

চলে গেলেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী, গীতিকবি, সুরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মতলুব আলী (বাবলু)। সোমবার (৩ নভেম্বর) রাত আড়াইটার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মতলুব আলীর মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমেছে শোকের ছায়া। বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন পৃথক শোক বাণীতে মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। সারা দেশের মানুষের মতো কালবেলা পরিবারও শোকাহত। কালবেলা পরিবারের পক্ষ থেকে মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।
হাজার তিনেকের বেশি ছবি এঁকেছেন মতলুব আলী। নাটক, উপন্যাস, গান লিখেছেন। সুরও দিয়েছেন অনেক গানে। তার সুর, বাবা মো. খেরাজ আলীর কথা ও মেয়ে পুষ্পিতার কণ্ঠে একটি গানের সঙ্গে নাচ দিয়ে শুরু হয় মতলুবের একাত্তর উদযাপন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার উদয়কালে ‘লাঞ্ছিত নিপীড়িত জনতার জয়’ গানের রচয়িতা মতলুব আলী। বাংলাদেশের চারুকলা আন্দোলনের অন্যতম সহযোদ্ধা তিনি। উদীচীর উপদেষ্টা ও একসময়ের সংগীতের শিক্ষক ছিলেন।
এক প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক মতলুব আলী বলেছিলেন, কোনো নির্দিষ্ট শিল্পে স্থির না হয়ে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছি। গীতিকার হওয়ার জন্য তিনি গান লেখেননি। এগুলোকে পেশা হিসেবে নেননি বলেই এত কিছু করতে পেরেছেন। তবুও তার বন্ধুরা বলেন, তিনি নাকি খুব বেশি আঁকেননি! শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মৃত্যুর পর থেকে তাকে নিয়ে গবেষণা করছেন। বেরিয়েছে শিল্পাচার্যকে নিয়ে তার লেখা বেশ কয়েকটি বই।
মতলুব আলীর জন্ম ১৯৪৬ সালে রংপুরের মুন্সীপাড়ায় (মাদরাসা রোড)। রংপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৬৩ সালে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। উচ্চ মাধ্যমিক পড়েছেন কারমাইকেল কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে। পরে ঢাকা আর্ট কলেজে অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯৮৭-৮৮ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন মতলুব আলী। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন। চারুকলা অনুষদের ডিনের দায়িত্বও পালন করেছেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধ মতলুব আলীর মানসপটে রেখে যায় গভীর অভিঘাত। তাই তার ক্যানভাসে বিমূর্ত হয়েছে মহান স্বাধীনতা, দেশ ও উদার মানবতাবাদ। সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণির দারিদ্র্য, দুর্দশাগ্রস্ত জীবনালেখ্য উঠে এসেছে তার নানা ছবিতে। তেলরঙে আঁকা ‘রাজারবাগ একাত্তরে’ কোলাজ, কালি-কলমের আঁচড়ে আঁকা ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধার বীরাঙ্গনা বোনে’, জলরঙে আঁকা ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যাবর্তনে’, ‘মানব সন্তানে’, ‘দুই বালকে’—ছবিগুলোতে শিল্পীর দেশপ্রেমের নিদর্শন মিলেছে বারবার। জলরং থেকে কালি-কলমের রৈখিক প্রতিবেদন, পেনসিল-রেখা, ক্রেয়ন, তেল, অ্যাক্রিলিক, মিশ্র মাধ্যম, কোলাজ, ছাপচিত্র এরকম বহুবিধ মাধ্যমে মতলুব আলী চিত্রিত করেছেন বাংলার স্বরূপ। তার অঙ্কনশৈলীকে বাস্তবমুখী, বলিষ্ঠ, স্পষ্ট ও সহজ-সরল ব্যঞ্জনায় অভিহিত করেছেন শিল্পবোদ্ধারা।
আমরা মনে করি, বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মতলুব আলীর ভূমিকা অপরিসীম। তিনি ছিলেন নিভৃতচারী এবং প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। তবুও তার শিল্পকর্ম এ দেশের মানুষের মনে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। তিনি তার সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষের মনে বেঁচে থাকবেন।