

বিএনপি ২৩৭ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করে দেশের রাজনীতিকে তুলে দিয়েছে নির্বাচনী ট্রেনে। যদিও এই প্রার্থীরা চূড়ান্ত নন। প্রয়োজনে যে কোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বাকি আসনে শরিক দলের কতজন বিএনপির মনোনয়ন বা সুদৃষ্টি পেতে পারে—এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। মনোনীতদের ভালো-মন্দ, বঞ্চিতদের ত্যাগী-ভোগী চরিত্র সব কিছুই উঠে আসছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত তথ্য, অপতথ্য ও গুজবের গজবে বিভ্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। মূলধারার গণমাধ্যমগুলোও নেমে পড়েছে ভোটের হাওয়ায় দর্শক-শ্রোতাকে আন্দোলিত করতে। দেশের সব জায়গায় এখন একই আলোচনা। সরকার অনেক আগেই আসছে বছর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে ১৩তম সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। তবু, ভোট হবে কি হবে না—এই ধন্দে পুরো জাতি। এখনো আলাপটি পুরোপুরি উবে যায়নি। তবে, জুলাই সনদ, গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর উত্তপ্ত বাহাস অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে। পিআর পদ্ধতি নিয়ে এখন আর তেমন প্রেম দেখা যাচ্ছে না দাবিদারদের মধ্যে। শহরে-বন্দরে-গ্রামে-গঞ্জে চলছে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের বিপুল উৎসাহে গণসংযোগ। মনোনয়ন বঞ্চিতদের দৌড়ঝাঁপ, বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশে সরগরম হয়ে উঠেছে নির্বাচনী রাজনীতি। এসব দেখে থেমে নেই জামায়াত-এনসিপিসহ অন্যান্য দল। রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে ধর্মীয়-সামাজিক সব অনুষ্ঠানেই চলছে নির্বাচনী আলোচনা। শেষ পর্যন্ত ভোট হতেই হবে এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে জনমনে। এমনকি, সেনাবাহিনীও সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, নির্বাচনের অপেক্ষায় পুরো জাতি।
গত ফেব্রুয়ারি থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে আসছে জামায়াত। এরই মধ্যে প্রায় সব আসনেই তাদের প্রার্থীরা সবুজ সংকেত নিয়ে গণসংযোগ করছেন। কয়েকটি আসনে মতবিরোধও তৈরি হয়েছে নিজেদের মধ্যে। এর আগে যা দেখা যায়নি জামায়াতের মতো রেজিমেন্টাল দলে। জাতীয় নাগরিক পার্টি… এনসিপি বা সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতার আশায় যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে তারা। পুরোদমে নির্বাচনী কার্যক্রমে ব্যস্ত জামায়াত। কিন্তু, প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে সরব তারা। প্রয়োজনে ঘোষিত সময়ে নির্বাচন হবে না বলেও আশঙ্কা ছড়াচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জামায়াত আগে প্রার্থী ঘোষণা করলেও দেশে নির্বাচনী আবহ তৈরি হলো না কেন? জনগণের মাঝে ও গণমাধ্যমে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি জামায়াতের মনোনীত প্রার্থীরা। কেননা, জাতীয় পর্যায়ে তাদের সর্বোচ্চ ২০ জন নেতার পরিচিতি আছে। সারা দেশ বিবেচনা করলে বিভিন্ন এলাকায় সব পর্যায়ের মানুষ হয়তো ৫০ জন নেতাকে চেনে। তাদের বিভিন্ন শ্রেণির কমিটির মাধ্যমে জামায়াতের তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে প্রার্থীরা পরিচিত থাকতে পারে। কিন্তু, সাধারণ ভোটারের কাছে তারা অপরিচিত। যে কারণে আলোচনা কম। গত বছর পাঁচ আগস্টের পর সারা দেশে সংগঠন ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় জামায়াতে ইসলামী। পুরো দেশবাসীর কাছে জামায়াত এখনো একটি রহস্যময় ও বিতর্কিত দল। ‘আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই’ স্লোগান দিলেও তাদের ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে সন্দেহ রয়েছে অন্য ইসলামী দল ও আলেম-ওলামাদের। গত শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে হেফাজতে ইসলামের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী জামায়াত ছাড়া সহিহ আকিদার সব ইসলামী দলকে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জামায়াতের ইসলাম আর আমাদের ইসলাম এক নয়। আমরা মদিনার ইসলাম পালন করি তারা মওদুদীর ইসলাম পালন করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী সবসময় ইসলামের শেকড় উৎপাটনের মিশনে লিপ্ত। আমাদের কাছে ইসলাম এসেছে সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে। মওদুদীর গোটা জীবন কেটেছে সেই সাহাবায়ে কেরামকে বিতর্কিত করার কাজে।’ এ ছাড়া স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য দেশবাসীর কাছে ‘কিন্তু-যদি-হয়তো-তবে’ সহযোগে একাধিকবার ক্ষমা চেয়েও সুবিধা করতে পারেনি জামায়াত। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সমর্থন কিছুটা বাড়লেও ভোটের হিসাব নির্বাচন ছাড়া বলা মুশকিল। ফলে, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনই পারে রাজনীতিতে জামায়াতের ভবিষ্যৎ ঠিকানা রচনা করতে। ধর্মাশ্রয়ী দল থেকে উদার গণতান্ত্রিক পর্যায়ে উন্নীত হতে তাদের আরও অনেক পরীক্ষা দিতে হবে। যদিও এরই মধ্যে হিন্দু সম্মেলন, কল্যাণমূলক কর্মসূচি ও ছাত্র রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এনে আলোচনায় এসেছে তারা। তবে, অর্জনের চেয়ে প্রত্যাশার গর্জন অনেক বেশি।
এদিকে, আওয়ামী লীগের দেড় দশকের নির্বাচনী প্রহসনে অন্যতম অংশীজন ইসলামী আন্দোলন তিনশ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে অনেক আগেই। জনগণ বরাবরের মতোই তাদের নিয়ে হাস্যরস করছে। হাজার হাজার মুরিদের দানে পীর সাহেব দল চালালেও তাদের ভোট পান না কোনো সময়। বার্ষিক ওরসে কোটি কোটি টাকা উঠলেও নির্বাচনে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। নতুন দল এনসিপি হাঁটছে পুরোনো পথে। বিভিন্ন দলের পরিত্যক্ত, অভিমানী, গৃহত্যাগী নেতাদের ঢুকিয়ে তিনশ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিএনপি-জামায়াত তাদের জন্য দরজা খোলা রাখায় অনেকটা নির্ভার। সংসদে কিছু আসন তাদের নিশ্চিত থাকায় দরকষাকষিতে সুবিধা পাচ্ছে। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ খালেদা জিয়ার আসনে প্রার্থী না দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে এনসিপি ও গণঅধিকার ssপরিষদ বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। কেননা খালেদা জিয়া প্রতিকূল পরিবেশেও পাঁচ থেকে তিনটি আসনে বিজয়ী হয়েছেন। সম্প্রতি তার জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু, তার দলের কোনো কোনো নেতা এবং ভিউ ব্যবসায়ী ইউটিউবাররা ব্যাপারটা বুঝতে পারেননি। এক পরিবার থেকে একাধিক প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। তাই, তিনটি আসনে খালেদা জিয়া ও একটিতে তারেক রহমানকে মনোনীত করায় কিছু অর্বাচীন আড়েঠারে সমালোচনা করছে। বিএনপির কোনো কোনো নেতা নিজে এবং স্ত্রী-সন্তানদের জন্য মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কেউ কেউ ছেলের বউ, মেয়ের জামাইয়ের জন্যও আশা করেছিলেন। না পেয়ে তারা, মনোনয়নবঞ্চিতদের উসকে দিচ্ছেন। বিক্ষুব্ধরা রাজপথ অবরোধ করে গাড়ি পুড়িয়ে দলের বদনাম করছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মাধ্যমে তারা বিতর্কিত করেছিল বিএনপিকে। তারাই এখন দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে গিয়ে জনদুর্ভোগ তৈরি করে বেকায়দায় ফেলছে দলকে। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে বিএনপি ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু, মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
আগে আগে প্রার্থী ঘোষণার সুবিধা-অসুবিধা দুটোই আছে। ভালো-মন্দ কোনোটাই নিরবচ্ছিন্ন নয়। বরং নির্বাচন নিয়ে টালবাহানার মুখে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার সিদ্ধান্ত রাজনীতিতে দাওয়াই হিসেবে কাজ করেছে। এখন এ সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে হবে দলটিকে। মনোনয়নের দাবিতে বিশৃঙ্খলাকারীর ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে যারা জনদুর্ভোগ তৈরি করেছে, তারা জনপ্রতিনিধি হওয়ার উপযুক্ত না। শুধু ত্যাগী হলেই চলবে না। সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য দক্ষ, যোগ্যও হতে হবে। সর্বোপরি দলীয় সিদ্ধান্ত মানতে হবে। যৌক্তিক দাবি থাকলে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ হতে পারে। দলীয় কার্যালয়ে প্রতিবাদলিপি পেশ বা অনশনও হতে পারে। কেউ কেউ যেমন ধানক্ষেতে নেমে ক্রিকেটীয় ভাষায় রিভিউ আবেদন করছে। কিন্তু, নিজেকে অনিবার্য ভাবার কোনো কারণ নেই। অতীতে অনেক মহিরুহ পর্যায়ের নেতা, দলের সঙ্গে বেইমানি করায় পাতার মতো ঝরে পড়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর আত্মবিশ্বাস অহমিকার পর্যায়ে চলে গেছে। তারা মনে করছে, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে কলাগাছ দাঁড়ালেও বিজয় নিশ্চিত। আওয়ামী লীগ নেই বলে ওয়াকওভার পাওয়া যাবে—কথাটা ঠিক নয়। এক আওয়ামী লীগ লোকান্তরে, লক্ষ আওয়ামী লীগ বিভিন্ন দলের ঘরে ঘরে। কয়েকটি আসন নিয়ে ব্যাকবেঞ্চে বসা দলটিও ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পোড়খাওয়া নির্বাসিত রাজনীতিবিদ তারেক রহমান বারবার সতর্ক করছেন—এবারের নির্বাচন কঠিন হবে। অথচ, তার দলের কতিপর নেতাকর্মী বিষয়টি আমলেই নিচ্ছেন না। বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও কতদিন টিকবে, তা নিয়ে সংশয় আছে—পর্দার আড়ালে এমন কথাও হচ্ছে। ধানের শীষের মৌ-মৌ গন্ধে শুধু ভোটার নয়, কীটপতঙ্গও হামলে পড়ছে। এরই মধ্যে চিহ্নিত ইউটিউবার ও তার মুরিদরা মাজরা পোকার মতো আক্রমণ করছে। মনোনয়ন চাননি এরকম বর্ষীয়ান, সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতাদের বঞ্চিত দাবি করে মায়াকান্না করছে বিএনপিবিরোধী বিভিন্ন বট বাহিনী। বুঝে না বুঝে সে ফাঁদে পা দিচ্ছে ধানের শীষের অনেক সহজ-সরল সমর্থক। সচেতন নেতাকর্মীদের দায়িত্ব হলো, যে কোনো মূল্যে ঐক্য ধরে রাখা। অন্য যে কোনো দলের চেয়ে বিএনপিতে প্রার্থী জট বেশি। প্রতিটি আসনে অন্তত পাঁচজন যোগ্য প্রার্থী রয়েছে। দেড় দশকের জট তো এক নির্বাচনে খুলবে না। বিচক্ষণ না হলে বিলক্ষণ দুর্গতি আছে বিএনপির কপালে।
লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি