

শহরের রাস্তাগুলো অনেকটা নদীর স্রোতের মতো। সিগন্যালগুলো বাঁধের দরজার মতো কাজ করে। যখন দরজা ঠিকমতো কাজ করে, নদীর জল শান্তভাবে এগোয়। কিন্তু কেউ যদি জোর করে দরজা ভেঙে এগোতে চায় বা দরজাটাই নষ্ট হয়ে থাকে, তখন স্রোত বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। এদিক-সেদিক চলে যায়। ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যালও ঠিক এমনই। মানুষ যদি নিয়ম মানতে না চায় বা সিস্টেমটাই যদি দুর্বল হয়, তাহলে শহরের চলাচল থেমে গিয়ে বিশৃঙ্খলার স্রোতে ডুবে যায়।
ঢাকার ট্রাফিক পরিস্থিতি শুধু যানজট নয়, নিরাপত্তাহীনতারও বড় এক কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনই খবর শোনা যায় সিগন্যাল ভেঙে দ্রুত যাওয়ার চেষ্টায় দুর্ঘটনা, পথচারী আহত হওয়া বা মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ। ট্রাফিক সিগন্যাল কেন আছে, কীভাবে কাজ করে, কেন মানতে হবে এসব জানা থাকা সত্ত্বেও অনেকে নিয়ম উপেক্ষা করেন। ফলে প্রশ্ন ওঠে—এটি কি মানুষের আচরণের সমস্যা, নাকি সিস্টেমের দুর্বলতার প্রতিফলন?
ঢাকার সড়কে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার প্রায় ৩৬ শতাংশ ঘটে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্যের কারণে। বাংলাদেশি চালকদের ৬৫ শতাংশ স্বীকার করেছেন যে, তারা অন্তত একবার ইচ্ছাকৃতভাবে সিগন্যাল ভেঙে গেছেন। কারণ, রাস্তা ফাঁকা ছিল বা তাড়াহুড়া ছিল, যা আচরণগত সমস্যার বড় উদাহরণ। মানুষের ধৈর্যশক্তি অনেক কম। ফলে তারা ট্রাফিক সিগন্যাল মানতে চায় না।
আচরণগত সংকট, অসহিষ্ণুতা ও ভুল মানসিকতা ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করে। অনেক চালক মনে করেন, কিছুক্ষণ দাঁড়ালে সময় নষ্ট হয়। এ ভুল বিশ্বাস থেকেই সিগন্যাল ভাঙা তাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তাড়াহুড়া, অধৈর্য হওয়া এবং নিজের সুবিধাকেই বড় ভেবে নেওয়ার মনোভাব সমস্যাকে আরও গভীর করেছে।
ট্রাফিক সিস্টেমে ক্যামেরা নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় জরিমানা বা কঠোর মনিটরিং নেই। ফলে সিগন্যাল ভাঙলেও ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে চালকরা অপব্যবহার করেন। অনেক সিগন্যাল কাজ না করা, ভুল টাইমিং বা পুলিশের বিপরীত নির্দেশ এসব কারণে চালকরা বিভ্রান্ত হন। কোথাও একই সিগন্যাল দীর্ঘসময় লাল থাকে, কোথাও পুলিশ হাতের সিগন্যালে বিপরীত দিকের যানবাহন চলতে শুরু করে।
ঢাকার তীব্র যানজট মানুষকে ক্লান্ত, বিরক্ত ও অস্থির করে তোলে। ফলে সামান্য সুযোগ পেলেই নিয়ম ভেঙে এগিয়ে যাওয়াকে তারা বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেন। চালকরা নিয়ম মানতে গেলেও পথচারী বা মোটরবাইক রাইডাররা হঠাৎ রাস্তা পারাপার বা সিগন্যাল ভাঙায় পুরো সিস্টেম বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। এতে নিয়ম মানা কঠিন হয়ে যায়।
জনগণের মাঝে ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সিগন্যাল ভাঙলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নম্বর স্ক্যান করে জরিমানা করা, যা বিশ্বের অনেক দেশে কাজ করেছে। বাংলাদেশেও তা চালু করা গেলে নিয়মভঙ্গ অনেক কমবে। সিগন্যালগুলোর আধুনিকায়ন ও সঠিক টাইমিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সব সিগন্যালকে সমন্বিত করতে হবে, টাইমিং ঠিক করতে হবে, নষ্ট সিগন্যাল দ্রুত মেরামত করতে হবে। বিভ্রান্তি কমলে চালকরাও নিয়ম মানবেন। ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি, ড্রোন মনিটরিং, মোবাইল কোর্ট সবকিছু নিয়মিত হলে চালকরা সাহস পাবেন না নিয়ম ভাঙার। স্কুল-কলেজে ট্রাফিক সচেতনতা, চালকদের প্রশিক্ষণ, গণমাধ্যমে নিয়ম মানার গুরুত্ব তুলে ধরা—এসব মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তনে প্রভাব ফেলতে পারে। পথচারী চলাচল নিয়মতান্ত্রিক করলে চালকদের জন্য সিগন্যাল মানা সহজ হবে।
ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা শুধু নিয়ম ভাঙা নয়—এটি নিজের জীবন, অন্যের জীবন ও পুরো সমাজকে ঝুঁকির মুখে ফেলার নাম। সমস্যা শুধু মানুষের জন্য নয়, সিস্টেম দুর্বলতাও রয়েছে। তবে পরিবর্তন সম্ভব যদি সিস্টেম আধুনিক হয় আর মানসিকতার পরিবর্তনে প্রস্তুত হয় মানুষ। শহর শুধু রাস্তা দিয়ে চলে না, চলে নিয়ম, ধৈর্য ও পারস্পরিক সম্মান দিয়ে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত সিগন্যাল ভাঙা নয় এবং নিয়ম মানার চর্চাই হোক আমাদের প্রতিশ্রুতি।
ফারিহা জামান নাবিলা
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা