কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:১১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রান্তিকালের কথকতা

‘আমি জেনারেল জিয়া বলছি’

‘আমি জেনারেল জিয়া বলছি’

পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী এক ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল। এদিন সিপাহি-জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ক্যান্টনমেন্টের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আনেন স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান ঘোষক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে।

পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর ৩, ৪, ৫ ও ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ ছিল কার্যত সরকারবিহীন। এ সময় কুচক্রীরা সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসায় বন্দি করে রাখে; কিন্তু ৬ নভেম্বর রাতে সংঘটিত সিপাহি-জনতার মিলিত বিপ্লবে নস্যাৎ হয়ে যায় সব ষড়যন্ত্র। চার দিনের দুঃস্বপ্নের প্রহর শেষ হয়। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়া। রেডিওতে ভেসে আসে তার কণ্ঠ, আমি জিয়া বলছি। ভাষণে তিনি দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ এবং কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বান জানান। ৭ নভেম্বর জিয়ার সংক্ষিপ্ত অথচ উদ্দীপনাপূর্ণ ভাষণ জনমনে আশার সঞ্চার করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার স্বাধীনতার ঘোষণা ও ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের কথাই তখন স্মরণ হয়ে যায় মানুষের মনে। সেদিন জাতীয় ঐক্য ও সংহতির যে দৃশ্য জীবন্ত হয়ে উঠেছিল, তা ছিল এক কথায় অভূতপূর্ব।

জিয়াউর রহমান ছিলেন ইতিহাসের সন্তান। বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিনির্মাণের সঙ্গে মিশে আছে তার নাম। বাংলাদেশের ঘোরতর দুঃসময়ে এ দেশের মানুষ একাধিকবার শুনেছে জিয়াউর রহমানের কণ্ঠস্বর। এ কণ্ঠস্বর সারা দেশের মানুষকে করেছে উজ্জীবিত, দিয়েছে মুক্তির সংগ্রামে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা। প্রথমবার একাত্তরে, মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে। দ্বিতীয়বার স্বাধীন দেশের দুঃসময়ে, পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সূচনাতে শেখ মুজিব নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, আত্মগোপন করেছিলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। এমতাবস্থায় যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা অনেকটা পূরণ করে দিয়েছিল। জিয়াউর রহমানের ঘোষণা এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তার বিদ্রোহ সেই মুহূর্তে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার ভিত্তি তৈরি করেছিল।

একাত্তরে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা করার কথা উল্লেখ আছে খোদ শেখ হাসিনার স্বামী এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া রচিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক গ্রন্থে। বইটির ৮০ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, ‘বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ঘোষণায় বারবার বলা হচ্ছিল যে, মেজর জিয়া ভাষণ দেবেন। এর কিছুক্ষণ পর শোনা গেল, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া বলছি। বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। দেশের সর্বত্র আমরা পাকিস্তানি হানাদারদের পর্যুদস্ত করে চলেছি। ইনশাআল্লাহ আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশকে আমরা শত্রুমুক্ত করতে সক্ষম হবো।’

এই বইয়ের ৮৩ পৃষ্ঠায় এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া লিখেছেন, ‘আল্লাহর নিকট কায়মনে প্রার্থনা করি যে, চিটাগাংয়ের মেজর জিয়াউর রহমান ও তার সহকর্মীদেরসহ অন্যান্য যারা তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করছিলেন তাদের যেন কোনো ক্ষতি না হয় এবং তারা যেন দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ী হন।’

মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি উপায়, উদ্দেশ্য ছিল এদেশের মানুষের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি। অর্থাৎ সাম্য মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। এই লক্ষ্যে ৩০ লাখ শহীদ এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে এই দেশ। এ দেশের প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে শহীদের রক্ত আর বীরাঙ্গনার বেদনাশ্রু। ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস এই যে, স্বাধীন দেশে শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উপেক্ষিত হয়েছে। বাহাত্তরের সংবিধানে স্থান পায়নি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের তিন মূল নীতি। দেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরই শুরু হয় রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হত্যা। নকশালদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গুম আর খুন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। মানুষের সব মানবিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়। রুদ্ধ করা হয় মানুষের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা। সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাত্র চারটি পত্রিকার প্রকাশনা রেখে বাকি সব দৈনিক পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে শুধু হত্যা নয়, দাফনও সম্পন্ন করা হয়েছিল।

শেখ মুজিবের শাসনামলে ব্যাংক ডাকাতি, ছিনতাই ও চুরি-ছিনতাই মহামারি আকার ধারণ করেছিল। লুটপাটের কবল থেকে রক্ষা পায়নি গরিব অসহায় মানুষের জন্য বিদেশ থেকে আসা ত্রাণসামগ্রী। কম্বল লুটের ঘটনাকে একটি আইকনিক লুটের ঘটনা হিসেবে আজও চিহ্নিত হয়ে আছে। দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে চুয়াত্তরে দেশব্যাপী দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। ক্ষুধা এবং অপুষ্টিতে মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হয় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। পঁচাত্তরের শুরুতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিব আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাকশাল গঠন করেও নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। ১৫ আগস্ট নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে একদলীয় শাসনের যবনিকাপাত হয়। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন তারই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর খন্দকার মোশতাক আহমদ। তিনিও দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হন। উপরন্তু পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর পাল্টা ক্যুর শিকার হন। বন্দি করা হয় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে। ঘোরতর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। এমন একটি পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার অভ্যুত্থানে মুক্তি হন জিয়াউর রহমান। আবার ইথার থেকে ভেসে আসে সেই কণ্ঠস্বর—‘আমি জেনারেল জিয়া বলছি’, মানুষের মনে ফিরে আসে স্বস্তি। দেশজুড়ে বয়ে যায় আনন্দের বন্যা। জিয়াউর রহমান বলেন, ‘প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু আলাইকুম। আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগণ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার এবং অন্যদের অনুরোধে আমাকে সাময়িকভাবে বাংলাদেশের চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছে। এ দায়িত্ব ইনশাআল্লাহ আমি সুষ্ঠুভাবে পালন করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব। আপনারা সকলে শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করুন। দেশের সর্বস্থানে—অফিস-আদালত, যানবাহন, বিমানবন্দর, নৌবন্দর, কল-কারখানাগুলো পূর্ণভাবে চালু থাকবে। আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হোন। খোদা হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

৬ নভেম্বর রাত ও ভোরে জনতার উল্লাসসহ বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরতে ৭ নভেম্বর টেলিগ্রাম প্রকাশ করে দৈনিক বাংলা। এ টেলিগ্রামের প্রধান শিরোনাম ছিল—‘আমাদের স্বাধীনতা রাখবই রাখব : জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহি-জনতার বিপ্লব’। এ ছাড়া টেলিগ্রামে ‘আমি জিয়া বলছি’ ও ‘উল্লাসে উদ্বেল নগরী’ শিরোনামে দুটি প্রতিবেদনসহ আরও কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর পরদিন থেকে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদসহ অন্যান্য পত্রিকা সিপাহি-জনতার বিপ্লব এবং সর্বস্তরের মানুষের অনুভূতি বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেসব প্রতিবেদনের কয়েকটি তুলে ধরা হলো:

আমাদের স্বাধীনতা রাখবোই রাখবো

জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহি-জনতার বিপ্লব

সিপাহি-জনতার মিলিত বিপ্লবে চারদিনের দুঃস্বপ্নের প্রহর শেষ হয়েছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সাময়িকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত প্রায় একটায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর সাপাই-জোয়ানরা বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটায়।

শুক্রবার সকাল সাড়ে চারটায় রেডিও বাংলাদেশ থেকে ঘোষিত হয়, ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছেন বিপ্লবী সিপাহিরা। এর কিছুক্ষণ পর জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশে তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।

মিছিল মিছিল আর মিছিল—বিপ্লবের, বিজয়ের, উল্লাসের মিছিল। স্লোগান আর স্লোগান— কণ্ঠের আর বুলেটের মিলিত স্লোগান। করতালি আর করতালিতে প্রাণের দুন্দুভী। আকাশে উৎক্ষিপ্ত লাখো হাত একের পর এক হচ্ছে প্রভাতের স্বর্ণ ঈগল। পথে পথে সিপাহি আর জনতা আলিঙ্গন করছে, হাত নেড়ে জানাচ্ছে অভিনন্দন—কাঁধে কাঁধ হাতে হাত, এক কণ্ঠে এক আওয়াজ—‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই; জওয়ান জওয়ান ভাই ভাই; বাংলাদেশ জিন্দাবাদ; মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ; আমাদের আজাদি রাখবই রাখব; হাতের সঙ্গে হাত মেলাও—সিপাহি-জনতা এক হও।’

এত আনন্দ, এত উল্লাস—সিপাহি ও জনতার হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের কোরাস, স্লোগানের মধ্যে কামানের এমন অর্কেস্ট্র— এ এক অজানা ইতিহাস। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার— এই চারদিনের দুঃস্বপ্নের প্রহর পেরিয়ে এসেছে শুক্রবারের সোবেহ সাদেক, সিপাহি ও জনতার মিলিত বিপ্লব এনেছে শুক্রবারের বিজয়ের সূর্য। ঢাকা উল্লাসে টালমাতাল; বাংলাদেশ আনন্দে উদ্বেল। এই রিপোর্ট আমরা যখন লিখছি তখনো পথে পথে একের পর এক বিজয় মিছিল যাচ্ছে—ট্রাকে চেপে, পায়ে হেঁটে। সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, বাংলাদেশ রাইফেলস, পুলিশ, আনসার ও দমকল বাহিনীর এক একটি দল যাচ্ছে—করছে রাজধানীর পথ পরিক্রমা। তাদের সাথে এক ট্রাকে-লরিতে রয়েছে নানা স্তরের জনগণও। পথে পথে ঘুরছে ট্যাঙ্ক আর আর্মাড কার। পেছনে পেছনে জনতা। কোনো কোনো ট্যাঙ্ক ও আর্মাড কারেও জনতা উঠে বসেছে। স্লোগানে স্লোগানে আকাশে নিক্ষিপ্ত সিপাহিদের গুলিতে—আনন্দে-উচ্ছ্বাসে উদ্বেল নগরী।

শুরু অনেক আগ থেকেই—বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত প্রায় দুটো-আড়াইটা থেকে। ঢাকার জনগণ যখন বুঝতে পারলেন, দুঃস্বপ্নের প্রহর শেষ হয়ে আসছে—শুরু হয়েছে সিপাহি বিপ্লব—তখন থেকেই তারা রাজপথে নামতে শুরু করেছেন। একপর্যায়ে দেখা গেল— ময়মনসিংহ রোডে হাজার হাজার লোক—নানা স্তরের, নানা বয়সী। সিপাহিরা তাদের পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলেছেন। স্লোগান দিতে দিতে জনতা এগোচ্ছে ফার্মগেটের দিকে। রেডিও-ট্রানজিস্টারের পাশে জনতা উৎকর্ণ— মেজর জেনারেল জিয়া কখন ভাষণ দেবেন। ভোর হলো। পথে পথে তখন জনতার জোয়ার। প্রাণের ঢল। ঢাকা নগরে তখন ছড়িয়ে গেছে বিজয়ের বারতা। পথের পাশে মোড়ে মোড়ে জনতা। সিপাহিরা ট্রাকের পর ট্রাকে লরির পর লরিতে যাচ্ছে। তারা উচ্চকণ্ঠে বলে যাচ্ছেন জয়ের কথা। পথের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের বক্তব্য রাখছে; স্লোগান দিচ্ছে আর তার সঙ্গে সঙ্গে স্লোগান জনগণের। বহু মহিলা এসে রাস্তার পাশে এখানে-সেখানে জড়ো হয়েছে। স্কুল ড্রেস পরা ছেলেমেয়েরা এখানে-সেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনতা অভিনন্দন জানাচ্ছে, তাদের দিকে ফুল ছুড়ে দিচ্ছে, ফুলের মালা গলায় পরিয়ে দিচ্ছে। সিপাহিরা অভিনন্দন জানাচ্ছে জনতাকে। পথে পথে গাড়ি থেকে নেমে আলিঙ্গন করছে। তাদের দেয়া মালা পরিয়ে দিচ্ছে জনগণের গলায়। ব্যান্ড পার্টির বাদ্যের তালে তালে পথে পথে আনন্দ নিত্য করছে জনগণ। সকালে পথের পাশে এখানে-সেখানে লোকজন আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করছে। কোথাও কোথাও সড়কদ্বীপে পথচারীরা মিলিত হয়েছেন তাৎক্ষণিক মিলাদ মাহফিলে। (দৈনিক বাংলা—টেলিগ্রাম : ৭ নভেম্বর, শুক্রবার, ১৯৭৫)

সংশয় ও দুঃস্বপ্নের মেঘ অতিক্রম করিয়া—

(ইত্তেফাক রিপোর্ট)

সকল সংশয়, দ্বিধা আর দুঃস্বপ্নের মেঘ অতিক্রম করিয়া গত শুক্রবার বাঙ্গালী জাতির জীবনে এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব বিজয় সূচিত হইয়াছে।

এই বিজয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল দলিলে জনতার প্রাণের অর্ঘ্য দিয়া লেখা হইল বাংলার বীর সেনানীদের নাম। আর দলিলের শিরোনামে শোভা পাইল একটি নাম—মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীরোত্তম, পিএসসি—একটি প্রিয় ও বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বাংলাদেশ রাইফেলস, পুলিশ এবং আসনার বাহিনীর বীর সিপাহিদের এই জাগ্রত চেতনা, বৈপ্লবিক সত্তার এই প্রকাশ প্রমাণ করিল যে, বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতা খর্ব করার সাধ্য নাই কোনো চক্রান্তের, কাহারো ক্ষমতা নাই দেশের সার্বভৌমত্বকে আঘাত করার, দুর্বল করার।

শুক্রবারের প্রভাত জাতির জন্য ছিনাইয়া আনে এক সূর্য-সম্ভব উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, পরাভবহীন এক অপূর্ব আত্মপ্রত্যয়। সিপাহি-জনতার এই মিলিত আবেগ, উল্লাস, জয়ধ্বনি, আনন্দের কল-কল্লোল, সহস্র কণ্ঠের এই উচ্চকিত নিনাদ সেদিন ঘোষণা করিল সৈনিক ও জনতার একাত্মতা।

বিজয়োল্লাসে সমগ্র দেশবাসী যখন আনন্দে উদ্বেলিত, জেনারেল জিয়াউর রহমান তখন শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী এবং সর্বস্তরের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাইলেন। দেশের সর্বত্র অফিস, আদালত, যানবাহন, বিমানবন্দর, মিল-কারখানা পূর্ণভাবে চালু রাখার নির্দেশ প্রদান করিলেন। তাহার এ আহ্বান ও নির্দেশে সৈনিক ও জনগণ ফিরিয়া পাইল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।

স্মরণীয় যে, গত আগস্ট মাসে সরকার পরিবর্তনের পর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনীর প্রধান পদে নিয়োগ করা হয়। গত সোমবার তিনি এক চক্রান্তের শিকার হইয়া আটক হন। কিন্তু বাংলার দেশপ্রেমিক বীর সিপাহিরা গত শুক্রবার প্রভাতে সমস্ত চক্রান্তের অবসান ঘটাইয়া তাহাদের প্রিয় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন এবং তাহাকে স্বীয় পদে বহাল করেন। সেনাবাহিনী আজ তাহার সুযোগ্য পরিচালনায় আস্থাশীল আর দেশবাসী সেনাবাহিনীর জাগ্রত চেতনা ও কর্তব্যবোধে নিশ্চিন্ত, আশাবাদী। (ইত্তেফাক: ৯ নভেম্বর, রবিবার, ১৯৭৫)

‘আমি জিয়া বলছি’

প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু আলাইকুম। আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি : বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগণ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার এবং অন্যদের অনুরোধে আমাকে সাময়িকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছে। এ দায়িত্ব ইনশাল্লাহ আমি সুষ্ঠুভাবে পালন করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব। আপনারা সকলে শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করুন। দেশের সর্বস্থানে—অফিস-আদালত, যানবাহন, বিমানবন্দর, নৌবন্দর ও কল-কারখানগুলি পূর্ণভাবে চালু থাকবে। আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হোন। খোদা হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। (দৈনিক বাংলা—টেলিগ্রাম: ৭ নভেম্বর, শুক্রবার, ১৯৭৫)

প্রাণবন্যার উচ্ছল নগরী

(ইত্তেফাক রিপোর্ট)

“তখনও আকাশে অন্ধকার ছিল। গোলাগুলির শব্দে প্রকম্পিত শেষ রজনীর ঢাকা। শ্বাসরুদ্ধকর। মুহূর্তগুলি ছিল যুগের মতো। বিনিদ্র রাত্রিতে আতঙ্কিত নগরবাসী হয়তো ভাবিতেছিল একাত্তরের সেই পাষাণ ঢাকা দিনগুলির কথা। এমনি সময়ে রেডিও বাংলাদেশের ঢাকা কেন্দ্রের ঘোষকের কণ্ঠে ধ্বনিত হইল স্লোগান ‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ’। উৎকণ্ঠ নগরবাসীর শ্রবণেন্দ্রিয়। এই অসময়ে রেডিও কি বার্তা শুনাইবে? ঘোষকের কণ্ঠে ঘোষিত হইল: ‘সিপাহি বিপ্লব সফল হয়েছে। প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের হাত থেকে জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করা হয়েছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিবেন।’

ঘোষকের এই ঘোষণার মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটিল চারদিনের অস্বস্তিকর দুঃস্বপ্নের। ভোরের আলো উঠিবার আগেই জনতা নামিল রাস্তায়। প্রচণ্ড গুলির মুখেও নিঃশঙ্ক দুঃসাহসী পদক্ষেপে। রাস্তায় সেনাবাহিনীর গাড়ি আর ট্যাংকের ঘরঘর শব্দ। ইহার পর মিছিল, মিছিল আর মিছিল। সিপাহিদের প্রতি উৎফুল্ল অভিনন্দন বা হৃদয় নিংড়ানো আলিঙ্গন। সেনাবাহিনী পরিণত হইল জনগণের সেনাবাহিনীতে। পথে পথে জনতার কলরোল আর সিপাহি-জনতার সম্মিলিত স্লোগান ধ্বনির মাধ্যমে যেন পুনরাবৃত্তি ঘটিল ১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বরের সেই ফেলিয়া আসা স্মৃতি বিজড়িত দিনটির।...”

(ইত্তেফাক: ৮ নভেম্বর, শনিবার ১৯৭৫)

রাজধানীর পথে পথে

জনতার আনন্দ মিছিল

রাজধানী ঢাকা গতকাল শুক্রবার ছিল বিজয় উল্লাসের আনন্দে উদ্বেল এক উৎসবমুখর নগরী। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় দুটোয় রেডিও বাংলাদেশ থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনায়ক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান কর্তৃক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফের দায়িত্বভার গ্রহণের সংবাদ ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁধভাঙা বন্যার স্রোতের মতো রাজপথে নেমে আসে করতালি আর স্লোগানে মুখর স্বতঃস্ফূর্ত লাখো জনতার ঢল আর আনন্দ মিছিল।

সে এক অবর্ণনীয় অভূতপূর্ব দৃশ্য। শহরের পথে পথে, অলিগলিতে ফুল, মালা আর হৃদয়ের সব অর্ঘ্য দিয়ে জনসাধারণ বরণ করে নেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার নিরাপত্তা রক্ষাকারী অকুতোভয় সেনাবাহিনীর সিপাহিদের। আগের দিন গভীর রাত থেকে গতকাল প্রায় সারাদিন ধরে সেনাবাহিনী আর জনতা একাত্ম হয়ে মিশে গিয়ে হাতে হাত রেখে সারা শহরকে প্রকম্পিত করে রাখে গগনবিদারী স্লোগানে। সিপাহি আর জনতার সমবেত কণ্ঠে ধ্বনি ওঠে—বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পাকিস্তানি রিভলভার ও গুলিসহ যুবক আটক

কক্সবাজারে পাচারচক্রের সদস্য আটক

আজ শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া লড়াই

ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর বাগযুদ্ধকে ‘প্রেমিক-প্রেমিকার ঝগড়া’ বললেন ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত

খাল নেই, তবু কোটি টাকার সেতু

দৃষ্টিহীন মালেকের হাত ধরে আলোকিত হচ্ছে শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ

দেশের ৪ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ

প্রকৃতির অলংকার অনিন্দ্যসুন্দর প্রজাপতি ‘হরতনি’

ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে : মাহদী আমিন

যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা, বিশ্বকাপ থেকে বাদ রেফারি ওমর আরতান

১০

নেইমারের চোটের বর্তমান অবস্থা জানাল ব্রাজিল

১১

হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ শেষ হয়নি : নেতানিয়াহু

১২

ডিআইজির কক্ষ থেকে আরও ২ কালনাগিনী সাপ উদ্ধার

১৩

আজ টানা ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

১৪

নাইটক্লাব কাণ্ডে তদন্তে স্টোকস, নেতৃত্ব নিয়েও শঙ্কা

১৫

দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক / ঢাকা-মস্কো সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ ও সম্প্রসারণের অঙ্গীকার

১৬

চেকপোস্টে ৩ বিদেশি পিস্তল-গুলিসহ যুবক আটক

১৭

জোড়া পেনাল্টিতে নাটকীয় জয়ে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি নেদারল্যান্ডসের

১৮

ভোরে ঝরল ৪ প্রাণ

১৯

অপরাধবিষয়ক টিভি অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করল ইরাক

২০
X