

নারকেল বাংলাদেশসহ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে চাষকৃত একটি জনপ্রিয় ফল। পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ এবং শীতল ও কোমল মিষ্টি স্বাদযুক্ত এ ফলের পানি পানে মানুষের শরীরের জলীয় ভারসাম্য রক্ষা, ওজন হ্রাস, হৃৎপিণ্ড, ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, হজমশক্তি এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। নারকেলের শাঁস স্নেহ, আঁশ, চর্বি, ভিটামিন ও খনিজ ভরপুর এবং ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া রোগপ্রতিরোধী। শাঁস থেকে নিষ্কাশিত তেল রান্না, চুল ও ত্বকের যত্নে ব্যবহৃত হয়। শাঁসে বিদ্যমান আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম এবং ক্যালসিয়াম মানুষের হাড় ও দাঁত নিরোগ রাখতে অত্যন্ত কার্যকরী। নারকেলগাছের পাতা বহুভাবে ব্যবহৃত হয় ঝুড়ি, মাদুর ও বিভিন্ন হস্তশিল্প তৈরি, বাগান, বাড়ির বেষ্টনী এবং জ্বালানি হিসেবে। ফলের ছোবড়া উত্তম জ্বালানি উপকরণ এবং ছোবড়া থেকে তৈরি আঁশ দিয়ে দড়ি, মাদুর, ব্রাশ, গদি ও পাপোশ তৈরি করা হয়। নারকেলের খুলি বাগান পরিচর্যায় এবং বিভিন্ন শৌখিন সামগ্রী তৈরির কাজে লাগে এবং গাছের পাতা, ছোবড়া ও খুলি পচনের পর জমিতে জৈবসার হিসেবে প্রয়োগ করা যায়। বস্তুত, নারকেল গাছ নানা পুষ্টি উপাদান প্রদেয় একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। উপযুক্ত পরিচর্যা করলে একটি নারকেলগাছ ৬০ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী এ ফল বাগানের প্রতিটি গাছ থেকে বছরে ২০০ থেকে ২৫০টি নারকেল পাওয়া যায়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। বাংলাদেশে প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর জমি থেকে বার্ষিক সাড়ে ৪ লাখ মেট্রিক টন কাঁচা নারকেল বা ডাব উৎপাদন হয়। কিন্তু বর্তমানে এ গাছ কুঁজিত সর্পিলাকার সাদা মাছির (রুগোস স্পারালিং হোয়াইটফ্লাই) সংক্রমণে চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি।
কুঁজিত সর্পিলাকার সাদামাছি হেমিপ্টেরা বর্গের অন্তর্ভুক্ত এলাইরোডিডি পরিবারের একটি অনিষ্টকারী পোকা, যার বৈজ্ঞানিক নাম এলিউরোডিকাস রুগিওপারকুলেটাস। দুই জোড়া সাদা পাখাবিশিষ্ট এ পোকার দেহ প্রায় ২ দশমিক ৫ মিলিমিটার লম্বা, ফ্যাকাশে হলুদ, ডিম্বাকৃতি ও নরম। আক্রান্ত নারকেলগাছের পাতার অঙ্কীয় পৃষ্ঠে তাকালে সাদা মোমজাতীয় ঝাপটা, খসখসে ও ভাঁজযুক্ত আবরণ পরিলক্ষিত হয়। পূর্ণাঙ্গ মাছিগুলো সাধারণত উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় বেশি সক্রিয় থাকে। সকাল এবং সন্ধ্যায় সচরাচর ৬.০ থেকে ১০.০ ঘটিকায় এরা এক পাতা থেকে অন্য পাতায় বা এক গাছ থেকে অন্য গাছে উড়ে বেড়ায়। ডিম, শূককীট, মূককীট এবং পূর্ণাঙ্গ পোকা—এই চারটি ধাপে তারা জীবনচক্র সম্পন্ন করে। পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী মাছি পাতার নিচের দিকে সর্পিলাকার রেখায় ফ্যাকাশে হলুদ রঙের ডিম পাড়ে, যা পরে গাঢ় বাদামি বর্ণ প্রাপ্ত হয়। সপ্তাহান্তে ডিম ফুটে চেপ্টা, ডিম্বাকার, হালকা বাদামি রঙের মোমে আবৃত, চলনক্ষম এবং বহুভোজী শূককীট বেরিয়ে আসে। শূককীটকাল প্রায় দুই সপ্তাহ এবং এ সময় এরা কয়েকবার খোলস পরিবর্তন করে। অতঃপর, খাদ্য গ্রহণ বন্ধ করে ছদ্মাবরণে মূককীট দশায় উপনীত হয়। প্রায় ১০ দিন পর মূককীট খোলস ভেঙে পূর্ণাঙ্গ মাছি বেরিয়ে আসে। পূর্ণাঙ্গ মাছি দেখতে সাদা বর্ণের। স্ত্রী মাছি পাতার নিচে সর্পিল রেখায় ডিম পাড়ে এবং ডিমের ওপর ভাঁজযুক্ত বা খসখসে পৃষ্ঠবিশিষ্ট আস্তরণ তৈরি করে—এসব আকৃতি ও আচরণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এ পোকা কুঁজিত সর্পিলাকার সাদামাছি নামে অভিহিত।
কুঁজিত সর্পিলাকার সাদামাছি একটি বহুভোজী কীট। এরা প্রায় ১২০ প্রজাতির উদ্ভিদে আক্রমণ করতে পারে। নারকেল বাগানে এদের প্রাদুর্ভাব সারা বছরই ঘটে। তবে সর্বাধিক সংক্রমণ ও বিচরণের অনুকূল সময় গরম ও আর্দ্র মৌসুম—বাংলাদেশে, বিশেষ করে মার্চ থেকে অক্টোবর মাস। শূককীট ও পূর্ণাঙ্গ মাছি গাছের পাতার নিচের ভাগ থেকে রস শোষণ করে। ফলে পাতায় পীতাভ দাগ পড়া, পাতা কুঁচকে যাওয়া এবং ঝরে পড়ার লক্ষণ দেখা যায়। মাছি রস শোষণের পর তার শরীর থেকে মিষ্টি রস নির্গত করে, যার ওপর কালো ছত্রাক জন্মায়। ফলস্বরূপ, গাছের পাতা কালো আচ্ছাদনে ঢেকে যায় এবং গাছের সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হয়। সংক্রমিত গাছে পিঁপড়া, ছত্রাক ও অন্যান্য কীট আকৃষ্ট হয় এবং গাছে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। মাটি থেকে রস ও পুষ্টি উপাদান শোষণসহ গাছের সার্বিক শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ বিঘ্নিত হয়ে উৎপাদন ও ফলের মান হ্রাস পায়। কুঁজিত সর্পিলাকার সাদামাছির মারাত্মক সংক্রমণে নবরোপিত ও অপুষ্ট গাছ মারা যেতে পারে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ধারণা, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নিঃসৃত গ্যাসের প্রভাবে তাদের নারকেলগাছের পাতা কালো হয়ে শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। যদিও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্গত গ্যাস; কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ইত্যাদি বায়ুদূষণের মাধ্যমে গাছের পাতার ক্লোরোফিল ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে পাতা হরিদ্রাভ হওয়া, সালোকসংশ্লেষণ অবনমিত এবং দীর্ঘমেয়াদে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন কমে যায়। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সন্নিকটবর্তী এলাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে গাছের বাষ্পীভবন হার বেড়ে যায়, ফলে পানিস্বল্পতা ও পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়। পরিণতিতে, নারকেলগাছের পাতায় জ্বলজ্বল দাগ সৃষ্টি, পাতা শুকিয়ে যাওয়া এবং ফুল ও ফল ঝরে পড়ার লক্ষণ দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশের সর্বত্রই নারকেলগাছে কুঁজিত সর্পিলাকার সাদামাছির সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। তবে, দক্ষিণাঞ্চলের নারকেল গাছ আধিক্য জেলা বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও বাগেরহাট বেশি সংকটাপন্ন। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় উৎপত্তির পর এ পোকা এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে ছড়িয়ে যায়। বর্তমানে এটি ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে নারকেলগাছের মুখ্য আপদরূপে চিহ্নিত। বাংলাদেশে ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে উপকূলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলে এ পোকা প্রথম শনাক্ত হয়। বর্তমানে নারকেলগাছ ছাড়াও এরা পোষক উদ্ভিদ হিসেবে সুপারি, কলা, পেঁপে, আম, বেল, কাঠবাদামসহ বহু গাছে ছড়িয়ে আছে। অনুকূল পরিবেশে, বিশেষ করে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া, কম বৃষ্টিপাত এবং মৃদুমন্দ ও শান্ত বাতাস বিদ্যমান থাকলে এরা দ্রুত বিস্তার ঘটিয়ে এসব ফসলের জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে।
কুঁজিত সর্পিলাকার সাদামাছি বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত নারকেল ও অন্যান্য অর্থনৈতিক ফসল বিধ্বংসী একটি মারাত্মক কীট। নারকেল ও অন্যান্য কৃষি ফসল এ সর্বগ্রাসী পোকার প্রাদুর্ভাব ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করা দুরূহ। তথাপিও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকরভাবে দমন করা সম্ভব। সমন্বিত ব্যবস্থাপনার প্রতিরোধী কৌশল হিসেবে সংক্রমিত এলাকার কাছাকাছি ও পোষক উদ্ভিদ, যেমন—কলা, পেঁপে, বেল ইত্যাদি ফসলের বাগানের সন্নিকটে নারকেল বাগান না করা। কুঁজিত সর্পিলাকার সাদামাছি মূলত দুর্বল, পুষ্টিহীন ও পীড়িত গাছে বেশি আক্রমণ করে। তাই সঠিক ও সুষম সার প্রয়োগ করলে নারকেল গাছের পাতা সবল ও মোটা হয়, নতুন কুঁড়ি দ্রুত গজায় ও আক্রান্ত পাতা দ্রুত প্রতিস্থাপিত হয় এবং গাছের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে নারকেলগাছ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়; বরং সাদামাছির সংক্রমণে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জনসচেতনতা সৃষ্টি করে বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে এ পোকা দমন করলে নারকেল গাছ সংরক্ষিত হবে, যা দেশের কৃষি অর্থনীতি, পরিবেশ এবং গ্রামীণ জীবিকাকে সুরক্ষিত রাখবে।
লেখক: অধ্যাপক, কীটতত্ত্ব বিভাগ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর