

গাজায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতি বিশ্ববাসীর মনে খানিকটা স্বস্তি এনেছিল। ধারণা করা হয়েছিল, অন্তত এই বিরতির সুযোগে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষ কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারবে। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো অবাধে খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে পারবে; কিন্তু তা ঘটেনি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও ইসরায়েল নানা অজুহাতে গাজায় মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। ফলে লাখো ক্ষুধার্ত, আহত ও গৃহহীন মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েই চলেছে।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ইসরায়েল ত্রাণবাহী ট্রাকগুলোর প্রবেশে প্রশাসনিক জটিলতা, অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাই এবং সীমান্ত চেকপোস্টে দীর্ঘ বিলম্ব সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রেই ত্রাণসামগ্রী গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই পচে যাচ্ছে বা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বাস্তবে, যুদ্ধ থেমেছে শুধু নামেই—মানবিক সংকটের অবসান হয়নি, বরং নতুন রূপে তা আরও গভীর হচ্ছে।
গাজা এখন এক বিশাল মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। খাদ্য নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই, ওষুধের তীব্র সংকট, হাসপাতালগুলো কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত। শিশুদের কণ্ঠে ক্ষুধার কান্না, মায়েদের মুখে অসহায়তা। যুদ্ধবিরতির পরও যদি মানবিক সহায়তা পৌঁছানো না যায়, তবে এটি শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি এক ভয়াবহ নৈতিক বিপর্যয়ও।
এমন একটি পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলটিতে মানবিক ত্রাণ সহায়তা প্রবেশ ও বিতরণ কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সিভিল-মিলিটারি কোঅর্ডিনেশন সেন্টারের (সিএমসিসি) হাতে যাচ্ছে। বর্তমানে এ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা ইসরায়েলি বাহিনীকে সরিয়ে সিএমসিসি পুরো কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট। যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে ইসরায়েল চরম খাদ্য সংকটে থাকা গাজায় প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক অত্যাবশ্যকীয় পণ্য প্রবেশের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গড়ে মাত্র ১০০টির মতো ট্রাক প্রবেশ করতে পেরেছে। এমন পরিস্থিতিতে ত্রাণ প্রবেশ ও বিতরণ কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ সিএমসিসির হাতে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার খবর জানা গেল। ত্রাণ কার্যক্রমের তদারকি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সিএমসিসির হাতে গেলেও ইসরায়েলও এ প্রক্রিয়ার অংশ থাকবে। তবে কী ধরনের ত্রাণ সহায়তা গাজায় ঢুকবে এবং কীভাবে তা বিতরণ হবে, সে সিদ্ধান্ত সিএমসিসিই নেবে। এদিকে, যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত হামলায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ হামলায় একজন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছে, পাশাপাশি উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও ৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে (১০ অক্টোবর) গাজায় ইসরায়েলি হামলায় মোট ২৪১ নিহত এবং ৬১৪ জন আহত হয়েছেন।
আমরা মনে করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মুসলিম দেশগুলোকে এখনই আরও জোরালো ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হলে কেবল অস্ত্রবিরতি নয়, মানবিক করিডোর নিশ্চিত করাও জরুরি। ইসরায়েলের ওপর কঠোর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ ছাড়া এ অমানবিক অবরোধ ভাঙা সম্ভব নয়। গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে কেবল ইট-পাথর নয়, চাপা পড়েছে মানবতার ন্যূনতম মূল্যবোধও। যুদ্ধবিরতির পরও যদি ত্রাণ পৌঁছাতে না পারে, তবে এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার দায় কেবল ইসরায়েলের নয়, পুরো বিশ্বের। আজ গাজার শিশুদের চোখে যে অন্ধকার, তা আমাদের নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। এই লজ্জা থেকে মুক্তি পেতে হলে মানবতার পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠ তুলতেই হবে এখনই।