

জনপ্রিয় মার্কিন অভিনেত্রী এলিজাবেথ ব্যাঙ্কস ‘হাঙ্গার গেমস’, ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’-এর মতো বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ছাত্রী ছিলেন। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তা হিসেবে খুবই গভীরের কথা বলেছেন মার্কিন এই অভিনেত্রী। সে প্রসঙ্গে শেষদিকে আসছি। শুরুতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি খবর প্রসঙ্গে আসা যাক। ১ অক্টোবর প্রকাশিত খবর, রাজধানীর একটি বস্তিতে অভিযান শেষে ফেরার পথে মাদক কারবারিদের হামলায় মুগদা থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রাসেল আহত হয়েছেন। মাথায় বাঁশের আঘাতে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। একই দিন বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন ইস্যুতে বলেছেন, মুখ খুললে অনেকের প্যান্ট খুলে যাওয়ার পরিস্থিতি হতে পারে। এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত খবর, ৮ থেকে ১০ জন সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্র ও ইটপাটকেল নিয়ে চায়ের দোকানে অপেক্ষমাণ র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা করে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাহেব আলী ও তার সহযোগীকে ছিনিয়ে নিয়েছে। একই দিন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ৫ আগস্টের পর দেশে চাঁদাবাজি বেড়েছে। আগে যেখানে এক টাকা চাঁদা নেওয়া হতো, এখন দেড় থেকে দুই টাকা নেওয়া হচ্ছে। সরকার চাঁদাবাজদের সিন্ডিকেট ভাঙার চেষ্টা করেও, তা ভাঙতে পারেনি। একই দিন প্রকাশিত খবর, ঝিনাইদহের মহেশপুরে ক্লিনিকের ৬৫ হাজার টাকার বিল পরিশোধের জন্য সদ্যোজাত সন্তানকে ‘দত্তক’ হিসেবে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছেন মা সুমাইয়া খাতুন। এ ঘটনার তিন দিনের মাথায় প্রকাশিত খবর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার বুড়িশ্বর ইউনিয়নে অভাবের তাড়নায় ৫০ হাজার টাকায় এক ছেলে সন্তানকে বিক্রি করেছেন মারুফা-লালন দম্পতি। এর আগেও আরেকটি সন্তানকে জন্মের পরই ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন এই দম্পতি।
প্রতিদিনের নানা দুঃসংবাদের উল্লিখিত কয়েকটি নমুনা সিন্দুতে বিন্দুর বেশি নয়। তবুও এ থেকে নিশ্চয়ই সামগ্রিক বাস্তবতা সম্পর্কে একটি চিত্র ফুটে ওঠে, যা মোটেই প্রত্যাশিত নয়। আর ৫ আগস্টের পর যে প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছিল, তার সঙ্গে তো মোটেই যায় না; কিন্তু এসবই চলছে। সবচেয়ে হতাশার বিষয় হচ্ছে, এর কোনোটি নিয়েই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তেমন চিন্তিত বলে মনে হয় না। কিন্তু আমজনতা খুবই চিন্তিত, নানা প্রশ্ন উঠছে জনমনে। যেমন বলা হচ্ছে, মাদকের আসামি ধরার পর পুলিশ কর্মকর্তার মাথায় বাঁশের আঘাত করে অজ্ঞান করে ফেলার সাহসের উৎস কী। এ ঘটনার পরও কি কর্তৃপক্ষ মাদক আগ্রাসনের সামগ্রিক পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পেরেছে? নাকি ব্রাজিলের মতো মাদক চক্র আর সেনাবাহিনীর মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ হওয়ার আগপর্যন্ত বিষয়টি ধর্তব্যের মধ্যে না নেওয়ার পণ করেছেন আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা! যেমন প্রশ্নে উত্তর খোঁজা প্রয়োজন, আটককৃত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তার সহযোগীকে নিয়ে র্যাব কেন চায়ের দোকানে অপেক্ষা করছিল। এ সিদ্ধান্ত কার। একি র্যাব-১১-এর অধিনায়কের, নাকি যিনি অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন তার বুদ্ধিমত্তার অভাবের খেসারত? কাউকে আটক করার পর দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করা তো সাধারণ নিয়ম। এ নিয়ম মানা হয়নি কেন? নাকি কোনো দেনদরবার চলছিল! আর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন ইস্যুতে ইশরাক হোসেন মুখ আংশিক খুলে চেপে গেলেন কী কারণে? পুরোটা বলতে তার অসুবিধা কোথায়! নাকি যতটুকু বললে নিজের প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়, ততটুকুই বলেছেন। নাকি পুরোটা বললে অন্যের প্যান্ট খুলে যাওয়ার বদলে তার নিজেরই ‘প্যান্ট খুলে’ যাওয়ার ভয় আছে। বলা কঠিন, তবে বিষয়টি উদ্বেগের! এদিকে সবচেয়ে উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের জবানিতে। তার ভাষ্যমতে, ‘আগে যেখানে এক টাকা চাঁদা নেওয়া হতো, এখন দেড় থেকে দুই টাকা নেওয়া হচ্ছে।’ সাধারণভাবে ধারণা করা চলে, অর্থ উপদেষ্টা বাড়িয়ে কথা বলেননি। এর কারণ দুটি। এক. তিনি অতিকথনের মানুষ নন, সরকারের অনেকের মতো বাচাল তো ননই। দুই. সরকারে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তিই হতাশার কথা বাড়িয়ে বলেন না। কিন্তু অর্থ উপদেষ্টা যতটুকুই বলেছেন, তাতেই যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা এক কথায় ভয়াবহ। চাঁদার অঙ্ক বেড়ে দেড় থেকে দ্বিগুণ হওয়ার বিষয়টি রোদ-বৃষ্টির মতো প্রকৃতির সাধারণ কোনো বিষয় নয়। চাঁদার জন্য চলে নানান জুলুম। একদিকে সব বৈধ আয় কমেছে, অন্যদিকে চাঁদার অঙ্ক বেড়েছে এবং অর্থ উপদেষ্টা স্বীকার করেছেন, ‘সরকার চাঁদাবাজদের সিন্ডিকেট ভাঙার চেষ্টা করেও পারেনি।’ এ কি সরল স্বীকারোক্তি, নাকি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ? নিশ্চয়ই এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য সরকারের কেউ বসে নেই। কারণ, ক্ষমতাসীনরা উত্তর দেন না। তারা তো অনেকটা দেবদূত। মাঝেমধ্যে অতি সদাশয় হয়ে বাণী দেন, যা অতীতেও ঘটেছে। এর অর্থ এই নয় যে, সবকিছুই অতীতের মতোই ঘটছে। বরং সংযোজন আছে, তা হচ্ছে, বিভিন্ন ঘটনায় সরকারের নিন্দা ও দুঃখ প্রকাশ। একটি শিশুতোষ গল্পের নাম, ‘ছিঁচকাঁদুনে বাঘ’।
প্রচলিত একটি কথা আছে, ‘উল্টা বুঝিলি রাম!’ তাহলে কি অভিনেত্রী এলিজাবেথ ব্যাঙ্কসের উচ্চারণের উল্টোটা বুঝে আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থতায় অবগাহন করার অপেক্ষায় আছে! একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের হানিমুন পিরিয়ড কিন্তু শেষ হয়েছে গত বছর ডিসেম্বরেই। হানিমুন পিরিয়ডের পর দশ মাসে প্রবেশ করেছে সরকারের মেয়াদ। উল্লেখ্য, মানবজাতির বিকাশ পর্বে দশ মাস দশ দিন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি মানুষের এক ইনবিল্ড প্রবণতা। আর এই সরকারের কাছে মানুষ যা চায়, তাও রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেই বিরাজমান। প্রথম চাওয়া, নিরাপত্তা। যাকে একসময় ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি’ হিসেবে আওয়াজ তোলা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত প্রত্যাশা—কাজ, যা চাকরি হিসেবে বহুল পরিচিত। এ ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপ কী? দৃশ্যত হতাশাজনক। এদিকে অবশ্য প্রধান উপদেষ্টা উদ্যোক্তা হওয়ার সবক দিচ্ছেন এবং দিয়েই যাচ্ছেন। হয়তো এটি মোহাতারেমের ইনবিল্ট চেতনা। স্মরণ করা যেতে পারে, বিতাড়িত শেখ হাসিনাও উদ্যোক্তা হওয়ার জ্ঞান বিতরণ করতেন। তবে এ ব্যাপারে তার চাপা ততটা জোরালো ছিল না।
প্রসঙ্গত, চাকরি ইস্যুতেই হাসিনাবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল। হাসিনা বিতাড়িত হলেও, প্রত্যাশা কোনো আলামত নেই। বেসরকারি খাত স্থবির। পতিত শক্তির পালিয়ে যাওয়া এমপি-মন্ত্রী-ব্যবসায়ীদের অনেক কারখানা বন্ধ। এসব প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে গেছেন। আবার অদক্ষতার কারণে চাহিদামতো প্রার্থীর আকাল রয়েছে। আমাদের দেশে কেবল অদক্ষ শ্রমিক নয়, অদক্ষ স্নাতকও তৈরি হয়। কে জানে এ ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বে শীর্ষে আছি কি না। দেশ থেকে অবৈধ বিদেশি বিতাড়নের কথা শোনা গেলেও এখনো কোনো ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়নি। আর সরকার যেখানে মাথাভারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর লটবহর নিয়ে খাবি খাচ্ছে, সেখানে নতুন নিয়োগের সুযোগ কোথায়? সাধারণ মানুষের মতোই শিল্পাঞ্চলগুলো এখনো নিরাপত্তাহীন। চাঁদাবাজি ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এদিকে দেশে এক বিশাল নতুন বেকারত্ব সমস্যা সামনের দিনগুলোয় ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা প্রবল। আর বিরাজমান আমলা এবং পুলিশ দিয়ে সরকার রুটিন ওয়ার্ক কতটা করতে পারছে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সামনের সামগ্রিক পরিস্থিতি কতটা সামলাতে পারবে, তা নিয়েও ব্যাপক সংশয় আছে। এর ওপর আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন। এমনটাই মনে করেন অনেকে। এতকিছুর মধ্যেও রাজনৈতিক দলগুলো সরকারকে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে। তবে, সঙ্গে রয়েছে দ্রুত নির্বাচনের আহাজারি; কিন্তু নির্বাচন কীভাবে হবে, কারা অংশ নিতে পারবে, কারা পারবে না, তা এখনো অস্পষ্ট। এদিকে লাথি পড়েছে কৃষকের পেটে। আর এরই মধ্যে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার বিষয়টি বালাইনাশকের প্রভাবে বিলুপ্তপ্রায় জোনাকির আলোকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, এই জ্বলে এই নেভে!
এবার আসা যাক কলামের শুরুর প্রসঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার সমাবর্তনে অভিনেত্রী এলিজাবেথ ব্যাঙ্কসের বক্তৃতায় বলেছেন, ‘আমি অধীর আগ্রহে ব্যর্থতা দেখার অপেক্ষায় আছি। হ্যাঁ, ঠিক শুনেছ—তোমরা কখনো না কখনো ব্যর্থ হবে। তুমি যা চাইছ, সেটা ঠিকমতো না-ও পেতে পারো। কিন্তু সেটাই তোমার সবচেয়ে বড় সুযোগ—তুমি কী চাও সেটা বোঝার জন্য। তুমি হয়তো বলবে, না, এটা চাই-ই চাই। কিন্তু এই একমুখী দৌড়ে আশপাশের সব সুযোগ চোখ এড়িয়ে যায়। তাই প্রতিটি ব্যর্থতার সময় নিজেকে প্রশ্ন করো—আসলে তুমি কী চাইছ? টাকা? সম্মান? স্বাধীনতা? স্বীকৃতি? শেষে বলব, তুমি ভুল করবে, আর সেই ভুল থেকে শেখার অধিকার তোমার আছে। কোনো ভুল তোমার আশা-স্বপ্ন ভেঙে দেবে না।’
বিনয়ী প্রশ্ন, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট-পরবর্তী আঁধারে আলোর দিশারি হিসেবে আবির্ভূত অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্র পরিচালনায় তার ভুল থেকে কি কিছু শিখেছেন? আসলে তিনি কী চাইছেন? মনে রাখা প্রয়োজন, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরে তিনি ব্যর্থ হলে সামগ্রিক যে সর্বনাশ হবে, তা কল্পনারও অতীত। দেশের মানুষ সুসংবাদের জন্য অধীর অপেক্ষায় আছে। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, আশা ভঙ্গ হলে মানুষের মাঝে অনেক ক্রোধ ও ক্ষোভের জন্ম হয়।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক