

অতি উচ্চারণ ও প্রচারণার তোড়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘রিক্ত আমি নিঃস্ব আমি দেবার কিছু নাই, আছে শুধু ভালোবাসা দিয়ে গেলাম তাই’-এর কয়েক লাইন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারই কবিতার মতো প্রতিষ্ঠা হয়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তিনি গলা কাঁপিয়ে তা আবৃতি করতেন। স্তুতি-বন্দনাকারীরা সমস্বরে স্লোগান দিতেন। নেতান্ধ-দলান্ধরা চোখ মুছতেন। এতে আপ্লুত নেত্রী পরক্ষণেই শোনাতেন—প্রয়োজনে জাতির জন্য জীবনটাও দিয়ে দেবেন। তিনি দশ টাকায় টিকিট কেটে চিকিৎসাও করাতেন। জাতির প্রতি বয়ান ছিল সবাই যেন তার মতো এভাবে দেশে চিকিৎসা নেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশ না যান। এসবের ছিল ব্যাপক প্রচার-প্রসার। তা পোক্ত করতে প্রশ্ন করা হতো—কোন দেশের প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসার জন্য বিদেশ যান না, দশ টাকায় দেশেই চিকিৎসা নেন?
এক কথায় এ প্রশ্নের জবাব—বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই শেখ হাসিনাকে প্লট দুর্নীতির তিনটি মামলায় ৭ বছর করে ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও কন্যা সায়েমা ওয়াজেদ পুতুলকে পাঁচ বছর। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা জালিয়াতির মাধ্যমে রাজউকের প্লট বরাদ্দ নিয়ে শপথ ভঙ্গ করেছেন। গত বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক আবদুল্লাহ আল মামুন শুরুতে মামলার প্রেক্ষাপট ও অপরাধের ধরন তুলে ধরেন। এরপর রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, রাজউক ও শেখ হাসিনা প্লট বরাদ্দ নিতে চরম জালিয়াতি করেছেন। হলফনামায় দিয়েছেন যত মিথ্যা তথ্য। এসব কীর্তির অন্যতম হোতা সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরিফ আহমেদকে ৬ বছর করে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৭ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন আদালত। গ্রেপ্তার থাকা একমাত্র আসামি খুরশিদ আলমকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের কিচ্ছু সহায়-সম্পদ নেই, এ যুক্তিতে তাদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ গণভবনও দিয়ে ফেলা হয়েছিল। এ নিয়ে রয়েছে হাসি-মশকরাসহ নানা কাণ্ডকীর্তি। সেখানে এখন যোগ হয়েছে, ৮৩২ ভরি স্বর্ণ। অগ্রণী ব্যাংকের লকারের সেই স্বর্ণ জব্দের সেই ঘটনায় ঘি ঢাললেন শেখ হাসিনা নিজেই। বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যমে এ বিষয়ে তার একটি অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। যেখানে তাকে (হাসিনা) বলতে শোনা যায়—‘আমাদের তো ছিল গহনা, আমি তো অস্বীকার করি না, আমরা তো ভেসে আসা পরিবার না।’ ওই রেকর্ডে হাসিনাকে আরও বলতে শোনা যায়—‘অগ্রণী ব্যাংকে তালা ভেঙেছে। কেন তালা ভাঙল? চাবি তো আমার কাছে; আমি তো এখনো জীবিত আছি। তো আমি যেখানে এখনো জীবিত আছি আর মামলায় কেবল একটা রায় দিয়েছে। এই রায়ের সব ধাপ তো শেষও হয়নি। তার আগেই কেন গহনায় হাত দেবে?’
এক কথায় আরেক কথা চলে আসে। কথার পিঠে কথা যাকে বলে। কথার সঙ্গে প্রশ্নও অনেক। ইতিহাসের বর্ণনায় রয়েছে—মধ্যবিত্ত ঘরে জন্ম শেখ হাসিনার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের। শেখ বোরহান উদ্দিনের ছেলে শেখ আকরাম হলেন বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফর রহমানের দাদা আর শেখ লুৎফর রহমান হলেন শেখ আবদুল হামিদের সন্তান। একজন সেরেস্তাদার ছিলেন শেখ লুৎফুর রহমান। তিনি ছিলেন রাজনীতি-সচেতন। নিজে সরাসরি রাজনীতিতে না থাকলেও ছেলেকে রাজনীতিতে বাধা দেননি। বরং উৎসাহ দিয়েছেন। সোনাদানা পরের বিষয়, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটিইবা তাদের হলো কীভাবে? এ নিয়েও রয়েছে নানা কথামালা। এক সময় সত্যিই ঢাকায় বঙ্গবন্ধু পরিবারের মাথা গোঁজার নিজস্ব কোনো ঠাঁই ছিল না—তা প্রমাণিত। ১৯৫৪ সালে বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মতো যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার মন্ত্রী হন। সরকারটি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ কংগ্রেস, তপশিলি ফেডারেশন ও গণতন্ত্রী পার্টি সরকার গঠন করলে সে সরকারের চিফ মিনিস্টার নির্বাচিত হন আতাউর রহমান খান। আর শেখ মুজিবুর রহমান হন সেই মন্ত্রিসভার বাণিজ্য, শ্রম, শিল্প ও দুর্নীতিদমন মন্ত্রী।
তখন তিনি মন্ত্রী হিসেবে সপরিবারে থাকতেন আবদুল গণি রোডের ১৫ নম্বর বাড়িতে। ১৯৫৭ সালের শুরুতে বেগম মুজিবের নামে এক বিঘার একটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। যার মূল্য ধরা হয় ৬ হাজার টাকা। নিয়ম মোতাবেক ২ হাজার টাকা পরিশোধ করার পর বাকি থাকে ৪ হাজার টাকা। বাকি ৪ হাজার টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করা হয়েছিল। ১৯৫৭ সালে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন। ১৯৫৮ সালে বঙ্গবন্ধু টি বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় সেগুনবাগিচায় একটি বাসা তার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল জারির পর শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর ১২ অক্টোবর তার পরিবারকে সেগুনবাগিচার বাড়িটি তিন দিনের মধ্যে ছেড়ে দিতে বলা হয়। ১৫ অক্টোবর এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বেগম মুজিব তার সন্তানদের নিয়ে সিদ্ধেশ্বরী বয়েজ স্কুলের মাঠের পাশে একটি বাড়িতে ভাড়ায় ওঠেন। কিছুদিনের মধ্যে সেই বাড়িও ছেড়ে দেন। এরপর ওঠেন সেগুনবাগিচার একটি বাসার দোতলায়। ১৯৬০ সালের ১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্ত হয়ে আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে কন্ট্রোলার অব এজেন্সিস পদে চাকরি নেন। এরপর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িটির নির্মাণকাজ শুরু। বাড়িটিতে ওঠেন ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর। এ বাড়িই একটা সময়ে এসে হয়ে যায় রাজনীতির এক ঠিকানা।
পঁচাত্তর ট্র্যাজেডির পর বাড়িটি হয়ে যায় ছাড়া বাড়ি। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হয়ে নির্বাসন থেকে ফিরে এলে এ বাড়িটি তিনি ফিরে পান। তখনকার সংবাদপত্রগুলোর পরিবেশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ওই বাসা থেকে ৫০৩ ভরি স্বর্ণ, ৪ হাজার ভরি রুপা এবং প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল। এ নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। আওয়ামী লীগ থেকে দাবি করা হয়, শেখ মুজিবের চরিত্র কালিমা লেপন করার জন্য পত্রিকায় এসব সম্পদের খবর ছাপা হয়। আরেক ভার্সনে বলা হয়, শেখ মুজিব রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় তার দুই সন্তানের বিয়েতে যেসব উপহার পেয়েছেন, সেগুলো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাখার সময় পাননি। তাই সেগুলো নিজের ঘরেই রাখেন। তখনকার হিসাবদৃষ্টে ওই সম্পদের বিবরণীতে হীরা, মুক্তা, প্লাটিনাম ও স্বর্ণালংকার—৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা, বাংলাদেশি মুদ্রায় নগদ ৯৪ হাজার ৪৬১ টাকা, ৩টি ব্যক্তিগত মোটরগাড়ি, বৈদেশিক মুদ্রা ১৭ হাজার ৫০০ টাকার, বিদেশি রাষ্ট্র প্রদত্ত প্রায় এক লাখ টাকার উপহার, বাতিলকৃত শতকী মোট ৬২১টি, ১টি ভারী মেশিনগান, ২টি হালকা মেশিনগান, ৩টি এসএমজি, ৮টি স্টেনগান, ১০টি আধা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, ৬০টি গ্রেনেডসহ গোলাবারুদ ইত্যাদি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এসবের তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছিল। একজন ম্যাজিস্ট্রেট, একজন সেনা ও একজন পুলিশ অফিসারসহ তিন সদস্যের একটি টিম তালিকাটি করেন। তালিকায় ওয়াকিটকিসহ বিদেশে তৈরি মূল্যবান দ্রব্যাদিও ছিল। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও পুত্রবধূদের নামে ২২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল। এসব অ্যাকাউন্টের তিনটি ছিল শেখ ফজিলাতুন্নেসার নামে। একট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামেও বেগম মুজিবের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল। তালিকায় একটি দলিলের উল্লেখ ছিল। তাতে দেখা যায়, বেগম ফজিলাতুন্নেসা খুলনার দৌলতপুরে গুদাম বার্ষিক ৪৯ হাজার টাকায় পাটমূল্য স্থিতিশীলকরণ সংস্থার নিকট ভাড়া দিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, এ দ্রব্যতালিকায় সাবেক রাষ্ট্রপতির যাবতীয় সম্পদের হিসাব দেওয়া হয়নি, শুধু ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে ‘যাহা পাওয়া গিয়াছে তাহাই উল্লেখ করা হইয়াছে’।
পুরোনো এসব হিসাব ও নথি নতুন করে আসছে ঘটনার অনিবার্যতায়। আসছে ফিলিপিনের স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের স্ত্রী ফ্যাশন সচেতনতা, অভিজাত ও বিলাসী জীবনযাপনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিতি ইমেলদার কথাও। জীবনভর বিতর্ক পিছু ছাড়েনি ইমেলদার। কখনো সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ, কখনো বিলাসী জীবনের জন্য তিনি খবরের শিরোনাম হয়েছেন। জন্মগতভাবেই ধনাঢ্য তিনি। শৈশব থেকেই ছিলেন পরমা সুন্দরী। পঞ্চাশের দশকে ম্যানিলায় একটি দোকানে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য গান গাইতেন। পরে ‘মিস ম্যানিলা’ সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় হন তিনি। ১৯৫৪ সালে ফার্দিনান্দ মার্কোসের সঙ্গে বিয়ে হয় ইমেলদার। নাম হয়ে যায় ইমেলদা মার্কোস। ফার্দিনান্দ মার্কোস তখন ন্যাশিওনালিস্তা পার্টির হয়ে ফিলিপাইনের কংগ্রেসে সদস্য। ইমেলদা মার্কোসের বিলাসবহুল জীবনযাপন বিশ্ব গণমাধ্যমেও ছিল আলোচিত খবর। তিন হাজার জোড়া জুতা, ৬০ হাজার দামি পোশাক এবং অন্যান্য বিলাসদ্রব্যের কথা কতভাবে এসেছে মিডিয়ায়। ফার্দিনান্দ মার্কোসের শাসনামলে, তাদের বিরুদ্ধে জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করে সুইস ব্যাংক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রচুর সম্পত্তি কেনার অভিযোগ ওঠে। ১৯৮৬ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর, প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে এ বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাওয়া যায় এবং পরবর্তীকালে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। স্বামীর শাসনামলে অর্জিত সম্পদের কিছু উদ্ধার হয় ১৯৮৬ সালে তাদের ক্ষমতা থেকে পতনের পর। যুগে যুগে যা হয়ে আসছে, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারও এর বাইরে থাকল না।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
মন্তব্য করুন