

রাধারমণ দত্ত বাংলা সাহিত্যিক, সাধক কবি, বৈষ্ণব বাউল, ধামালি নৃত্যয়ের প্রবর্তক। সংগীতানুরাগীদের কাছে তিনি রাধারমণ বলেই সমধিক পরিচিত। বাংলা লোকসংগীতের পুরোধা লোককবি রাধারমণ রচিত ধামাইল গান দুই বাংলায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। রাধারমন নিজের মেধা ও দর্শনকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। কৃষ্ণ বিরহের আকুতি আর না-পাওয়ার ব্যথা কিংবা সব পেয়েও না-পাওয়ার কষ্ট তাকে সাধকে পরিণত করেছে। তিনি দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ, প্রেম, ভজন, ধামাইলসহ নানা ধরনের কয়েক হাজার গান রচনা করেছেন। রাজবৈদ্য চক্রপাণি দত্তের অধস্তন পুরুষরা শ্রীহট্টের প্রাচীন সামন্ত বংশ।
লোকসংস্কৃতির উজ্জ্বল নক্ষত্র এই গীতিকবি ১৮৩৩ সালে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কিশোর বয়সে পিতৃহারা হওয়ায় জগতের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সৃষ্টিকর্তার স্বরূপ অনুসন্ধানে মনোনিবেশ করেন তিনি। একপর্যায়ে সাধক রঘুনাথ গোস্বামীর শিষ্যত্ব ও দীক্ষা গ্রহণ করেন। শুরু করেন শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব ও সহজিয়া মতবাদে লেখাপড়া এবং সহজিয়া মতে সাধন-ভজন। শ্রীকৃষ্ণভাবে বিভোর হয়ে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম নিয়ে গান রচনা করেন। রাধারমণের পিতা রাধামাধব ছিলেন পণ্ডিত ও অশেষ গুণের অধিকারী। পিতার সংগীত ও সাহিত্যসাধনা রাধারমণকে প্রভাবিত করে। কালক্রমে তিনি স্বভাবকবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ‘তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো, আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে’ কিংবা ‘জবা কুসুম সন্ধ্যামালতি আনরে তুলিয়া মনোরঙ্গে সাজাও কুঞ্জ সব সখী মিলিয়া’, ‘মুর্শিদ বলি নৌকা ছাড়ো তুফান দেখি ভয় করিও না, মুর্শিদ নামে ভাসালে তরী অকূলে ডুবিবে না’, ‘দেখলাম দেশের এই দুর্দশা, ঘরে ঘরে চোরের বাসা’ কিংবা ‘কারে দেখাব মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া’, ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে’, ‘জলে গিয়াছিলাম সই’সহ এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের রচয়িতা রাধারমণ দত্ত। এসব গান শুনলে বোঝা যাবে রাধারমণ দত্তের সংগীত কত বিচিত্র বিষয়ে পরিপূর্ণ। তার গানের সংখ্যা তিন হাজারের অধিক। সাধক রাধারমণের গানের বেশকিছু গানের বই বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। তার গানে প্রার্থনা, আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব ও পরমাত্মাবিষয়ক সংগীত ছাড়াও রয়েছে স্বদেশপ্রেম। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ব্যতিক্রম হচ্ছে ধামাইল গান। রাধারমণের গানে শব্দপ্রয়োগের ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতা নয়, বরং সমাজের সম্প্রীতিকে দৃঢ় করতে সচেষ্ট। আল্লাহ-ঈশ্বরে যেমন তিনি পার্থক্য দেখেননি আবার গুরু ও মুর্শিদ শব্দের পার্থক্যও দেখেননি। তার গানের সুরে ভুবন মাতোয়ারা হলেও রাধারমণ দত্তের নিজের ভূসম্পত্তি অর্পিত হওয়ায় রাধারমণ গবেষক ও ভক্তদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। রাধারমণ দত্তের গানের চর্চা বাড়াতে তার জন্মভিটায় রাধারমণ কমপ্লেক্স দ্রুত নির্মাণের দাবি রয়েছে স্থানীয় সাংস্কৃতিককর্মীদের। সে জন্য তার জন্মভিটায় কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। অগাধ গুণের অধিকারী রাধারমণের ৮২ বছর বয়সে ১৯১৫ সালের ১০ নভেম্বর জীবনাবসান ঘটে। বৈষ্ণব মতবাদের অনুসারী রাধারমণকে কেশবপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়।