

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহির প্রশ্ন বহু দশক ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে। সম্প্রতি রাজধানীর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ-সংক্রান্ত তিনটি দুর্নীতির মামলায় শেখ হাসিনাসহ তার পরিবারের সদস্যদের দণ্ডাদেশ সেই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আদালতের রায়ে শেখ হাসিনার ২১ বছরের কারাদণ্ড, সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড এবং রাজউক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বহু কর্মকর্তার সাজা হয়েছে। সব মিলিয়ে এটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক দৃষ্টান্তমূলক ঘটনা। রায়ে বলা হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার, তথ্য গোপন, জালিয়াতি, অবৈধ প্রভাব খাটানো এবং সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে।
সরকারি সম্পদের সুষম ব্যবহার ও বরাদ্দে স্বচ্ছতা দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পে ‘গরিব দেখিয়ে’ প্লট বরাদ্দের অভিযোগ শুধু একটি প্রশাসনিক দুর্নীতির চিত্র নয়, এটি সরকারি দপ্তর ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককেও স্পষ্ট করে। যেখানে রাজউকের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা দুর্নীতিতে জড়িত। রাজউক ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রীসহ অসংখ্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাজা প্রমাণ করে যে, এই দুর্নীতি ছিল একটি নেটওয়ার্কভিত্তিক, প্রাতিষ্ঠানিক অসংগতি। এতে স্পষ্ট হয়, রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরে ক্ষমতার অপব্যবহার কোথায় কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা উল্লেখ করার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিচারকের ভাষায়, সাংবাদিকদের অনুসন্ধান প্রকাশ না হলে দুদক কখনোই তদন্ত শুরু করত না। এটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম স্বাধীনতার গুরুত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। গণমাধ্যম যদি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে কাজ না করে, তবে এমন অনিয়ম বহুবারই চাপা পড়ে যেত। তবে এ রায়ের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দুদকের পক্ষ থেকেই সর্বোচ্চ শাস্তি না পাওয়ার অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতার প্রতি সম্মান রেখেই বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপকে নির্দেশ করে। অন্যদিকে সাজাপ্রাপ্তদের অধিকাংশই পলাতক, এটিও একটি অস্বাভাবিক বাস্তবতা। তাই এই মুহূর্তে প্রয়োজন বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে আইনি লড়াইয়ের সব সুযোগকে সম্মান জানানো। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে সবার আগে রাখা এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহারের সব পথ বন্ধ করা।
এ রায় কেবল একটি ব্যক্তি বা পরিবারের বিরুদ্ধে নয়। এটি রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, গণতন্ত্র দাঁড়িয়ে থাকে ন্যায়, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে। এ ভিত্তি দুর্বল হলে রাষ্ট্রও দুর্বল হয়। এখন প্রয়োজন রাজনীতি, আমলাতন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থার অভ্যন্তরে যে দুর্নীতির পুঞ্জীভূত স্তরগুলো রয়েছে, সেগুলো ভেঙে ফেলে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
আমরা মনে করি, এ রায়ের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করবে তার পরবর্তী বাস্তবায়ন, আপিল প্রক্রিয়া এবং একই ধরনের সব মামলায় সমান দৃঢ়তা বজায় রাখার ওপর। দুর্নীতি দমনে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন, প্রশাসনের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং নাগরিক জবাবদিহি শক্তিশালী করা জরুরি।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও আইনের শাসন এখন যে ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে, এ ধরনের রায় সমাজে ন্যায়, সততা ও সমতার বার্তা পাঠাতে পারে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, শুধু ব্যক্তির বিচার এখানে মুখ্য নয়, গৌণ। মুখ্য বিষয় হলো, বহুদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সংস্কার ও সুষ্ঠু ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার যে বিষয়টি এখন বিশেষভাবে সামনে এসেছে, তাকে গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া।
মন্তব্য করুন