

চব্বিশের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা মামলার বহুল আলোচিত বিচারের রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। দুটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একটি অভিযোগে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হওয়ায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। দেশের ইতিহাসে সংঘটিত নজিরবিহীন এ অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ঘটা অপরাধের কোনো মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এটি প্রথম রায়।
গতকাল সোমবার ছয়টি অধ্যায়ে ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায় আদালতে পড়া শেষ হয় প্রায় আড়াই ঘণ্টায়। শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয় পাঁচটি। এগুলোর মধ্যে এক নম্বর অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি প্রমাণিত হওয়ায় তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। তবে দ্বিতীয় অভিযোগসহ তিনটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এদিন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বাংলাদেশে থাকা যাবতীয় সম্পদ জব্দ করার নির্দেশ দেন আদালত। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনে ‘শহীদ ও আহতদের ক্ষতিপূরণ’ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছেন, শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ তিনটি কাউন্টে ভাগ করে সাজা প্রদান করা হয়েছে। গঠন করা প্রথম অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্য; দ্বিতীয় অভিযোগ, শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করে নির্মূলের নির্দেশ’ দেন; তিন. ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাইদ হত্যা; চার. ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যা; পাঁচ. আশুলিয়ায় হত্যা ও জীবিত একজনসহ ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা।
রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জুলাই শহীদ পরিবার, একাধিক রাজনৈতিক দল, ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর, অ্যাটর্নি জেনারেলসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সন্তোষ প্রকাশ করেন। শহীদ পরিবারগুলো এর দ্রুত বাস্তবায়ন চায়। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমি মনে করি এ রায় কোনো ধরনের অতীতের প্রতিশোধ নয়। এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতির প্রতিজ্ঞা।’ অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘রাষ্ট্র ন্যায়বিচার পেয়েছে। প্রসিকিউশন পক্ষ ন্যায়বিচার পেয়েছে।’ এটিকে ন্যায় প্রতিষ্ঠার শ্রেষ্ঠ ঘটনা বলে অবহিত করেন এবং শেখ হাসিনাকে ফেরাতে আবারও উদ্যোগের কথা জানান আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়, তারা যেন অনতিবিলম্বে দণ্ডপ্রাপ্ত এ দুজনকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই বিচার, এই রায় সামনের দিনের জন্য একটা উদাহরণ। একইভাবে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে জামায়াত, এনসিপি। তবে রায় প্রত্যাখ্যান করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ।
রায় ঘিরে যেন কোনোরকমের সহিংস বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, এজন্য আগের দিন থেকেই পর্যাপ্ত প্রশাসনিক তৎপরতা ছিল। এদিন রাজধানীর সড়কে প্রতিদিনের মতো বেশি যানবাহন ছিল না। রাস্তায় মানুষের সংখ্যাও ছিল তুলনামূলক কম। কয়েক জায়গায় কিছুটা উত্তেজনার সৃষ্টি হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে নেয়। এ ছাড়া রায় ঘিরে যে কোনো বিশৃঙ্খলা কঠোরভাবে দমনের কথা জানায় অন্তর্বর্তী সরকার। আমাদের প্রত্যাশা, এ নিয়ে কোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না।