

বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, যার বড় শিকার শিশুরা। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশার। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর পেছনে একাধিক কারণ দায়ী থাকলেও, এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতার যে কোনো বিকল্প নেই—এটা সন্দেহাতীত।
খবরে প্রকাশ, রোববার একই দিনে দেশের একাধিক স্থানে পানিতে ডুবে সাত শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। মেহেরপুর সদর উপজেলার রাজনগর গ্রামে একই পরিবারের তিন ভাইয়ের চার কন্যাশিশু এবং ভোলার লালমোহনে পৃথক স্থানে মৃত্যু হয় তিন শিশুর।
মেহেরপুরের ঘটনায় জানা যায়, দুপুর দেড়টার দিকে চার শিশু একসঙ্গে বিলে পদ্মফুল তুলতে যায়। বিকেল গড়িয়ে গেলেও তারা আর ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর বিলপাড়ে তাদের স্যান্ডেল ও কাপড় পড়ে থাকতে দেখে সন্দেহ হয়। পরে পানিতে ভাসমান অবস্থায় তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেন এলাকাবাসী। একজন নিখোঁজ থাকায় ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়। পরে উদ্ধারকর্মীরা অভিযান চালিয়ে বিলের একটি গভীর গর্ত থেকে শেষ শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করেন। তারা সবাই রাজনগর গ্রামের মল্লিকপাড়ার বাসিন্দা। তাদের দুজন অষ্টম শ্রেণি আর দুজন চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। একসঙ্গে এক বাড়ির চার শিশুর এ মর্মান্তিক মৃত্যুতে গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া বিরাজ করছে। এ ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, শাপলা তুলতে গিয়ে পিচ্ছিল কাদায় পড়ে তারা পানিতে তলিয়ে যায়। এদিকে ভোলার লালমোহনে পুকুরে ডুবে নিহত তিন শিশু হলো কালমা ইউনিয়নের চরলক্ষ্মী এলাকার নূর ইসলামের মেয়ে মোহনা আক্তার। একই এলাকার মৃত শফিকুল ইসলামের মেয়ে নুসরাত এবং চরভূতা ইউনিয়নের রহিমপুর এলাকার আকতার হোসেনের ছেলে মো. আলিফ। জানা যায়, দুপুরে চরলক্ষ্মী এলাকায় একসঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয় শিশু মোহনা ও নুসরাত। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বসতবাড়ি সংলগ্ন একটি পুকুরে ডুবন্ত অবস্থায় তাদের পাওয়া যায়। এদিন দুপুরে চরভূতা ইউনিয়নের রহিমপুর এলাকায় খেলার ছলে পরিবারের অগোচরে বাড়ির পাশের পুকুরে পড়ে মারা যায় শিশু আলিফ।
দেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনার সংখ্যা যে কোনো মানুষের কপালে ভাঁজ ফেলতে বাধ্য। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) জরিপের ফল বলছে, দেশে প্রতি বছর পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে প্রায় ১৯ হাজার মানুষ। তার মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজারই শিশু; যা ৭৫ শতাংশের বেশি। এক থেকে চার বছর বয়সীদের সবচেয়ে ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। ডুবে মৃত্যুর ৭০ শতাংশই ঘটছে বাড়ির পাশে থাকা পুকুরে। ২০২৪ সালের আরেকটি গবেষণা বলছে, প্রতিদিন দেশে ৫১ জনের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে পানিতে ডুবে; এর ৭৫ শতাংশের বেশি শিশু।
আমরা মনে করি, এসব মৃত্যু কেবল সংখ্যা নয়, প্রতিটি ঘটনাই সংশ্লিষ্ট পরিবারের একেকটি শোকগাথা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিভাবকদের দায় অস্বীকার করার উপায় নেই। কেননা ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ শিশুর মৃত্যুর কারণ বাড়ির আশপাশের পুকুর। উল্লিখিত তিনটি ঘটনার দুটিতেও দেখা যাচ্ছে, বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে মৃত্যু ঘটনা। ফলে এটা পরিষ্কার যে, অভিভাবকরা আর একটু যত্নবান, সচেতন হলেই মৃত্যু ঠেকানো অসম্ভব কিছু নয়। সর্বদা স্মরণে রাখতে হবে, শিশুরা নাবালক। কোনটা ঝুঁকির আর কোনটায় ঝুঁকি নেই—এ জ্ঞান তাদের নেই। পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু কমাতে সরকারের সাঁতার শেখানোর কিছু উদ্যোগ রয়েছে, যা একদিকে অপ্রতুল; অন্যদিকে কার্যত এসব উদ্যোগের সফলতাও নির্ভর করে অভিভাবকের ওপরই।