

চারপাশে লোকে লোকারণ্য। গিজগিজ করছে জনপদ। লোকেরে লোকে খায়। হাট-বাজার, অফিস-আদালত, মসজিদ-মন্দির, হাসপাতাল-ক্লিনিক, রাজপথ-গলিপথ, টার্মিনাল-স্টেশন সব জায়গায় ভিড়। ছোটলোক-বড়লোকে সয়লাব লোকালয়। তাদের বসবাসের জন্য গায়ে গা লাগিয়ে দালান উঠেছে শহরে-গ্রামে হাজারে-বিজারে। ঘন বসতির বস্তি ঘেঁষে পচা পানির লেকের পাশে স্বল্প লোকের সুরম্য প্রাসাদ নগরকে করেছে ইট-কাঠের জঙ্গল। এর মধ্যে মানুষ মেলা ভার। দ্রুত কমে যাচ্ছে মানুষ। এখন একজন আরেকজনকে মানবিক হওয়ার পরামর্শ দেয়। সন্তান যেন মানবিক হয়—এই দোয়া চায় তারা। তবে কি মানুষ পশু হয়ে যাচ্ছে! ডারউইনের তত্ত্ব উল্টোযাত্রা করছে? মানবিক বলেই তো মানুষ। তাকে কেন মানবিক হতে বলছে মানুষ? আজকাল এ কথা বলাবলি করছে, লিখছে অনেকেই। মানুষের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অনেক বাণী রেখে গেছেন মহান ব্যক্তিরা। কবি ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তার মানবতা।’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘ভালো মানুষ হতে চাইলে, আগে মানুষ হওয়া শিখো।’ বিশ্বনন্দিত রাজনীতিবিদ নেলসন ম্যান্ডেলা মনে করেন—‘মানুষ জন্মে না মহান হয়ে, মানুষ মহান হয় কাজের মাধ্যমে।’
এরকম হাজারো উক্তির উদাহরণ তুলে ধরা যাবে। কিন্তু এসব জেনেশুনেও মানুষ দ্রুত অমানুষ হয়ে যাচ্ছে। উন্নত দেশের মানুষ চাঁদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। অথচ, তৃতীয় বিশ্বের মানুষ রাতে বাড়ি ফিরতে নিরাপত্তাহীন বোধ করছে। প্রতিমুহূর্তে দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশের মানুষ। আধুনিক জীবনের সুযোগ-সুবিধা হাতের নাগালে পেয়েও মধ্যযুগীয় চিন্তার চাষ করছে মানুষের মতো দেখতে এ দেশের কিছু ধর্মব্যবসায়ী। চিন্তায় কট্টর, প্রকাশে নিষ্ঠুর ও প্রয়োগে কঠোর মানসিকতার লোকের আস্ফালন বাড়ছে। তাদের প্ররোচনায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা বিস্ফোরণ হয়েছে। জনশক্তি আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে উঠেছে। বৃত্তিমূলক শিক্ষার চেয়ে ভিক্ষানির্ভর লেখাপড়ায় ঝোঁক বাড়ছে। সংখ্যায় বেশি বলে হয়তো সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব এ দেশে গুরুত্ব হারাচ্ছে।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য খাতে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এর পেছনে একটা বড় কারণ, জন্মহার কমানো ও স্থির অবস্থায় রাখতে পারা। ২০২৪ সালে যেখানে নারীদের মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ২ দশমিক ১৭ ছিল, সেখানে বর্তমানে এ হার ২ দশমিক ৪। স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে এমন উল্টো যাত্রা আর কখনো দেখা যায়নি। গত ১৬ নভেম্বর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফ যৌথভাবে মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) ২০২৫ প্রকাশ করে। জরিপে উঠে এসেছে বিভাগভেদে নারীদের প্রজনন হারে পার্থক্য আছে। আবার দরিদ্র এবং কম শিক্ষিত ও নিরক্ষর নারীদের মধ্যে টিআরএফ বেশি। এ তথ্য আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, দারিদ্র্য ও বৈষম্য না কমালে এবং শিক্ষা ও কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ মোটেই সহজ নয়। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের টিএফআর ছিল ৬ বা তার বেশি। স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে জাতীয় সমস্যা বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। সরকার জনসংখ্যা কমানোকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রী মানুষের হাতের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কর্মকৌশল নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সরকারগুলোও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায়। বিশেষ করে জিয়া সরকার পরিবার পরিকল্পনাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়। বেতার, টেলিভিশন, পথনাটক ও গানের মাধ্যমে কম সন্তান রাখার গুরুত্ব জনসাধারণের কাছে তুলে ধরে। সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাধীনতার পর পরবর্তী চার দশকে ধারাবাহিকভাবে টিআরএফ কমেছে। ২০১২-২২ পর্যন্ত সেটা ২ দশমিক ৩-এ স্থির অবস্থায় ছিল। দুই বছর পর সেটা কমে ২ দশমিক ১৭ হলেও এক বছরের ব্যবধানে অনেকটাই বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ এমনিতেই বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ, প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১ হাজার ১৫০ জনের বেশি মানুষ বাস করে। জনসংখ্যার চাপে কৃষিজমি কমছে। অন্যদিকে, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতার কারণে দারিদ্র্য ও হতদরিদ্রের হার বাড়ছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে। এ বাস্তবতায় জনসংখ্যা বেড়ে গেলে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান—সবখানেই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে জোরালো দাবি ওঠে। সরকার কমিশনও গঠন করে। কমিশন তাদের প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুরারোগ্য ব্যাধি সারাতে কোনো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। গত ফ্যাসিস্ট আমলে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ওপেন সিক্রেট। অপ্রয়োজনীয় দালান উন্নয়ন ও আধুনিক যন্ত্রের নামে নয়-ছয় সবাই জানে। যন্ত্র বিকল, জনবলের ঘাটতি, বছরের পর বছর একই চিত্র। সরকারি হাসপাতালে উপচেপড়া ভিড় সামলান সীমিতসংখ্যক ডাক্তার-নার্স। অবহেলিত রোগীর অভিযোগ, দুর্ভাগ্যের মতো স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে বিলাসবহুল বেসরকারি হাসপাতালে মুনাফা করেন স্বাস্থ্য-বাণিজ্যের ব্যবসায়ী চিকিৎসকরা। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিও ঠিক পথে এগোয়নি। গত বছর আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর মাঠপর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। সামগ্রিকভাবে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির শিথিলতার প্রভাব জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ওপর পড়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ইসলামের নামে কিছু উগ্র ডানপন্থি অপশক্তির উদ্ভব হয়েছে। তারা রাজনীতি ও ধর্ম গুলিয়ে ফেলে দুটোরই ক্ষতি করছে। হাজার বছরের গ্রামবাংলার শিল্প-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ও স্বাভাবিক ধর্মচর্চায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে রীতিমতো আপত্তিকর বয়ান প্রচার করছে জামায়াতসহ বেশ কয়েকটি ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দল। নারী নেত্রীবিরোধী কথা বলে পশ্চাৎপদ সমাজের ভীতিকর চিত্র তুলে ধরে। অথচ, তাদের নিজের পরিবারে অনেক নারী আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও কর্মজীবী। ইসলামের নামে এ দ্বিচারিতা সাধারণ মানুষ ভালো মনে করে না। কথায় কথায় অশ্লীল স্লোগান দেয়। অনলাইন অ্যাকটিভিজমের নামে সামাজিক মাধ্যমকে চটিপাড়া বানিয়ে ফেলেছে। ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার কাফেলার সঙ্গে অশালীন ফেসবুকিং যায় না। অথচ, হাজার হাজার বেনামি অ্যাকাউন্ট খুলে অবিরত ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। এ জনপদের মানুষ আগে থেকেই ধর্মপ্রাণ। অল্পকিছু মানুষ নাস্তিকতার চর্চা করে। তবে তারা সাধারণ ধর্মপ্রাণদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ধর্ম বিশ্বাস না করলেও মানুষের ঐক্যের শক্তিকে বিশ্বাস করে। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার পাশাপাশি নির্যাতিত রাজনৈতিক দলগুলো নামে-বেনামে রাজপথে নামে। এর মধ্যে ধর্মীয় দলগুলোও ভূমিকা রাখে। এজন্য তারা মজলুমদের কাছে সম্মানও পায়। কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করছে বকধার্মিকের মতো। জনগণ সবই বোঝে। অভ্যুত্থান ও ভোট ছাড়া সেটা বোঝাতে পারে না। সেটা দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত।
নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যস্ততা এখন চরমে। প্রার্থী মনোনয়ন প্রায় শেষ করে ফেলেছে বড় দলগুলো। ছোটরাও পিছিয়ে নেই। কিন্তু ময়দানে এগিয়ে থাকতে কিছু কিছু বিষয়ে বিতর্ক জিইয়ে রাখছে দলগুলো। প্রশাসনে প্রভাব ফেলতে হুমকি-ধমকি অব্যাহত রেখেছে তারা। পাশাপাশি জনসংযোগ করছে, জনকল্যাণে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। মনোনয়নবঞ্চিতরা দলের প্রতি পুনর্বিবেচনার আবেদন করছেন। নিজস্ব শক্তি প্রদর্শনে দিন-রাত বিক্ষোভ মিছিল, অবরোধ-অবস্থান কর্মসূচি করছে। এটা অবশ্য বিএনপিতে বেশি হচ্ছে। প্রতিটি সংসদীয় আসনে কমপক্ষে পাঁচজন যোগ্য প্রার্থী আছে বলে দাবি তাদের। এখানেও লোকের ভিড় বেশি। মানুষের মতো মানুষ হলে একজনের বেশি দাবিদার পাওয়া যেত না। গাটের টাকা খরচ করে জনসেবা করার উৎসাহ দেখে নানা প্রশ্ন জাগে জনমনে। জনসেবা করতে হলে এমপিই কেন হতে হবে? হাজী মহসিন, মাদার তেরেসাসহ অনেকে জনপ্রতিনিধি না হয়েও জনসেবা করেছেন। ফটকা ব্যবসা বা চাঁদাবাজির টাকায় অনেকে রাজনীতি করে থাকেন। সবাই সবাইকে মোটামুটি চেনেন। তারপরও কি নির্লজ্জ বেসাতি। চোখে সুরমা, দাড়িতে মেহেদি, কপালে দগদগে দাগ নিয়ে কালোবাজারি করছেন অনেকে। রাজনীতিতে তাদেরও একটা অবস্থান আছে। বেকার, অদক্ষ, চাঁদাবাজ, দখলবাজদের বেশিরভাগই রাজনীতিতে জড়িত। ফায়দা হাসিলে ব্যবহার করে সুশীল সমাজের কাছে রাজনীতিকে অপাঙ্ক্তেয় করে ছেড়েছে। তারপরও সমাজের উঁচু-নিচু সব শ্রেণির মানুষই রাজনৈতিক প্রাণী। শুধু কি রাজনীতি, বিভিন্ন পেশাজীবীও এখন রাজনীতিবিদ। অথচ, প্রত্যেকটি পেশায় মেধার সংকট চরমে। অধুনা বিখ্যাত সাংবাদিক-শিক্ষক-আইনজীবী-চিকিৎসক-প্রকৌশলীর তালিকায় নতুন নাম খুব একটা শোনা যায় না। কিন্তু সব পেশায়ই প্রচুর লোক বেড়েছে, মানুষ কমেছে।
লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি