মো. শামীম মিয়া
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:১২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চারদিক

রায় বাংলায় নয় কেন

রায় বাংলায় নয় কেন

বাংলাদেশ নামটি এসেছে ভাষার সংগ্রাম থেকে আর সেই সংগ্রামের মূল প্রেরণা ছিল মানুষের নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে যে তরুণরা রক্তাক্ত হন, তাদের বুকে ছিল বাংলা ভাষার প্রতি অসীম ভালোবাসা আর সেই ভালোবাসাই পরবর্তীকালে স্বাধীনতার পথকে প্রশস্ত করে। কিন্তু আজ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও রাষ্ট্রচর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান আদালতের রায় মাতৃভাষায় লেখা হয় না। উচ্চ আদালত, আপিল বিভাগ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ সব গুরুত্বপূর্ণ রায় এখনো আবদ্ধ ইংরেজি ভাষার বাঁধনে।

প্রশ্ন উঠতে বাধ্য, দেশে বাংলা ভাষার সম্মান কোথায়? মানুষের ভাষা কি কেবল আনুষ্ঠানিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নথি বাংলায় হওয়া উচিত যেন জনগণ বুঝতে পারে, বিচার-প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে এবং রায়ের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারে?

জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে হওয়া ঐতিহাসিক রায় প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজিতে। রায়ের দিন আদালত কক্ষ ভরা, বাইরে প্রচুর মানুষ অপেক্ষায়। সবাই শুনবে বলে এসেছে, বুঝবে বলে এসেছে, জানবে বলে এসেছে, আবার লাখও মানুষ টেলিভিশনের সামনে; কিন্তু যখন বিচারক ধারাবাহিকভাবে ইংরেজিতে রায় পড়তে থাকলেন, তখন মানুষ হতাশ হলেন।

এতে কি ভাষাকে ছোট করা হয় না? এটি কি নাগরিকের অধিকার হরণের শামিল নয়? একজন মানুষ যদি নিজের দেশের রায় বুঝতেই না পারে, তাহলে সেই দেশে ন্যায়বিচার কীভাবে প্রতিষ্ঠা পাবে?

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো, সংবিধান বাংলায়, জাতীয় শপথ বাংলায়, আইন প্রণয়ন বাংলায়, সরকারি দপ্তর বাংলায়, কিন্তু উচ্চ আদালতে ঢুকলেই সব ইংরেজি। যেন এটি আরেক পৃথিবী। বিচারক, আইনজীবী, নথি, রেফারেন্স—সবই ইংরেজি। আদালতের ভেতরে দাঁড়ালে মনে হয় যেন এখনো ব্রিটিশ শাসন চলছে। অথচ ১৯৭২ সালের সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, রাষ্ট্রের সব কাজ, সিদ্ধান্ত, নথিপত্র বাংলায় হবে। ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন পাস করে সংসদ, যেখানে বলা আছে, বাংলাদেশের সব আদালতে, সব দপ্তরে এবং সব রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উচ্চ আদালত এখনো ইংরেজির ওপর নির্ভর করে আছে, উচ্চ আদালতের রায় বাংলায় লেখা হয় না, মামলা-মোকদ্দমার মূল নথি ও আদেশ ইংরেজিতে লেখা হয় এবং বাংলা ভাষা কেবল নিম্ন আদালতে সীমাবদ্ধ। কেন এই বৈষম্য?

বাংলা ভাষাকে ছোট করা হচ্ছে বলে মানুষের যে হতাশা, সেটি একেবারেই যৌক্তিক। রাষ্ট্রভাষা শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি জাতীয় পরিচয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। একটি রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় তার ভাষার মধ্যেই নিহিত। আর বিচারব্যবস্থা রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এ দুটি স্তম্ভ যদি আলাদা পথে হাঁটে রাষ্ট্রভাষা একদিকে, আদালতের ভাষা অন্যদিকে, তাহলে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে। মানুষ মনে করে, বিচারব্যবস্থা তাদের নয়, অন্য কারও জন্য। নিজেকে বাদ পড়া মনে হলে মানুষ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক হারায়। আর রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই আসে, যখন মানুষ বিশ্বাস হারায়।

এখন প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট, দৃঢ়, আইনগত ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত; যেন উচ্চ আদালতের রায় বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক হয়। শুধুই বাধ্যতামূলক নয়, বাস্তবায়ন করতে হবে। সময় এসেছে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার। বাংলায় রায় হোক। বাংলাকে সম্মান করা হোক।

মো. শামীম মিয়া, শিক্ষার্থী

ফুলছড়ি সরকারি কলেজ, গাইবান্ধা

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

একনেকে ৩৮৯১ কোটি টাকার ১০ প্রকল্প অনুমোদন, আটকে গেল খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্প

১০ লিটার দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনা সমর্থকের ব্রাজিলে যোগদান

ডাকাতি করতে গিয়ে মা-মেয়েকে সঙ্ঘবদ্ধ ‘ধর্ষণ’

বছরে কতবার পরিষ্কার করা হয় মসজিদে নববী?

আত্মসমর্পণের পর পাঁচ আ.লীগ নেতা কারাগারে

সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে রোহিঙ্গা নিহত

একনেকে ১০ প্রকল্প অনুমোদন

কিউবায় ১৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প

পরম আমাকে বিয়ে করেনি বলে তাদের ভীষণ দুঃখ: রাইমা

চুক্তি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ শুরু

১০

আ.লীগ নেতা রানা গ্রেপ্তার

১১

দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলা, বহু হতাহত

১২

পাবনায় ধর্ষণ-হত্যার জেরে আসামিদের বাড়িতে আগুন, নিহত ৩

১৩

নতুন কিছু করার অঙ্গীকার শি-কিমের

১৪

চার বছর পর ফিরেই মোসাদ্দেকের ফিফটি

১৫

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুর মাকে ধর্ষণের অভিযোগ

১৬

যৌন অসদাচরণের অভিযোগে আইসিসি প্রসিকিউটর করিম খান সাময়িক বরখাস্ত

১৭

রাশিয়ার শ্রমবাজারে ১ লাখ কর্মী পাঠাতে চায় বাংলাদেশ

১৮

মহাসড়কে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর

১৯

ড. ইউনূসের বিচার চাইলেন গ্রেপ্তার সেই ৬১ আইনজীবী 

২০
X