

আমাদের চেতনায় ৭ নভেম্বর ভাস্বর। কারণ, ৭ নভেম্বরের চেতনা আর আমাদের দেশজ ও আদর্শিক চেতনা অভিন্ন। এ চেতনার জন্ম এক দিনে হয়নি। এ চেতনা কখনো দানা বেঁধেছে দেশকে কেন্দ্র করে। আমরা জানি, মানুষ মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কিন্তু তাই বলে মানুষ মাটিকে আঁকড়ে থাকে না, মাটিতে পা রেখে সে মাথা তুলে দাঁড়ায়, মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। সে মানুষই আগুয়ান যার অভিযান আসমানে, গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলে গেছেন, যে প্রাণীর মেরুদণ্ড মাটির যত কাছাকাছি, যত বেশি সমান্তরালে, তার বোধ-বুদ্ধি-চেতনা তত বেশি নিম্নমানের। পক্ষান্তরে যে প্রাণী তার মেরুদণ্ডকে যত বেশি সোজা করতে ও যত বেশি খাড়া করতে পেরেছে, তার চেতনা-মেধা-মগজ-প্রজ্ঞা ও প্রতিভা তত বেশি মহীয়ান ও গরীয়ান হয়েছে।
দেশজ চেতনা সুতরাং মানুষের জন্য মাটির সমান্তরাল হওয়া কিংবা মাটিতে নুইয়ে পড়া নয়। পক্ষান্তরে আদর্শিক চেতনা অর্থও নয়, মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা উন্মার্গগামী হয়ে ইউটোপিয়ার আসমানে বিচরণ করা। ৭ নভেম্বরের চেতনা কিংবা আমাদের চেতনায় ৭ নভেম্বর বলতে আমি যা বুঝি, তা এর আগে জাতিসত্তার পরিচিত নামক এক প্রবন্ধে বিশদ আলোচনা করেছিলাম। তাতে যা বলেছিলাম, আজও সে কথাই বলতে চাই। যেমন— বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাত্র কিছুদিন পরের কথা। কলকাতার খ্যাতিমান লেখক অন্নদা শঙ্কর রায় বাংলাদেশ সফরে আসেন এবং এখানকার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের আলোচনা সভা ও সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। কলকাতায় ফিরে গিয়ে তিনি সেখানকার দেশ পত্রিকায় বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতার ওপরে একটি সুখপাঠ্য প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। প্রবন্ধের এক স্থানে অন্নদা শঙ্কর রায় যা বলেছিলেন তার মূল বক্তব্যটা ছিল এ রকম: পাকিস্তানিরা মনে করেছিল বাংলাদেশের লোকজন শুধুই বাঙালি সুতরাং তাদের যেভাবেই হোক মুসলমানিত্ব শেখাতে হবে। পাকিস্তানি বানাতে হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর আমরা, মানে ভারতীয়রা (এবং বাংলাদেশ যারা আমাদের অনুসারী ও অনুকারী মহল) মনে করতে শুধু করেছি যে, বাংলাদেশের জনগণ শুধু মুসলমান সুতরাং যে করেই হোক তাদের বাঙালি বানাতে হবে।
অন্নদা শঙ্কর রায় তার ওই প্রবন্ধে জোর দিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তানিরা যেমন জোর করে মুসলমানিত্ব শেখাতে গিয়ে ভুল করেছিল, তেমনি বাংলাদেশের মানুষকে জোর করে বাঙালি বানাতে যারা কোমর বেঁধেছেন, তারাও ভুল করছেন।
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার গোড়াতেই অন্নদা শঙ্কর রায়ের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে যে ভুলটি ধরা পড়েছিল, আজ এতদিন এতকাল পরও আমরা সে ভুলটা ধরতে পারছি না—ভুল করেই যেন সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে চলেছি। আমাদের একদল এখনো মনে করেন বাংলাদেশের মানুষ শুধুই বাঙালি, সুতরাং যে করেই হোক তাদের মুসলমান বানাতে হবে। নইলে এ দেশে মুসলমানিত্ব বা ইসলাম থাকবে না। আরেক দল মনে করছেন, বাংলাদেশের মানুষ স্রেফ মুসলমান, সুতরাং যে কোনো মূল্যে তাদের বাঙালি বানাতে হবে, নইলে বাঙালি হিসেবে আমাদের জাতিসত্তা বিলুপ্ত হবে।
এই দ্বিবিধ মানসিকতা হতেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, এ দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গন ও প্রাঙ্গণে দুটি ভিন্নমুখী ধারা, দুটি পৃথক ধারার মনুষ্য সৃষ্ট আলোড়ন। এই আলোড়ন যে কোনো আন্দোলন নয়, তা আলোড়ন সৃষ্টিকারীরা যেমন, তেমনি বাইরের অনেকেও বুঝতে পারছেন না। সেইসঙ্গে আরও একটি ব্যাপার তারা বুঝতে পারেন না কিংবা ইচ্ছা করেই বুঝতে চান না যে, যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে এই আলোড়ন বা আন্দোলন তাদের সত্তার গভীরে দেশজ চেতনা যেমন জীবন্ত, তেমনি আদর্শিক চেতনাও চির জাগরূক। একটা থেকে আরেকটা বিচ্ছিন্ন করে দেখার উপায় নেই।
দেশজ চেতনা ও আদর্শিক চেতনা
দেশজ চেতনা তথা দেশগত, ভাষাগত, কৃষ্টিগত পরিচয়বোধ এবং আদর্শিক চেতনা তথা ধর্মগত, দর্শনগত ও ঐতিহ্যগত স্বাতন্ত্র্যিক উপলব্ধি কি একই সঙ্গে কোনো মানুষের মধ্যে এবং ব্যাপকার্থে কোনো জাতির মধ্যে দানা বাঁধতে পারে? পণ্ডিত হ্যান্স কোহেন তার জাতি ও জাতীয়তাবোধ সংক্রান্ত একাধিক গবেষণা পুস্তকে নানা প্রমাণ উদাহরণ উল্লেখ করে বলেছেন, পারে। শুধু তাই নয়, তার অভিমত আধুনিক যুগের জাতীয়তাবাদ মূলত এই ধরনের আপাতবিরোধী অথচ পরস্পর অচ্ছেদ্য চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। তবে এই বিষয়ে পণ্ডিতদের গবেষণার দ্বারস্থ না হয়েও এ দেশেরই দু-একটা জানা-অজানা ঘটনা তুলে ধরলে ব্যাপারটা আরও বেশি পরিষ্কার হবে বলে মনে করি।
একই সঙ্গে বাবা-মায়ের সন্তান হয়েও কোনো ব্যক্তির নাম পরিচয় যেমন তার মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নতার পরিচায়ক না হয়ে বরং অচ্ছেদ্য সম্পর্কের পরিচায়ক হয়; তেমনি আমাদের এ দেশগত পরিচয়টাও একই সঙ্গে আমাদের ভাষাগত, ধর্মগত, সংস্কৃতিগত সব পরিচয়েই অভিন্ন স্মারক হবে, হতে বাধ্য। আমাদের জাতিসত্তার এই দেশগত পরিচিতি-ন্যাশনাল আইডেন্টিটি যতদিন পর্যন্ত সঠিকভাবে মেনে নেওয়া না হবে, ততদিন পর্যন্ত ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’ বলতে একেক মহল এই দেশবাসীকে একেকভাবে বিভ্রান্ত করতে চাইবে। ইতিহাস সাক্ষী, সেই পাঠান আমলেই এ দেশে একজন স্বাধীন সুলতান হাজী ইলিয়াস শাহ ‘বাঙালি’ এ উপাধি গ্রহণ করে ‘বাঙালি’ এ টার্মটিকে অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত করে গেছেন। এই ইতিহাস ওল্টানোর অধিকার কারও নেই।
আসলে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ যে তার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সীমানায় চিহ্নিত ও পরিচিত হয়ে রয়েছে, এটাই অনেকের মর্মপীড়ার কারণ। সে কারণে এই সীমানা চৌহদ্দিঘেরা জাতিসত্তার অখণ্ড বাংলাদেশি পরিচয় ভোলার বা ঘোচার প্রয়াস-প্রচেষ্টা ঘরে-বাইরে সমভাবে বিদ্যমান। ভারতীয় প্রচারণায় মুগ্ধ হয়ে সেদিন সিংহল তার দেশজ নাম-পরিচয় বাদ দিয়ে ভারতীয় পৌরাণিক শ্রীলঙ্কা নাম গ্রহণ করল এবং ইংরেজিকে সরকারি ভাষা থেকে খারিজ করে দিল; সেদিনই তাদের তথাকথিত তামিল সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সেই যে পণ্ডিতরা বলে গেছেন, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ভৌগোলিক আগ্রাসনের পূর্বশর্ত, শ্রীলঙ্কা তার সর্বাধুনিক প্রমাণ। ৭ নভেম্বরের চেতনা যতদিন এ জাতির মর্মমূলে জীবন্ত হয়ে থাকবে, ততদিন কেউ বাংলাদেশকে সিকিম বা শ্রীলঙ্কা বানাতে পারবে না।
লেখক: সহপ্রচার সম্পাদক-বিএনপি