হেনা শিকদার
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:৩১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চারদিক

দুর্যোগে ভুক্তভোগীর ভূমিকা উপেক্ষিত

দুর্যোগে ভুক্তভোগীর ভূমিকা উপেক্ষিত

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর এসব দুর্যোগে বিপুল পরিমাণ জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক সহযোগী এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও, এ বিশাল কর্মযজ্ঞের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার সাধারণ জনগণ। তাদের ভূমিকা প্রায়ই অলিখিত এবং উপেক্ষিত থেকে যায়। দুর্যোগের প্রথম শিকার এবং প্রথম সাড়া প্রদানকারী হওয়া সত্ত্বেও, সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার কাঠামোতে তাদের শক্তি ও সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার চক্রটিকে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়—দুর্যোগ-পূর্ববর্তী প্রস্তুতি, দুর্যোগকালীন সাড়া এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন। বিস্ময়করভাবে, এই প্রতিটি পর্বেই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ও অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার টেবিলে খুব কমই গুরুত্ব পায়।

দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই এর ঝুঁকি কমানো এবং প্রস্তুতি গ্রহণ করা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এ পর্যায়ে জনগণের ভূমিকা প্রধানত দুটি—ব্যক্তিগত ও সামাজিক। পারিবারিকভাবে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা, ঘরের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ মেরামত করা এবং দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্রের তথ্য জেনে রাখা—এসব ব্যক্তিগত প্রস্তুতি একটি বড় দুর্যোগের প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করে।

উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষরা মেঘের রং, বাতাসের গতি ও পশুপাখির আচরণ দেখে ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়ার যে সনাতনী জ্ঞান ধারণ করেন, তা আধুনিক প্রযুক্তির চেয়ে কোনো অংশে কম কার্যকর নয়। কিন্তু এ অমূল্য জ্ঞান এবং স্ব-উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বিত করার প্রচেষ্টা অত্যন্ত সীমিত। পরিকল্পনাগুলো প্রায়ই ওপর থেকে নিচে (top-down) চাপিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে নিচ থেকে ওপরে (bottom-up) আসা জনগণের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করা হয়।

যে কোনো দুর্যোগ আঘাত হানার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা বা অনেক ক্ষেত্রে প্রথম দিন পর্যন্ত সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এ ‘গোল্ডেন আওয়ারে’ উদ্ধারকাজ, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে প্রতিবেশীরাই। নিজের জীবন বাজি রেখে অন্যকে বাঁচানোর যে অগণিত বীরত্বগাথা প্রতি দুর্যোগে তৈরি হয়, তার স্বীকৃতি কোথায়? গণমাধ্যমের ক্যামেরায় যখন উদ্ধারকারী দলের ছবি দেখানো হয়, তখন তার আড়ালে থেকে যায় শত শত সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, যারা কোনো যন্ত্র বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই শুধু মানবিক তাগিদে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এ সাধারণ মানুষগুলোই প্রথম নিজেদের নৌকা নিয়ে বন্যাকবলিত মানুষকে উদ্ধার করে, শুকনো কাপড় ও খাবার দিয়ে আশ্রয় দেয়। অথচ, দুর্যোগকালীন ব্যবস্থাপনার আলোচনায় তাদের প্রায়ই ‘সহায়-সম্বলহীন দুর্গত’ বা ‘পীড়িত’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, ‘সক্রিয় উদ্ধারকর্মী’ হিসেবে নয়। এ দৃষ্টিভঙ্গি তাদের আত্মমর্যাদা যেমন ক্ষুণ্ন করে, তেমনি তাদের অন্তর্নিহিত শক্তিকে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়।

দুর্যোগের ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য। এ পর্যায়েও জনগণের ভূমিকা কেন্দ্রীয়। সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার নির্ভর করে স্থানীয় সম্প্রদায় বা ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে জনগণের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব না দিয়ে তাদের শুধু ‘গ্রহীতা’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে একদিকে যেমন প্রকৃত প্রয়োজন ও বাস্তবতার সঙ্গে গৃহীত পদক্ষেপের ফারাক তৈরি হয়, তেমনি অন্যদিকে মানুষের মধ্যে পরনির্ভরশীলতার মানসিকতা জন্মায়।

জনগণের ভূমিকা উপেক্ষা করার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, একটি আমলাতান্ত্রিক ও কেন্দ্রমুখী ব্যবস্থাপনা কাঠামো, যেখানে সব পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যম ও দাতাসংস্থাগুলোর ‘পীড়িত’ মানুষের ছবি দেখিয়ে তহবিল সংগ্রহের প্রবণতা, যা তাদের অসহায়ত্বের চিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করে, শক্তির চিত্রকে নয়। তৃতীয়ত, কমিউনিটি পর্যায়ে সংগঠিত উদ্যোগ গ্রহণ ও তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যথেষ্ট বিনিয়োগের অভাব।

এ অবস্থার পরিবর্তনে একটি মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দর্শনকে ‘ত্রাণকেন্দ্রিক’ না রেখে ‘জনগণকেন্দ্রিক’ ও ‘সক্ষমতাকেন্দ্রিক’ করতে হবে। এর জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শুধু সরকার বা কয়েকটি সংস্থার দায়িত্ব নয়, এটি একটি সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ব। জনগণ এ ব্যবস্থাপনার অসহায় শিকার নয়, বরং এর সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী অংশীদার। তাদের অভিজ্ঞতা, শক্তি ও উদ্যোগকে উপেক্ষা করে একটি টেকসই ও দুর্যোগ সহনশীল জাতি গঠন অসম্ভব। যখন প্রতিটি নাগরিক জানবে যে, সে শুধু একজন সম্ভাব্য ‘দুর্গত’ নয়, বরং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একজন সক্রিয় ‘যোদ্ধা’, তখনই আমরা দুর্যোগ মোকাবিলায় সত্যিকার অর্থে একধাপ এগিয়ে যাব।

হেনা শিকদার, ‎শিক্ষার্থী

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

দর্শন বিভাগ

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাজেটে যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে 

আ.লীগ-ছাত্রদল সংঘর্ষ : ছাত্রলীগের ৮৪ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

অংশীজনদের নিয়ে আইসিএবি জনস্বার্থ ফোরামের যাত্রা শুরু

অজিদের বিপক্ষে ইতিহাস গড়ে জিতলো বাংলাদেশ

বিচারককে হাইকোর্টে তলব / হবিগঞ্জে ৫ বছরেও শেষ হয়নি ‘ধর্ষণ ও হত্যা’ মামলার বিচার

নকল ও ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে অভিযান অপ্রতুল : বিএসটিআইকে ক্যাব

ইরান ও হুথিদের পদক্ষেপের প্রশংসায় হিজবুল্লাহ

মিরপুরে বৃষ্টির হানা, খেলা না হলে কে জিতবে?

শেষ ম্যাচে তারকাবহুল দল নিয়ে নামছে আর্জেন্টিনা

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহত বেড়ে ৩,৬৬৬

১০

স্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে লেবানন

১১

বাজেটে বেতন নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুখবর

১২

রাজশাহীতে বাড়ছে ডেঙ্গু উদ্বেগ

১৩

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরি, এসএসসি পাসেই আবেদন

১৪

চার খাতে অতিরিক্ত ৪২৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকির চাপ : অর্থমন্ত্রী

১৫

তাপপ্রবাহ নিয়ে নতুন বার্তা

১৬

তিন নতুন জিরো : ইউনূস সরকারের তিক্ত প্রাপ্তি

১৭

অভিজ্ঞতা ছাড়াই সিটি ব্যাংকে চাকরি, আবেদন অনলাইনে

১৮

ইনজুরিতে বিশ্বকাপ শেষ এক ডাচ ডিফেন্ডারের

১৯

ডিজিটাল মাধ্যমেও নারী-শিশুরা নিরাপদ নয় : নিপুণ রায় 

২০
X