয়ম দরকার, তাদের বিরুদ্ধে সেসবের অভিযোগ রয়েছে। নানা উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যাংকিং সেক্টরকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু পদক্ষেপও পরিলক্ষিত হয় সেই সময়। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
আমরা মনে করি, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে পুরোপুরি সুশাসন ফেরানোর কোনো বিকল্প নেই। কাজটি করতে অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্টদের একাধিক উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়েছে। এরই মধ্যে এ খাতে কিছু সাফল্য দৃশ্যমান। বলা হয়ে থাকে, মৃতপ্রায় ব্যাংক খাত জীবিত করে তুলেছে সংশ্লিষ্টরা। তবে সংকট নিরসন হয়নি। বরং চ্যালেঞ্জ রয়েছে অনেক। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, জনগণের গচ্ছিত আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমানো ও সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্টরা আরও তৎপর হবে। খেলাপি ঋণ আদায়, বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নয়, বরং তাদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। আমরা চাই, ব্যাংক খাত দ্রুত স্থিতিশীল হোক।