

গুম ও আয়না ঘর শব্দ দুটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। হাসিনা সরকারের আমলে কারও দরজায় রাতের আঁধারে অচেনা গাড়ি এসে থামত, তাকে ধরে নিয়ে যেত, রাখা হতো আয়না ঘরে, তারপর নির্মম নির্যাতন শেষে তিনি পৃথিবী থেকেই উধাও হয়ে যেতেন। তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যেত না। তিনি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, জানা যেত না এ খবরও। পরিবারের আর্তনাদ, সন্তানদের অপেক্ষা, মায়ের চোখের জল—সবকিছুই এক অমানবিক নীরবতার আড়ালে চাপা পড়ে যেত। হাসিনা আমলের সেই নীরবতাই আজও এক গভীর মানবাধিকার সংকটের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
রাজনীতিতে গুমের ব্যবহার নতুন নয়। রাষ্ট্রক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এক ঘৃণ্য কৌশল হিসেবে গুম ব্যবহার করা হয় ভয় সৃষ্টি ও ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে। বিরোধী রাজনীতিক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী কিংবা সাধারণ নাগরিক যে কেউ এর শিকার হতে পারেন। যখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে আইনের ঊর্ধ্বে কিছু শক্তি কাজ করে, তখন গণতন্ত্রের ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। নাগরিকরা তখন আর মুক্তভাবে কথা বলতে বা প্রশ্ন তুলতে সাহস পান না। এ নীরবতা ক্ষমতাসীনদের জন্য আরামদায়ক হলেও, রাষ্ট্রের জন্য তা এক অদৃশ্য ক্ষয়ের সূচনা করে।
গুম মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়। এটি একটি পরিবারের জীবন থেকে আলো কেড়ে নেওয়া। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে স্পষ্টভাবে বলা আছে, জোরপূর্বক গুম একটি অপরাধ, যার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। জাতিসংঘের এ-সংক্রান্ত কনভেশন অনুযায়ী, গুমকে গণহত্যা ও নির্যাতনের সমপর্যায়ের মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবু বিশ্বজুড়ে বহু রাষ্ট্র আজও গুমের দায় এড়িয়ে চলছে, তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়ায় অদ্ভুত নীরবতা বজায় রাখছে।
আর্জেন্টিনা, চিলি, ব্রাজিল, এল সালভাদর—লাতিন আমেরিকার ইতিহাস গুমের রক্তে রঞ্জিত। আর্জেন্টিনার ‘ডার্টি ওয়ার’-এর সময় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছিল। পরে সেই হারানো সন্তানের খোঁজে ‘মাদারস অব প্লাজা দে মায়ো’ সংগঠন জন্ম নেয়, যারা আজও মানবতার পক্ষে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া, মিশর কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তানেও গুম এখনো একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটও এ বৈশ্বিক চিত্র থেকে আলাদা ছিল না।
গুমের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রেখে গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। গুম নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করে এটি তৈরি করা হয়েছে। ‘গুমঘর’ স্থাপন ও ব্যবহারের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। এ ছাড়া গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের লক্ষ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং অভিযোগ গঠনের ১২০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে এতে।
গুমের রাজনীতি আসলে গণতন্ত্রের জন্য এক নিঃশব্দ হুমকি। যেখানে গুমের ভয় আছে, সেখানে বাকস্বাধীনতা থাকে না। গুমের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা যায় কিছুদিনের জন্য, কিন্তু এতে হারিয়ে যায় রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতা। গুম ও খুনের রাজনীতির শেষ পরিণতি যে কত মর্মান্তিক হতে পারে, তা শেখ হাসিনার পতনের মাধ্যমে আমরা আবারও প্রত্যক্ষ করলাম। আমাদের প্রত্যাশা, শাসকশ্রেণি এ থেকে শিক্ষা নেবে। মুখ দেখবে আয়না ঘরের আয়নায়। পা বাড়াবে না আত্মঘাতী পথে।