

বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হিসেবে এ সংলাপ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক; তবে সামগ্রিক আলোচনায় যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে তা হলো, নির্বাচনী আচরণবিধি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অসন্তোষ। আচরণবিধির সাংঘর্ষিক ধারা, শাস্তির অস্পষ্টতা, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং ইসির সদিচ্ছা এখন সামনে আসতে শুরু করেছে।
সংলাপে বিএনপি, জামায়াত, গণসংহতি আন্দোলন, এনসিপিসহ ১২টি দলের অংশগ্রহণ ও অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, তারা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। বিএনপি স্পষ্টভাবেই বলেছে, আচরণবিধির শাস্তির ধারা অস্পষ্ট এবং নিয়ম বাড়ালে লঙ্ঘনের প্রবণতাও বাড়বে। তারা রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তা নিয়োগের দাবি তুলেছে। এটি নিছক কারিগরি দাবি নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত আস্থার প্রশ্ন। প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের যে অভিযোগ বিরোধী দলগুলো বহু বছর ধরে করে আসছে, সেটিই নতুন করে সামনে এসেছে।
অন্যদিকে জামায়াত প্রশাসনের ব্যাপক রদবদলকে ‘চক্রান্ত’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে লটারির মাধ্যমে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার নিয়োগের দাবি তুলেছে। বাস্তবে এ দাবি বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু তাদের উদ্বেগটি অমূলক নয়।
আচরণবিধির সাংঘর্ষিক ধারা বিশেষ করে পোস্টার ব্যবহার নিয়ে ৭-এর ক ও ৭-এর ঘ উপধারার বিভ্রান্তি প্রকাশ করে যে, প্রস্তুতপ্রণালিতে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা হয়নি। প্রচারসামগ্রী সীমিত করা পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশংসনীয়; কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রচারমাধ্যমের সুযোগ সীমিত হলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল প্রার্থীরা আরও বেশি অসুবিধায় পড়ে। গণসংহতি আন্দোলনের বক্তব্য এই যে, দেশজুড়ে আগে থেকেই ঝুলে থাকা হাজারো বিলবোর্ড নির্বাচনী লড়াই শুরু হওয়ার আগেই প্রতিযোগিতাকে অসম করে ফেলেছে। একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে। এ ক্ষেত্রে ইসির নীরবতা বা বিলম্ব শুধু সমালোচনার জন্মই দেয় না, বরং নির্বাচনের সমতা নষ্টও করে।
সংলাপে এনসিপি নেতৃত্ব মাইক ব্যবহারে ৬০ ডেসিবল শব্দমাত্রা মাপার যন্ত্র আদৌ আছে কি না, সে প্রশ্ন তুলে ইসির বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। এ সন্দেহটি হাস্যকর নয়; বরং নিয়ম প্রণয়নের আগে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও বাস্তবতায় সক্ষমতার পরীক্ষার মতো মৌলিক কাজ ইসিকে আগেই করতে হবে।
সিইসি বলেছেন, আচরণবিধি প্রস্তুত করা বড় কাজ নয়, বরং তা পরিপালনই গুরুত্বপূর্ণ। কথাটি সত্য, কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইসির প্রস্তুতি কতটুকু? রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন ছাড়া আচরণবিধি প্রয়োগ সম্ভব নয়। সিইসি দলগুলোর প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা আশা করেছেন; কিন্তু ন্যায্য নির্বাচন নিশ্চিত করার সাংবিধানিক দায়িত্ব ইসির, রাজনৈতিক দলের নয়।
আমরা মনে করি, এ প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি তিনটি কাজ। আচরণবিধির সব সাংঘর্ষিক ধারা অবিলম্বে সংশোধন করতে হবে। প্রকাশ করতে হবে মাঠপর্যায়ে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কার্যকর পরিকল্পনা। প্রচারসামগ্রী, শব্দমাত্রা বা ব্যয়ের সীমা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল নিশ্চিত করতে হবে। সিইসি নিজেই বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। কিন্তু শুধু ইচ্ছা নয়, আস্থা সৃষ্টিই এখানে মুখ্য। আসন্ন নির্বাচন জাতির কাছে সত্যিকারের গ্রহণযোগ্য হতে হলে ইসিকে কথার চেয়ে কাজে বেশি প্রমাণ রাখতে হবে। কেননা, নির্বাচন প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। আর সেই ভিত্তি যতটা শক্ত হবে, ততটাই শক্তিশালী হবে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।