

জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম নির্মাতা মেজর এম এ গণিকে স্মরণ করার পর্বটি সত্যি বুক ভরা অহংকারের। ক্ষণজন্মা এই মানুষটি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট তথা বাংলাদেশ পদাতিক বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা। আজ তার মৃত্যু দিবস; ১৯৫৭ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাকে স্মরণের মধ্য দিয়ে আমরা বহুদূর সময়ের ভেতরে চলে যেতে চাই; যেখানে প্রথম প্রত্যক্ষে একটি সত্য ধ্রুবকের মতো আসে, তা হলো বাংলাদেশের মানুষ শুধু স্বাধীনতা প্রিয়, রাজনৈতিক সচেতন বা অধিকার উন্মুখ একটি জাতিই নয়, তারা লড়াকু, যোদ্ধা জাতি বা মার্শাল রেস। আর এ জাতির সমর সত্তার বিকাশের অন্যতম অগ্রদূত মেজর এম এ গণি। আজ কুমিল্লা ময়নামতি সেনানিবাসে তার সমাধিসৌধে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জানানো হবে। ১২ নভেম্বর রাওয়া ক্লাব আয়োজন করেছে এক স্মরণসভার।
১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সূচনা করেছিল ব্রিটিশ বাহিনীর বেঙ্গল ল্যান্সার্স ইউনিটের বাঙালি মুসলমান সৈন্যরা। হানাদার ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে ফকির বিদ্রোহসহ নানা সশস্ত্র আন্দোলনে ব্যাপ্ত ছিল বাঙালি মুসলমানরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব পার থেকে বার্মার আকিয়াব পর্যন্ত পাইওনিয়ার কোরের সৈন্যরা অমিত সাহসে লড়েছিল জাপানিদের বিরুদ্ধে। এই কোরের অন্যতম অফিসার ক্যাপ্টেন গণি যখন বিজয়ীর বেশে ভারতে ফিরলেন তখন থেকেই বাঙালি সৈন্যদের নিয়ে পৃথক সেনাদল গঠনে তিনি ব্রতী হলেন। ব্রিটিশ সেনা কর্তৃপক্ষও এই সৈন্যদের বীরত্বে মুগ্ধ। এ সময় নেতাজি সুভাষ বসুর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মিও যুদ্ধবন্দি অবস্থায় ভারতে ফিরে আসে। কিন্তু ভারতীয় জনগণের চাপে ব্রিটিশরা তাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারে সাহস পায়নি। বরং সুভাষ বসু ভারতে জাতীয় বীর হিসেবে আদৃত হলেন। তবে ব্রিটিশরা ভারতীয় বাঙালিদের নিয়ে আলাদা সেনাদল গঠনে চিন্তা করেনি, যা এখনো ভারতের অবাঙালি রাজনৈতিক এস্টাবিশমেন্ট অনুসরণ করে চলেছে। ওই সময় পূর্ব বাংলার মুসলমানরা মুসলিম লীগ গঠন করে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র ঘোষণার আন্দোলনে নামে। বাঙালি মুসলমানদের পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, কিন্তু আলাদা সেনাবাহিনী কোথায়? ভবিষ্যৎদর্শী মেজর গনি তখন স্বতন্ত্র সেনাবাহিনী গঠনের কাজে নেমে পড়েছেন। ব্রিটিশ সেনা কর্তৃপক্ষ এবং তদানীন্তন পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তিনি বোঝাতে সক্ষম হলেন। ১৯৪৮ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি কুর্মিটোলায় প্রতিষ্ঠিত হল ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’। আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ ৪৭-এর আগে থেকেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন করছিলেন। কেননা লাহোর প্রস্তাবের মর্ম অনুযায়ী বাংলাদেশ হবে আলাদা রাষ্ট্র। কিন্তু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সে প্রস্তাব মানলেন না। পাকিস্তান হলো দুটি ইউনিটে—পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান; কিন্তু ভাষা আন্দোলন থেমে রইল না। কুর্মিটোলার ওই অনুষ্ঠানে পূর্ব পাকিস্তানের তদানীন্তন জিওসি ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান বলেছিলেন, বাঙালি সৈন্যদের উর্দুতে কথা বলতে হবে। তখন মেজর গণিসহ বাঙালি অফিসাররা সোজাসুজি প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, পাঞ্জাবি সৈন্যরা যদি পাঞ্জাবি ভাষায় কথা বলতে পারে, তাহলে বাঙালি সৈন্যরা কেন বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারবে না? ভাষার জন্য এই আন্দোলন কি জাতীয় ইতিহাসের অংশ নয়?
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের গঠন ও বিকাশে মেজর গণির অবদানে অবাঙালি সেনা কর্তৃপক্ষ বেজায় নাখোশ ছিলেন। তারা প্রশাসনিক হয়রানির মাধ্যমে মেজর গণির পদোন্নতি আটকানো, অগুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে রাখলেন। এ মানুষটি কি এসবের জুলুমের বরং প্রতিবাদ করেছেন? তিনি দেখেছেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অমিত সম্ভাবনা, ভবিষ্যতের স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে। কোনো বিদ্রোহ নয়, সেনাবাহিনীর ভেতরে কোনো হাঙ্গামা নয়। বরং স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে তিনি অবসরে গিয়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বর্তমানের কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মপাড়া) থেকে বিপুল ভোটে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীকে হারিয়ে নির্বাচিত হন। আমাদের প্রশ্ন জাগে, চির বিদ্রোহী বাঙালির প্রতিনিধি নীরবে পাকিস্তানিদের জুলুম সয়ে গেলেন কেন? আমার বিশ্বাস, ধর্মপ্রাণ এই মানুষটি মধ্যপন্থি ছিলেন। নবীজী বলতেন, তোমরা সর্বাবস্থায় মধ্যপন্থা অবলম্বন কর। তোমরা যদি আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে কাছের বন্ধু এবং সৃষ্টিকুলের মধ্যে আদম সন্তানদের জন্য আলোকবর্তিকা হতে চাও, তাহলে যারা তোমাদের ওপর জুলুম করে তাদের ক্ষমা করে দাও। গণি যে স্বপ্ন দেখেছেন, তার উত্তরসূরিরা তার বাস্তবায়ন করেছেন। ৬৫ সালের যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা অভূতপূর্ব সমর দক্ষতায় ভারতীয় বাহিনীকে রুখে দিয়েছিল। একাত্তরে স্বাধীনতার লগ্নে রাজনীতিকদের দ্বিধাগ্রস্ততায়, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অকুতোভয় নক্ষত্র মেজর জিয়া। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট নেতৃত্ব দিয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধের।
এ জন্যই আমাদের সেনাবাহিনী ভারতীয় বা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মতো নয়। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ সেনাবাহিনী গড়ে উঠেছে সত্য। কিন্তু এর জন্ম, বিকাশ সেই বহুদূর সময়ের ভেতর থেকে, বাঙালি যোদ্ধাদের মরণপণ অবদান থেকে। আর গণির ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট হচ্ছে লড়াকু বাঙালির প্রথম মুক্তি মঞ্চ।
লেখক: জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি