

রাজধানীর বেড়িবাঁধ এলাকায় বাসে আগুন দিয়ে পালাতে গিয়ে তুরাগ নদে পড়ে জীবন গেছে সাইফ নামের এক কলেজছাত্রের। জাতীয় ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন ফুটপাত থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ড্রামভর্তি খণ্ডিত মরদেহ। আরেক বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে বাসায় ঢুকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে বিচারক আবদুর রহমানের ছেলে তাওসিফ রহমান সুমনকে। বারে বৃহস্পতি হলেও তারিখে ১৩ নভেম্বরের স্থানিক সংবাদ এগুলো। জাতীয় পর্যায়ে এদিনটি কেটেছে ঘটনার নানা ঘনঘটায়। রাশিচক্রে বৃহস্পতিকে তুঙ্গে মনে করা হয়। আর সংখ্যাচক্রে ১৩কে বলা হয় আনলাকি থার্টিন।
এদিন বা তারিখটিতে জানানো হয়েছে, ১৭ নভেম্বর দেওয়া হবে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের জুলাই আন্দোলনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারের রায়। দিনটিতে সাব্যস্ত হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার রায়ের তারিখ। তারিখটি ঘনিয়ে আসায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দুষ্টুবুদ্ধিতে অনলাইনে ঘোষণা দিয়েছে, ১৩ নভেম্বর ঢাকা ‘লকডাউন’ করার। দিনটি সামনে রেখে তাদের গুপ্ত আয়োজন আর গুপ্ত থাকেনি। যে কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেদের সক্ষমতা ও পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছে। নিশ্চয়ই নিজেদের মতো বুঝেছেও। হতে পারে সামনে বড় কোনো কর্মসূচির রিহার্সালও। গেল বছর ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুতির পর দলীয় অন্তঃপ্রাণদের অনিরাপদে ফেলে রেখে আওয়ামী লীগের দুষ্ট তথা দুষ্কর্মে লিপ্ত শীর্ষ নেতৃত্বের বিরাট অংশই পলাতক। কিছু সংখ্যকের ঠাঁই কারাগারে। বিদেশে আয়েশে থাকা পলাতকদের কেউ কেউ মাঝেমধ্যেই অডিও-ভিডিওতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেংচি কাটছেন। এর জেরে ছোটখাটো কিছু ঝটিকা মিছিল হয়। সামনে শনি কেটে বৃহস্পতির হাইপও ওঠে। তা প্রকারান্তরে দলের আবেগী এবং সরলপ্রাণদের রাস্তায় নামিয়ে এনে মার খাওয়ানো।
এই বৃহস্পতিতে ঘোষিত লকডাউনে এসে লকআপে ঢুকতে হয়েছে অনেককে। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে। এর আগে চলো চলো জিরো পয়েন্টে চলো, আসো আসো বত্রিশে আসো—আওয়াজে দুবার প্যানিক তোলার চেষ্টা শুধু ব্যর্থ হয়নি, আবেগী কর্মীদের ডেকে এনে মার খাওয়ানো হয়েছে। এবার হলো আরেক দফায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, বিক্ষুব্ধরা শুধু হামলাই করেনি, কার্যালয়ের দেয়ালে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের খোদাই করা গ্রাফিতি ভেঙেছে। গত বছর ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতন হলে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ভবনটি কিছুদিন পরিত্যক্ত থাকার পর সেখানে ‘আন্তর্জাতিক ফ্যাসিজম ও গণহত্যা গবেষণা ইনস্টিটিউট’ স্থাপন করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিরা।
মাত্রাগতভাবে বৃহস্পতির আরও বড় ঘটনা জুলাই সনদ, নির্বাচন, গণভোট মেলানো বিষয়াদিতে জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ। এবারের ভাষণটি আকার-আয়তনে ছোট। গুরুত্বে বিশাল। ভাষণে পরিষ্কার জানানো হয়েছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই হবে গণভোট। চারটি বিষয়ে একটি প্রশ্নে হবে এ গণভোট। গণভোটে পাস হলে আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। আর সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। ভাষণে জাতীয় নির্বাচন, গণভোটসহ অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরার আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ বৈঠকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুমোদন করা হয়।
প্রধান উপদেষ্টা ভাষণে জানিয়েছেন, গত বছর আগস্ট মাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শক্তিবলে তারা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছিলেন। তারা এখন সরকারের মেয়াদে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছেন। সরকারের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব ছিল মূলত তিনটি। হত্যাকাণ্ডের বিচার করা, একটি জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের আয়োজন করা এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্দেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এ বিচারের উদ্দেশ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাদের প্রথম রায় শিগগির দিতে যাচ্ছেন। ট্রাইব্যুনালে আরও কয়েকটি মামলার বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণ ফৌজদারি আদালতগুলোতেও জুলাই হত্যাকাণ্ড-সম্পর্কিত কিছু বিচারকাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গুমের মতো নৃশংস অপরাধের বিচারকাজ শুরু করেছে। ড. ইউনূস বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার নিজ উদ্যোগে বা বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করেছে। কিছু প্রস্তাবিত সংস্কারের কাজ এখনো চলমান। অধ্যাদেশের মাধ্যমে বা বিদ্যমান আইন সংশোধন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচার ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটালাইজেশন সম্প্রসারণ ও দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন সংস্কার সম্পন্ন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে সুশাসনের জন্য এসব সংস্কার বড় ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করেন। আগামী নির্বাচিত সরকার সংসদে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এসব সংস্কার গ্রহণ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ক. খ. গ. ঘ দিয়ে তা পরিষ্কার করার চেষ্টা হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে।
যেমন—ক. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। খ. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। গ. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনায় বলা হয়ে থাকে, প্রধান উপদেষ্টা এবং তার সহকর্মী-সহযোগীদের বেশিরভাগই অ্যাকাডেমিশিয়ান। তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু গত সোয়া এক বছরের নানান পদক্ষেপ এবং সর্বশেষ ১৩তে ভাষণসহ কিছু সিদ্ধান্তের যে ম্যাজিক দেখানো হয়েছে, তা কার জন্য আনলাকির হবে, কার বৃহস্পতি তুঙ্গে উঠবে—এ নিয়ে রীতিমতো একটা ঘোর তৈরি হয়েছে। খেই হারা করে দিয়েছে রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে। উইন উইন ভাব আছে। আবার একই সঙ্গে লস-লুজারের হিসাবও রয়েছে। যে কারণে দিনে এর সমালোচনা করে রাতে প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানাতে হয়েছে বিএনপিকে। আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করায় এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বিএনপি।
এর আগে, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস নিজের সই করা জুলাই জাতীয় সনদ লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, গত ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় যে জুলাই জাতীয় সনদ প্রধান উপদেষ্টা নিজে স্বাক্ষর করেছেন, সেটা তিনি লঙ্ঘন করেছেন তার ভাষণের মাধ্যমে। বিএনপির রাতের প্রতিক্রিয়ায় আর এ লাইনে যাওয়া হয়নি। এ নিয়ে একটা ভাবের মধ্যে আছে জামায়াতে ইসলামী। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে জামায়াতসহ আটদলীয় মোর্চা। সমান্তরালে জুলাই জাতীয় সনদ জারির জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা আট দল। তবে কিছুটা নোট অব ডিসেন্টের মতো সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে করার সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে। ৫ আগস্টের ফ্রন্টলাইনার বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের আলোচিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির ভূমিকা এ ক্ষেত্রে রহস্যজনক। তাদের ব্যতিব্যস্ততা অন্যদিকে। এর আগে, জুলাই সনদে সই না করে আরেক নাটকীয়তা করেছে তারা। আরেক নাটকীয়তা দেখাল বৃহস্পতিতে। দিনটিতেই আরেক ঘটনা অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজকে পালানোর বদনাম থেকে উদ্ধার করা। তাকে করা হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী। তিনি ছিলেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি। আর সভাপতি স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দৃশ্যত যাবতীয় কাজ সহসভাপতি আলী রীয়াজই করেছেন।
এ কাজ করতে গিয়ে শুধু সমালোচনা নয়, অকথ্য নানা কথাও শুনতে হয়েছে তাকে। সব সয়েছেন, হজম করেছেন। আক্রমণের জবাব না দিয়ে শুধু অর্পিত দায়িত্বে থেকেছেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ শেষ মানে তার পর্বও শেষ মনে করে সমালোচনা, অভিযোগের ঢোলে আরও বাড়ি পড়তে থাকে। তিনি দেশ ছেড়ে ভেগেছেন—এ রবও তোলা হয়। আনলাকি থার্টিনে এসে তারও আবার বৃহস্পতি। উপদেষ্টার পদমর্যাদা, বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা। তারিখে আনলাকি ১৩, বারে বৃহস্পতিতেই প্রজ্ঞাপন জারি। ‘আনলাকি থার্টিন’ বলতে ১৩ সংখ্যাটিকে দুর্ভাগ্যজনক বা অশুভ বলে মনে করাকে বোঝায়। ১৩ সংখ্যাটিকে দুর্ভাগ্যজনক মনে করার ধারণা আধুনিক বিশ্বের অনেক দেশের সংস্কৃতিতে এখনো প্রচলিত। ১৩ সংখ্যা বা তারিখটিকে অপয়া ভাবার দৃষ্টান্ত রয়েছে দেশে দেশে। কয়েকটি দেশে তো অনেক বড় হোটেল বা ভবনে ১৩ তলা থাকে না। ১৩ সংখ্যাকে ভয় পাওয়ার এ মানসিক অবস্থাকে ‘ট্রাইস্কাইডেকাফোবিয়া’ বলা হয়, যা এসেছে গ্রিক শব্দ থেকে। এর পেছনের কারণ হিসেবে মূলত খ্রিষ্টধর্মের শেষ নৈশভোজের ঘটনাকে উল্লেখ করা হয়, যেখানে যিশুর সঙ্গে ১৩ জন অতিথি ছিল এবং তাদের মধ্যে ১৩তম অতিথি জুডাস ছিলেন, যিনি পরে যিশুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। এ ছাড়া, নর্স পুরাণে দেবতা লোকিকেও ১৩তম অতিথি হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যিনি ভালহাল্লার এক ভোজসভায় এসে গণ্ডগোল পাকিয়েছিলেন। দৃশ্যত বাংলাদেশে শনি বা আনলাকির সেই নমুনা না থাকলেও, উৎসগতভাবে ফ্যাসিজম ক্ষমতাচ্যুত হলেও হারিয়ে যায়নি।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন