

যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র ছাড়া সৈন্য যেমন গুরুত্বহীন, ক্লাসরুমে প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষকও তেমনই। এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত ৪২ হাজার শিক্ষককে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই ক্লাসরুমে পাঠানোর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার মধ্যে সাধারণ মাদ্রাসা ও কারিগরি এবং ইংরেজি মাধ্যমের প্রায় ৯০ ভাগ শিক্ষার্থীর লেখা-পড়ানোর দায়িত্ব পালন করছেন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। যাদের সংখ্যা এই মুহূর্তে ছয় লক্ষাধিক। এর মধ্যে মাউশির অধীনে ৩ লাখ ৯৮ হাজার, মাদ্রাসার অধীনে ২ লাখ এবং কারিগরি শাখায় ২৩ হাজারের মতো। এ বছর এনটিআরসিএর মাধ্যমে ৪২ হাজার শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা এমপিওভুক্ত হলে এ সংখ্যাটা আরও বেড়ে যাবে। তাদের বেতন-ভাতা মাসিক ১২ হাজার ৫০০, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ এবং বাড়ি ভাড়া আপাতত ১০০০ টাকা। সম্প্রতি ঘোষণা হওয়া ৭.৫ শতাংশ কার্যকর হলে সর্বনিম্ন ২০০০ টাকা এবং জুলাই-২০২৭ থেকে ১৫ শতাংশ হবে। এই শিক্ষকরা ২০১৫ সালের আগে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন, ২০১৫ সালের পর এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিবাচিত হয়েছেন। আগের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনীতিকদের দ্বারা গঠিত কমিটির বিরুদ্ধে উৎকোচের মাধ্যমে, তুলনামূলক কম মেধার লোক শিক্ষকতায় নিয়োগের অভিযোগ ছিল। প্রতিষ্ঠান প্রধান, সহকারী প্রধানসহ অফিসিয়াল পদে নিয়োগের ক্ষমতা কমিটির হাতে থাকায়, প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা প্রশাসনে কিছু জটিলতার সৃষ্টি হলে, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক সংগঠনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সব পদে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের লক্ষ্যে প্রশাসনিক সব পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ করা হয়েছে। নিয়োগ নীতিমালা চূড়ান্ত হলে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ শুরু হবে। মানুষের নৈতিকতা, সততা, দেশপ্রেম আজ তলানিতে। শিশু-কিশোর, তরুণদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা, কিশোর গ্যাং আর মাদকের বিস্তার মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত করছে না, শারীরিকভাবেও দুর্বল করে দিচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জনশক্তির সামগ্রিক চাহিদা, বিশ্বায়নের অসম প্রতিযোগিতা আর প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে যোগসূত্র সৃষ্টি করতে না পারলে জাতির জন্য ভালো কিছু আশা করার নেই। এমন বাস্তবতায় দক্ষ, কর্মঠ, সৎ ও দেশপ্রেমিক মানুষ সৃষ্টিতে শিক্ষার ভূমিকা নতুনভাবে মূল্যায়ন ও গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি। এ দাবি বাস্তবায়নে দেশের নীতিনির্ধারক, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং শিক্ষাবিদদের আন্তরিকতা আর সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসা দরকার। দরকার শিক্ষার দর্শন, অর্থায়ন এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিপরীতে ভাববাদী শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে বেকারত্বের লাইন বড় করা তৌহিদী জনতার ব্যানারে মব সৃষ্টির সংস্কৃতি দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে এবং করবে। প্রথম শ্রেণি-মাস্টার্স পর্যন্ত ১৬ বছর ধরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরও যদি নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সততা আর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ একটি জেনারেশন তৈরি করা না যায়, এর জন্যও জবাবদিহি থাকার দরকার। এ জবাবদিহির জন্য পিতা-মাতা, আত্মীয়-পরিজন, কমিউনিটির লোকজন ও শিক্ষক সমাজ দায় এড়াতে পারে না। কারণ তাদের পেছনে জনগণের টাকা ব্যয় করতে হয়।
বেতন-ভাতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় অধিকতর মেধাবীরা এ পেশায় আসতে চান না। আবার যারাও আসেন, পদোন্নতির সময়ভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে পদোন্নতির বিধান কার্যকর থাকা এবং পুরো চাকরি জীবনে দুটির বেশি পদোন্নতি না থাকায় শেষ পর্যন্ত তাদের এ পেশায় ধরে রাখা যায় না।
আর্থিক বঞ্চনার পরও সামাজিক মর্যাদার অবস্থানটি থাকলে তাতে এ পেশায় রাখা সম্ভব ছিল, কিন্তু সেটিও নেই। একসময় ছিল গ্রামীণ জনপদে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে পরিবারের লোকজন বলত—দেখতে হবে ঘর, নয়তো বর। সমস্যার আসল কারণ বের না করে দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলে থাকেন—শিক্ষকতা চাকরি নয়, এটা একটা তপস্যা। এজন্য তো সেই সমাজ থাকতে হবে, যে সমাজে জ্ঞানের কদর হয়, যেখানে চিত্রহীন বিত্তের দাপট, সেখানে টাকা ছাড়া কাজ পাওয়া যায় না। ভোগবাদী ও পুঁজিবাদী সমাজ মানুষের মনোজগতে যে ন্যারেটিভ তৈরি করেছে, সেটা রেখে তপস্যা কঠিন। তারপরও যারা শিক্ষকতা পেশায় আছেন বা আসছেন, তাদের চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করতে হবে, জীবিত থেকে জীবনের ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ, তাদের হাত দিয়ে বের হচ্ছে অসংখ্য আগামীর ভবিষ্যৎ। সেইসঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের হেনস্তা এবং জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছিল, সে সমস্যার এখন পুরোপুরি সমাধান হয়নি। বিপথগামী পেশিশক্তিদের একজনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে এটি সাংবিধানিক অধিকারও বটে। তবে দেশে সবার জন্য খাদ্য-বস্ত্র-শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও বাসস্থান জনগণের জন্য মৌলিক অধিকার নয়। এগুলো নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় মৌলিক দায়িত্ব। শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে আরও কিছু করার আছে। সেটা করতে হবে। তবে বিদ্যমান অবস্থায় যার যেটুকু দায়িত্ব আছে, সেটি করা জরুরি। কারিকুলাম সিলেবাস, পাঠদান কার্যক্রমটায় শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, সেটা করতে হবে। নতুন করে যারা শিক্ষকতায় আসছেন, তাদের কাজের প্রতি আগ্রহী ও আন্তরিক করে গড়ে তোলার কাজটিও করতে হবে। ভালো শিক্ষকরা আগে পড়বেন, তারপর পড়াবেন। তিনি একই সঙ্গে ছাত্র, তারপর শিক্ষক এবং মেন্টর। পড়াবেন এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখাবেন। সেজন্য বলা হয়, তিনিই ভালো শিক্ষক; যিনি পড়াবেন, দেখাবেন এবং নিজে তার সঙ্গে কাজ করবেন। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক হবে বন্ধুর মতো। ক্লাসগুলো হবে প্রাণবন্ত, পাঠদান হবে কর্মশালার মতো। ভয় ও শঙ্কামুক্ত পরিবেশে যেন ছেলেমেয়েরা শেখে। শ্রেণি ব্যবস্থাপনা প্যাডাগজি সম্পর্কে ভালো ধারণা, শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা অনুযায়ী শেখানো ভালো, তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং ভালো শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ নজর রাখা, মনিটরিং, মূল্যায়ন এবং পরবর্তী নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। এগুলো করতে তাকে পড়তে হয়, শিখতে হয়, প্রশিক্ষণ নিতে হয়।
৪২ হাজার শিক্ষককে নিয়োগ দিয়েই ক্লাসরুমে পাঠিয়ে দেওয়া হলো, কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই। পুলিশের কনস্টেবল, এএসপি, প্রশাসন ক্যাডারের লোকজনকে প্রশিক্ষণ ছাড়া কর্মে না পাঠালেও শিক্ষকদের পাঠানো হলো। শিক্ষার গুণগতমানের জন্য এটি ইতিবাচক নয়। শিক্ষার মানে অনুসরণীয় পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে শিক্ষা বিষয়ে পাস করা লোক ছাড়া শিক্ষতায় আবেদনই রাখতে পারে না।
দেশেও প্রাইমারি স্কুলে সিএনএড, মাধ্যমিক শিক্ষায় বিএড, সরকারি কলেজ শিক্ষকদের জন্য বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের পর পেশার কাজে পাঠালেও বেসরকারি শিক্ষার ক্ষেত্রে এমন সুযোগ নেই। অথচ এখানেই অধ্যয়ন করে ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী। এ বিষয়ে কমিউনিটি, স্থানীয় সরকার এবং সমাজের বিত্তবানদের ভূমিকা রাখা দরকার। তবে বেসরকারি শিক্ষায় নানান সীমাবদ্ধতা জেনেই যারা এ পেশায় এসেছেন এবং থাকতে চান, তাদের পেশার উৎকর্ষতা সাধন এবং কাজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। সেজন্য তাদের পেশাদারিত্বের প্রস্তুতির কাজটা শেষ করতে হবে। একজন রাজমিস্ত্রির যেমন কন্যে-কড়াই, কাঠমিস্ত্রির জন্য হাতুড়ি-বাঁটাল, ক্ষেতমজুরের জন্য কাস্তে মাথাল লাগে, সেরূপ শিক্ষকতার জন্য তার কিছু জিনিস থাকতে হয় এবং তার ব্যবহার করা শিখতে হয়। পড়াশোনা, লেখালেখি, গবেষণা, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করতে হয়। এটা শারীরিক শ্রমের কোনো কাজ নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক শ্রমের কাজ। প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত শ্রমের বাইরেও তাকে কাজ করতে হয়, সেজন্য তাদের আর্থিক বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হয়। এ দেশের জন্য এটা ভাবাই যেন কল্পনা। মূল্যবোধ অবক্ষয়ের এ সমাজে দায়িত্বজ্ঞানহীন নানা উক্তির মধ্যে এ কথাটিও উচ্চারিত হচ্ছে আগে—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘরগুলো ছিল কাঁচা আর শিক্ষকরা ছিলেন পাকা আর বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ঘরগুলো হয়েছে পাকা আর শিক্ষকরা হয়েছেন কাঁচা। বিষয়টি শিক্ষক সমাজের আত্মমর্যাদার, সেজন্য পেশার দায়িত্ব যেমন যথাযথভাবে পালন করতে হবে; তেমনি নিজেদেরও আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা এবং বৃদ্ধির জন্যও কাজ করতে হবে।
লেখক: অধ্যক্ষ এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি