

এ মাসে দোহায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বিশ্ব সামাজিক উন্নয়ন সম্মেলনে সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়নমন্ত্রী আহমেদ আল-রাজহি এবং কিংডমের অন্যান্য প্রতিনিধি অংশ নেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থা এবং সিভিল সোসাইটি সংগঠনের প্রতিনিধিরাও এতে উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে দারিদ্র্য দূরীকরণ, পূর্ণ কর্মসংস্থান ও মর্যাদাপূর্ণ কাজ নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
তাত্ত্বিকভাবে, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি মূলত সামাজিক বঞ্চনার সমস্যাগুলো দূর করার প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত। যেমন শিক্ষাগত পিছিয়ে থাকা, বেকারত্ব, কম আয়, উচ্চমাত্রার অপরাধ, খারাপ আবাসন এবং দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা। সরকারগুলোর সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নীতির পেছনে ধারণা থাকে যে, সমাজের কিছু গোষ্ঠী বৃহত্তর সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত না থাকলে সামাজিক সংহতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ধারণা তাই সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
অস্ট্রেলিয়ার কমিউনিটি স্পোর্টস ক্ষেত্রে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে গবেষণা করা হ্যাজেল ম্যাক্সওয়েলের যুক্তিকে অনুসরণ করলে বলা যায়, এ ধারণাকে সফট পাওয়ারের প্রেক্ষাপটেও আরও বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক জোসেফ নাই তার ‘সফট পাওয়ার: দ্য মিন্স টু সাক্সেস ইন ওয়ার্ল্ড পলিটিকস’ গ্রন্থে সফট পাওয়ারকে বর্ণনা করেছেন এমন এক ক্ষমতা হিসেবে, যা কূটনীতি ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি অবদানকে তার সফট পাওয়ার লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে বোঝা যেতে পারে।
সৌদি আরব বহুদিন ধরে সমাজের সব শ্রেণিকে সহায়তা করা, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা প্রতিরোধ করা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করে আসছে। জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকসহ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থাপনায়ও দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
উদাহরণ হিসেবে, ১৯৭৫-৭৬ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের সময় সৌদি আরব বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে (ডব্লিউএফপি) ৫০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেয়। ২০১৪ সালে তারা ইরাক, সিরিয়া, দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়ার বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের খাদ্যসহায়তা প্রদান করে। আর এ বছর সৌদি আরব ও কাতার যৌথভাবে সিরিয়ার বিশ্বব্যাংকের কাছে থাকা ১৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের দেনা পরিশোধ করে।
একই ধারাবাহিকতায় দোহায় অনুষ্ঠিত এ মাসের সম্মেলনে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, সামাজিক উন্নয়নে বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি জোরদার করা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০-এর প্রতি শক্ত সমর্থন নিয়ে আলোচনা হয়। এই ২০৩০ এজেন্ডা হলো জাতিসংঘের একটি সর্বজনীন পরিকল্পনা, যা গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পরিসরে হওয়া আলোচনা ও বিতর্কের পরিণতি।
এ লক্ষ্যগুলো সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আল-রাজহি উল্লেখ করেছেন যে, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু কার্যক্রমে সৌদি আরবের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে সৌদি গ্রিন ইনিশিয়েটিভ ও মিডল ইস্ট গ্রিন ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে। দেশটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার দিকেও অগ্রসর হচ্ছে।
সৌদি আরব বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারকদের একটি হলেও, ভিশন ২০৩০-এর মাধ্যমে সবুজ জ্বালানি রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে গ্রিন রিয়াদ প্রকল্প এবং ‘মেড ইন সৌদি’ উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষার প্রতি অন্যান্য প্রতিশ্রুতির কথা বলা যেতে পারে। এ ছাড়া দেশটি অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে পর্যটনসহ অন্যান্য খাতে সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে।
এই গ্রীষ্মে সৌদি আরব বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী উৎসব আয়োজন করেছে। দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে অনুষ্ঠিত বেইত হাইল উৎসবে ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেয়। প্রযুক্তি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ করপোরেশন বাহা ক্র্যাফটসম্যান ফোরাম আয়োজন করে। আল-বাহার সিটি হাব উৎসবও ভিশন ২০৩০-এর অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়।
এসব উদ্যোগ সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে শক্তিশালী করে এবং সৌদি আরবের সফট পাওয়ার বাড়াতে সহায়তা করে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম আরও বৃদ্ধি করে।
আগামী বছরগুলোতে সৌদি আরবসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও সফট পাওয়ার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সৌদি আরব বৈশ্বিক সমাজে সামাজিক বৈষম্য মোকাবিলার জন্য ভিশন ২০৩০-এর মতো একটি নতুন বৈশ্বিক ‘ভিশন’ প্রস্তাব করে নেতৃত্ব দিতে পারে। এই নতুন কর্মসূচি জাতিসংঘ বা বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় তৈরি হতে পারে এবং ভিশন ২০৩০-এর লক্ষ্য ও জাতীয় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে, সৌদি সরকারের সঙ্গে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ে একটি বিশেষ কর্মসূচি তৈরি করা যেতে পারে, যা ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নে সাহায্য করবে।
এটি মোহাম্মদ বিন সালমান ননপ্রফিট সিটির সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে, যা ভিশন ২০৩০-এর একটি বিশেষ প্রকল্প। রিয়াদে অবস্থিত এ কেন্দ্রটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ক্ষমতায়ন করার উদ্দেশ্যে গড়ে উঠছে, যেখানে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর, মানুষকেন্দ্রিক পরিবেশে তরুণরা শেখার, উদ্ভাবনের এবং কাজের সুযোগ পাবে। এটি সৌদি সমাজে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক জগতে সৌদি আরবের সফট পাওয়ারকে আরও বিস্তৃত করবে।
এ ধরনের প্রকল্প ও উদ্ভাবন ভিশন ২০৩০-এর বাস্তবায়নের সঙ্গে আরও বেশি সংযুক্ত হতে পারে এবং এর ফলাফল প্রয়োগ করা যেতে পারে সৌদি আরবের ৫০০ বিলিয়ন ডলারের নিওম স্মার্ট সিটিতে।
অর্থাৎ ‘মেড ইন সৌদি’ প্রচারণাকে ভিত্তি করে বিশ্বব্যাপী সামাজিক ন্যায়বিচারকে উৎসাহিত করার নতুন মূল্যবোধ গড়ে তোলা যেতে পারে। ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নে এ পর্যন্ত অর্জিত সাফল্যের ভিত্তিতে, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কিত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সৌদি আরব নতুন বৈশ্বিক ‘ভিশন’ উপস্থাপনের মাধ্যমে নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে পারে।
লেখক: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব ইসলামিক স্টাডিজের একাডেমিক ভিজিটর। আরব নিউজে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ