

বিএনপি অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নির্বাচনী যাত্রা শুরু করেছে। আন্দোলন, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় দীর্ঘ এক অচলাবস্থার পর দলের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন পর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দলটিকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে এনেছে। তবে এ ঘোষণার ভেতরেই লুকিয়ে আছে নানা কৌশল, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার ইঙ্গিত।
ঘোষিত ২৩৭ আসনের তালিকায় অভিজ্ঞ নেতৃত্বের পাশাপাশি বেশ কিছু নতুন মুখের উপস্থিতি লক্ষণীয়। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি চেষ্টা করেছে একটি ভারসাম্য রক্ষা করতে—একদিকে অভিজ্ঞ ও পরিচিত নেতাদের ধরে রাখা; অন্যদিকে তরুণ ও উদ্যমী কর্মীদের সামনে নিয়ে আসা। এ ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা দলের ভেতর ‘পুনর্গঠনের রাজনীতি’র ইঙ্গিত দেয়, যা বিএনপির ভবিষ্যৎ টিকে থাকার জন্য জরুরি।
প্রার্থী তালিকায় তরুণ প্রার্থীদের অংশগ্রহণ এবার চোখে পড়ার মতো। ছাত্রদল ও যুবদলের মধ্য থেকে উঠে আসা বেশ কয়েকজন নেতা এবার মনোনয়ন পেয়েছেন। অনেকে রাজপথে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, কেউ কেউ আবার সোশ্যাল মিডিয়া বা সংগঠক হিসেবে দৃশ্যমান ভূমিকা রেখেছেন। বিএনপি যদি এ নতুন প্রজন্মের উদ্দীপনাকে কাজে লাগাতে পারে, তবে তা ভোটারদের মধ্যে দলটির ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের তরুণ ভোটারদের কাছে বিএনপির দীর্ঘ অনুপস্থিতি কাটিয়ে একটি নতুন যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হতে পারে।
তবে নারী প্রার্থীর উপস্থিতি এখনো সীমিত। নারী নেতৃত্বে বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী হলেও বাস্তব প্রার্থিতার ক্ষেত্রে সেই প্রতিফলন এবারও পুরোপুরি দেখা যায়নি। মনোনয়ন পাওয়া নারীদের অধিকাংশই শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন, কিন্তু তাদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ক্রমবর্ধমান হলেও বিএনপি এ সামাজিক বাস্তবতাকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করতে পারেনি—এ অভিযোগ আগেও উঠেছে, এবারও তা রয়ে গেল।
দলের হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে কিছু নাম বাদ পড়ায় অভ্যন্তরীণ সমালোচনা বেড়েছে। দীর্ঘদিন সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা, কিংবা আন্দোলনে দৃশ্যমান এমন কিছু নেতা তালিকায় না থাকায় অসন্তুষ্টির সুর স্পষ্ট। বিএনপি নেতৃত্ব এটিকে ‘প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন’ হিসেবে দেখাতে চাইলেও বাদ পড়া নেতাদের ক্ষোভ যদি সামাল না দেওয়া যায়, তবে নির্বাচনের মাঠে তা দলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ অবস্থায় ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রথমবারের মতো বিএনপির টিকিট পাওয়া প্রার্থীর সংখ্যা এ নির্বাচনে তুলনামূলক বেশি। তাদের মধ্যে রয়েছেন জেলা পর্যায়ের সংগঠক, প্রাক্তন ছাত্রনেতা, পেশাজীবী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। অনেকেই রাজনীতিতে নতুন হলেও নিজ নিজ অঞ্চলে পরিচিত মুখ। নতুনদের অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের দল গঠন প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সামাল দিতে না পারলে নবীন প্রার্থীরা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতেও থাকবেন।
সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা। দীর্ঘ রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ঘোষণাটি বিএনপির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে এটি দলের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক, অন্যদিকে এটি নির্বাচনী প্রচারণায় আবেগী গতি সঞ্চার করবে। তৃণমূল কর্মীরা আবারও ‘খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নির্বাচন’—এ প্রতীকে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছেও একটি প্রতীকী বার্তা— বিএনপি এখন আর কেবল আন্দোলনের দল নয়, নির্বাচনে ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এ আবেগ কতটা বাস্তব প্রভাব ফেলবে? খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাজনিত অবস্থার কারণে তার সরাসরি নির্বাচনী অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা নেই। সে ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্ত প্রতীকী থাকলে দলের অভ্যন্তরীণ প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে নতুন ফাঁক তৈরি হতে পারে। তবু রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এটি দলের সংগঠনকে অন্তত সাময়িকভাবে একত্রিত করেছে।
বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ এখন অভ্যন্তরীণ ঐক্য রক্ষা করা। যারা মনোনয়ন পাননি, তাদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন দলের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তাদের অসন্তোষ যদি বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে প্রকাশ পায়, তবে সেটি দলের প্রার্থীদের জন্য কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করবে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে এমন ভেতরকার বিভাজন বিএনপির মূল লক্ষ্যকে ব্যাহত করতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ—অভ্যন্তরীণ সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে এ অসন্তোষ প্রশমিত করা।
আবার আন্দোলনে সহযাত্রী কয়েকটি দলকে কিছু আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ইতিবাচকভাবে দেখা যেতে পারে। এতে ছোট দলগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে বিরোধী রাজনীতির ঐক্য গঠনে সহায়ক হতে পারে। তবে এ আসন ছাড়ার প্রক্রিয়ায় যদি সমন্বয় ও বাস্তব মূল্যায়ন না থাকে, তবে জোটের ভেতরেও অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের নির্বাচনী বাস্তবতায় জোট রাজনীতি কেবল আসন ভাগাভাগির বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক বার্তা ও পরস্পরের প্রতি আস্থার প্রশ্নও বটে।
বিএনপির এবারের প্রার্থী তালিকা তাই কেবল একটি নির্বাচনী তালিকা নয়, এটি দলের ভবিষ্যৎ রাজনীতির রূপরেখা। এতে যেমন নবায়নের প্রয়াস রয়েছে, তেমনি পুরোনো দ্বন্দ্বের ছায়াও রয়ে গেছে। তরুণ প্রার্থীদের মাধ্যমে দলটি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, আবার অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনে অনেক পুরোনো মুখও টিকিয়ে রেখেছে। এ দ্বৈত বাস্তবতাই হয়তো বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, তারা কি সত্যিই পরিবর্তনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করছে, নাকি কেবল নির্বাচনী আবহ তৈরি করছে।
অন্যদিকে এ প্রার্থী তালিকা দলের জন্য একটি সুযোগও বটে। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে হতাশা ও বিচ্ছিন্নতার পর নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ। এখন দেখা যাক, বিএনপি এ সুযোগকে কৌশল ও ঐক্যের মাধ্যমে কতটা কাজে লাগাতে পারে।
লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক