

নব্বইয়ের শেষদিকে বাংলাদেশে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারবিরোধী যে আন্দোলন হয়েছে, তার প্রচারে বিদেশি বেতার, সংবাদ সংস্থা, সংবাদপত্র ও সাময়িকী এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে বিদেশি বেতারের ‘খবর’ এ আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার ও প্রকাশে বিদেশি গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা এরশাদ সরকারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে। গণআন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়, তখন ২৭ নভেম্বর এরশাদ সরকার দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। সংবাদপত্রের ওপর জারি করা হয় সেন্সরশিপ। তার প্রতিবাদে সাংবাদিক ইউনিয়ন সংবাদপত্র প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। ফলে আন্দোলনের উত্তপ্ত সময়ে বাংলাদেশের মানুষ দেশের সঠিক চিত্র দেশের গণমাধ্যমগুলো থেকে জানতে পারেনি। দেশের রেডিও ও টেলিভিশন এমনিতেই সরকার নিয়ন্ত্রিত, তদুপরি জরুরি অবস্থার সময় কঠোর সেন্সরশিপে প্রায় কোনো কিছুই প্রচারের উপায় ছিল না। ফলে ওই সময়ে বাংলাদেশের মানুষ যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক অন্ধকার অবস্থায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। কয়েকটি বিদেশি রেডিওর বাংলা সার্ভিস বরাবরই বাংলাদেশের খবর বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরে এবং সে কারণে বাংলাদেশে তাদের শ্রোতার সংখ্যা ছিল অসংখ্য। এর মধ্যে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন বা বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা বা ভিওএর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া রেডিও মস্কো, জার্মান বেতার তরঙ্গ, রেডিও জাপান, রেডিও ফিলিপিন, রেডিও তেহরান ইত্যাদি বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বাংলা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের আন্দোলনের বস্তুনিষ্ঠ খবর শ্রোতারা জানতে পারেন। শুধু বাংলা অনুষ্ঠানই একমাত্র আকর্ষণ ছিল না। বিশ্বের বহু দেশের বেতারের ইংরেজি খবর, বিশ্লেষণ ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স প্রোগ্রামে বাংলাদেশের গণআন্দোলনের খবর গুরুত্ব সহকারে প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিস, ভয়েস অব আমেরিকার ওয়ার্ল্ড সার্ভিস, রেডিও অস্ট্রেলিয়া, অল ইন্ডিয়া রেডিওর (ইংরেজি ও বাংলা) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের বহু শ্রোতা রাতের পর রাত জেগে কিংবা ভোররাতে ঘুম থেকে উঠে এসব বিদেশি রেডিওর নিউজ ও ভিউজ নিয়মিত শুনেছেন। সংবাদপত্র, সাময়িকীহীন ও স্বৈরাচারের আজ্ঞাবহ রেডিও টেলিভিশনের এ দেশে ওই সময় এসব বিদেশি বেতারের ইংরেজি ও বাংলা অনুষ্ঠান আন্দোলনরত ছাত্র-যুবক-জনতাকে অপরিসীম অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
গণআন্দোলন প্রতিহত করতে সামরিক স্বৈরাচারী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য জরুরি অবস্থা জারির পর দিন যতই গড়াতে থাকে, গণআন্দোলন ত্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। তবে ১৯৯০ সালের এদিন (২৯ নভেম্বর) সকালে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার হয়। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ছাত্র-শিক্ষক যৌথ সমাবেশে উপাচার্যসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক পদত্যাগের ঘোষণা দেন। আর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সব শিক্ষক পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে হাজার হাজার ডাক্তার প্রেসিডেন্ট এরশাদ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন শুরু করেন।
এদিন পুনরায় কারফিউ জারি করা হলে জনতা কারফিউ লঙ্ঘন করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে। রাজধানীতে পুলিশ, বিডিআরের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর গাড়ির অবস্থান গ্রহণ করে। মালিবাগ, মৌচাক, রামপুরা এলাকায় জনতার সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর খণ্ডযুদ্ধে শাহজাহানপুরে একজন ও খিলগাঁওয়ে দুজনের মৃত্যু হয়। জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারে মার্কিন সরকারের আহ্বান জানিয়েছে। আর ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয় বাংলাদেশের আন্দোলনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অল ইন্ডিয়া রেডিও পররাষ্ট্র মন্ত্রকের একজন মুখপাত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলে যে, ভারত আশা করছে বাংলাদেশে শীঘ্রই স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
এদিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা বিষয়ে ভয়েস অব আমেরিকা ‘সব রকম বিচ্ছিন্ন করা যোগাযোগের কিছুটা পুনঃস্থাপন : বিমান চলাচল বাতিল’ এবং ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জরুরি পরিস্থিতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে’ শিরোনামে দুটি প্রতিবেদন সম্প্রচার করে। রিপোর্ট দুটি হুবহু তুলে ধরা হলো
সব রকম বিচ্ছিন্ন করা যোগাযোগের কিছুটা পুনঃস্থাপন : বিমান চলাচল বাতিল
আজ সকালে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়। আর সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ সম্মিলিতভাবে ঢালাও পদত্যাগপত্র দাখিল করেন। বার্তা সংস্থাসমূহের খবরাখবরে প্রকাশ, ৯০০ জন শিক্ষক জরুরি অবস্থা বলবতের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। হাজার হাজার ডাক্তারও এই বলে কর্মবিরতি পালন করেন যে, প্রেসিডেন্ট এরশাদ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা কাজে যোগদান করবেন না। ঘণ্টা চারেকের জন্য যখন কিনা কারফিউ শিথিল করা হয় তখন অনিশ্চিত পরিস্থিতির চিন্তায় আতঙ্কগ্রস্ত মানুষজনকে যা পাওয়া গেছে তাই কিনে রাখায় ব্যাপৃত থাকতে দেখা যায় বলে খবরে প্রকাশ। কারফিউ আবার শুরু হওয়ার আগে খাবারদাবার যথেষ্ট সংগ্রহ করে নিতে হবে এই চিন্তায় দোকান বাজারে বিপুলসংখ্যক লোকজনের প্রচণ্ড ভিড় জমে ওঠে। জরুরি অবস্থা আর কারফিউ বলবতের কথা ঘোষণা করার সময় প্রেসিডেন্ট এরশাদ উল্লেখ করেন যে, ৬ সপ্তাহ স্থায়ী সরকারবিরোধী প্রতিবাদ বিক্ষোভ বাংলাদেশের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে তোলে। আজ বৃহস্পতিবার (২৯ নভেম্বর) সরকারের তরফ থেকে একমাত্র যে কথা শোনা যায়, সেটা প্রচারিত হয়েছে রাষ্ট্র পরিচালিত বেতার মারফত। বেতার সম্প্রচারে বলা হয়, সকালের দিকে কারফিউ শিথিল করা হয়। বলা হয় পরবর্তীতে কারফিউ লঙ্ঘনের চেষ্টা চালানো হয়। বেতারের এ ছাড়া বিস্তারিত আর কিছু বলা হয়নি। গতকাল বুধবার (২৮ নভেম্বর) বাংলাদেশের সংঙ্গে প্রায় সব রকমের যোগাযোগই বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তবে তার কতক আবার আজ বৃহস্পতিবার (২৯ নভেম্বর) আংশিক হলেও পুনঃস্থাপিত হয়েছে। তবে যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় তারা গণ্ডগোলের বিস্তারিত বিবরণ দিতে ভয় পাচ্ছেন বলে উল্লেখ করেছেন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে এবং বাংলাদেশ অভিমুখে সকল বিমান চলাচল বাতিল করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট এরশাদকে পদত্যাগে বাধ্য করানোর জন্য এই যে চলতি প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হয়েছে, আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তিনি এ কথা ঘোষণা করার পরই এই সূত্রপাত হয়। বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন যে, অতীতের নির্বাচনগুলোতে কারচুপি হয়েছে। তারা বলেছেন, প্রেসিডেন্ট এরশাদ যতদিন পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকবেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না। তাদের দাবি হলো, তিনি পদত্যাগ করুন যাতে করে নির্বাচন তত্ত্বাবধানের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন একটা সরকার কায়েম করা যায়। (ভয়েস অব আমেরিকা: ২৯ নভেম্বর ১৯৯০)
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জরুরি পরিস্থিতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে
মার্কিন সরকার ইতিমধ্যে জরুরি পরিস্থিতি প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছে। এ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর হতে সংবাদদাতা জন গ্রুয়েনের পাঠানো রিপোর্ট: বাংলাদেশে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে বিরাট প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র রিচার্ড বুচার স্বাভাবিক রাজনৈতিক জীবনযাত্রা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, গত ছয় সপ্তাহে বাংলাদেশে যে সব হিংসা হানাহানির ঘটনা ঘটেছে, জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণায় সেই সব রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে না এই কথা ভেবে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক সাংবিধানিক পদ্ধতিতে ফিরে যাবার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি তাদের।
আরো হিংসা হানাহানির ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য মি. বুচার বাংলাদেশের সরকার এবং সকল পক্ষের প্রতি সংযম বজায়ে রেখে চলার আহ্বান জানান। যার দরুন হিংসা হানাহানি শুরু হয়, তিনি জড়িত সকল পক্ষের প্রতি শান্তিপূর্ণভাবে সেই সব সমস্যার সুব্যবস্থা করার এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজি করার আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এই মুখপাত্র বলেন, ঢাকায় এবং অন্যান্য বড় বড় শহরে কারফিউ জারি করেছে বলে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, আমেরিকান নাগরিকদের এখন বাংলাদেশ সফর স্থগিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। (ভয়েস অব আমেরিকা: ২৯ নভেম্বর, ১৯৯০)
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক
প্রকাশিত নিবন্ধের বক্তব্য ও দায়িত্ব লেখকদের নিজস্ব
মন্তব্য করুন