

সাম্প্রতিককালের প্রতিবেদনগুলো কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী জীবনের ভয়াবহ বাস্তবতাগুলোকে আরও একবার সবার সামনে উন্মোচিত করেছে। কিছুদিন আগে ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, এখন পর্যাপ্ত খাদ্য, প্রাথমিক চিকিৎসা, সাবান, আশ্রয়সামগ্রী, এমনকি নবজাতকের পুষ্টির মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারছে না অসংখ্য রোহিঙ্গা পরিবার। শরণার্থীশিবিরের চিকিৎসকরা বলছেন, অপুষ্ট শিশুদের সংখ্যা অকস্মাৎ বেড়ে গেছে। মায়েরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গুঁড়া দুধের অপেক্ষায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন, কিন্তু আগের মতো সেই দুধ এখন আর আসে না। বহু ক্লিনিক এখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো চলমান আছে, সেগুলো সীমিত সেবা দিতে বাধ্য হচ্ছে। বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক সহায়তা কমতে কমতে মানবিক প্রতিক্রিয়া এখন কার্যত পতনের দ্বারপ্রান্তে। এর মাশুল গুনতে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অসহায় ও রাষ্ট্রবিহীন শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে।
রোহিঙ্গাদের এ করুণ গল্প এতদিনে প্রায় সবার কানেই পৌঁছে গেছে। টানা আট বছর ধরে রোহিঙ্গারা বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থীশিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ২০১৭ সালের গণহত্যার পর মিয়ানমার থেকে যে বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে, তার আজও কোনো সুরাহা হয়নি। সেই সময় থেকেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ ব্যাপারে ক্রমাগত সতর্ক করে আসছিলÑসহায়তা কমলে অনাহার বাড়বে, প্রতিরোধযোগ্য রোগে মৃত্যুর হার বাড়বে। কিন্তু সেই সতর্ক বার্তাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আজ আমরা সেই ভীতিকে বাস্তব রূপ ধারণ করতে দেখছি। পরিস্থিতির আর নিঃশব্দ অবনতি ঘটছে না, বরং সেটা দ্রুত ধসে পড়ছে।
এই মুহূর্তটি বাংলাদেশের জন্যও বিশেষভাবে সংবেদনশীল। রাজনৈতিক পরিবর্তনের উত্তাল পর্বে দেশকে স্থিতিশীল করার দায়িত্ব নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু একই সময়ে তাদের কাঁধে চাপছে বিশাল শরণার্থীর এ পুরোনো বোঝা। কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরগুলোতে জনসংখ্যা লাটভিয়ার রাজধানী রিগার থেকেও বেশি। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা সন্দেহাতীত। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তা কমতে কমতে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাদের পক্ষে এখন প্রায় দশ লাখ মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে বহন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে, জনগণের ধৈর্য ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। কক্সবাজারে উত্তেজনা বাড়ছে আর রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ প্রতিদিন আরও অন্ধকার হয়ে উঠছে।
এ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি চাপের সমাবেশ। প্রথমত, বিশ্বজুড়ে মানবিক তহবিল ভয়াবহভাবে কমে গেছে। এ বিশাল ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে জাতিসংঘের প্রতিবেদনগুলোতে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট বা নিকটবর্তী ভূরাজনৈতিক সংঘাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে দাতা রাষ্ট্রগুলো। তাই দান করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ বা ত্রাণ তাদের কাছেও নেই।
দ্বিতীয়ত, বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে মিয়ানমারের রাজনৈতিক মানচিত্র। রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চল এই মুহূর্তে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু তারা ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিকেই নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। তারা এমন সব বিধিনিষেধ আরোপ করছে, যা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথকে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত করে তুলেছে। যে প্রত্যাবাসন একসময় ছিল একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান, আজ তার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। ফলে রোহিঙ্গারা আটকে গেছে এক চিরন্তন অন্ধকারের ভেতর, অনিশ্চয়তার এক অসীম বন্ধনীর মধ্যে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিধ্বংসী সংকট হলো—রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ। অপুষ্টি, অপ্রতুল শিক্ষা, সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন গড়ার সুযোগের অভাব—এসবের মাঝে তারা একটি হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মে পরিণত হচ্ছে। এটি শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, আমরা যেন একটি জাতির ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয়ে যেতে দেখছি। যেন জীবনের নির্মম দিকটাকে আমাদের সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে মানবিকতার এ বিপর্যয়।
শরণার্থীশিবিরে সাক্ষাৎকারের দরুন এক মা বলেন, তিনি তার বাচ্চাদের ভাতের মাড় ফুটিয়ে পান করান। কারণ, ন্যূনতম খাদ্যরেশনও তাদের ভাগ্যে জুটছে না। আরেকজন মা জানান, এই শীতের মৌসুমে নবজাতককে প্লাস্টিকের চাদরে জড়িয়ে রাখতে হচ্ছে; কেননা তার কাছে কোনো কম্বল নেই। স্বাস্থ্যকর্মীদের বর্ণনায় উঠে আসে এমন শিশুদের কথা, যাদের শরীরে স্টান্টিংয়ের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ, স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শিশুদের শারীরিক প্রবৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ। এগুলো কোনো বিমূর্ত পরিসংখ্যান নয়। এগুলো হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থানরত ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর জীবন্ত পরিণাম।
কিন্তু দায় শুধু দাতা রাষ্ট্রগুলোর নয়। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রেই ছিল একটি কৌশলগত ব্যর্থতা। দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকটকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এটি যে একই সঙ্গে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নেও রূপ নিয়েছে—সেই ব্যাপারটিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিয়ে উপলব্ধি করা হয়নি।
কক্সবাজার এখন এক ঘনবসতিপূর্ণ, দারিদ্র্যঘেরা, অস্থায়ী নগরীতে পরিণত হয়েছে। দুশ্চিন্তার একটা বড় কারণ হলো, সীমানার ওপারেই চলছে গৃহযুদ্ধ। এখানে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের তরুণ রোহিঙ্গাদের নেই শিক্ষা, নেই কাজের সম্ভাবনা, নেই চলাচলের স্বাধীনতা। এমন একটি জনগোষ্ঠীকে সার্বিক বঞ্চনার মধ্যে ফেলে রাখা মানে ভবিষ্যতে অস্থিতিশীলতার বীজ বপন করা। আর এ অস্থিতিশীলতা শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এ কারণেই এখন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এ নতুন পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার পাবে বর্তমান মানবিক বিপর্যয়কে রোধ করার উদ্যোগ। নিশ্চিত করতে হবে যেন কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরগুলোকে দাতা রাষ্ট্রগুলোর সরকারপ্রধানরা বাজেটের গৌণ খাত হিসেবে নয়, বরং একটি জরুরি সংকট হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন। অবিলম্বে ফিরিয়ে আনতে হবে সর্বনিম্ন পুষ্টির মান নিশ্চিত করার মতো খাদ্যসহায়তা; পুনর্গঠিত করতে হবে স্বাস্থ্যসেবা; খুব দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে পানি, স্যানিটেশন এবং সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর পুনর্বিন্যাস। আন্তর্জাতিক মানবিক নীতিমালা অনুযায়ী এগুলো সদিচ্ছার দান নয়, বরং সব রাষ্ট্রের অবশ্যপালনীয় মৌলিক দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত, প্রায় দশ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে যে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপে বাংলাদেশ আছে, সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তার যথার্থ সমর্থন দিতে হবে। আট বছর ধরে ঢাকা কার্যত একাই এ বিশাল দায়িত্ব পালন করে চলেছে। এখন যখন বাংলাদেশ নিজস্ব রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন শরণার্থীশিবিরে বাড়তে থাকা অস্থিতিশীলতা মোকাবিলার বোঝা তারা একা বহন করতে পারবে না—এমনটাই স্বাভাবিক। শিবিরের অভ্যন্তরে প্রশাসনকে শক্তিশালী করা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা বাড়ানো এবং পর্যবেক্ষণাধীন জীবিকানির্ভর কর্মসূচি বিস্তৃত করা—পরিস্থিতির অবনতি রোধে এগুলো বরাবরই অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, প্রত্যাবাসনের বাস্তব শর্ত নিয়ে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলে বর্তমান প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে রাখাইনে আরাকান আর্মির দ্রুত বিস্তৃতি। এ সামরিক দ্বন্দ্বের রাজনৈতিক সমাধান করা না গেলে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দূর ভবিষ্যতেও শরণার্থী হয়ে জীবনযাপন করতে হবে,Ñযা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং কৌশলগতভাবে অতি বিপজ্জনক।
বাংলাদেশ, আসিয়ান ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর একটি সুস্পষ্ট কৌশল প্রয়োজন, যা জাতীয় ঐক্য সরকার এবং আরাকান আর্মি উভয়ের সঙ্গে অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বেচ্ছাপ্রত্যাবর্তনের কাঠামোবিষয়ক আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। পরিশেষে, রোহিঙ্গাদের শুধু দীর্ঘায়িত সংকটের শিকার হিসেবে দেখলে চলবে না। তারা নিজেদের মনে হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী একটি জাতি হিসেবে টিকে থাকার জোরালো আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। তাদের শিশুদের ক্রমেই স্থায়ী বঞ্চনাময় জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া শুধু মানবিক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি জাতিকে মুছে ফেলার নীরব প্রক্রিয়া।
কক্সবাজারের এই শরণার্থী সংকট কোনো আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা হঠাৎ সৃষ্ট সংঘাতের ফল নয়। এটি দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক উদাসীনতার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। বাংলাদেশ যেমন একা এই ভার বহন করতে পারে না, তেমন রোহিঙ্গারাও খালি প্রতিশ্রুতিতে বাঁচতে পারে না। বিশ্ব যদি তার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়, তাহলে আমরা শিগগিরই আরও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হব।
ইতিবাচক পরিবর্তনের দরজা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। কিন্তু দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে, শিগগিরই সেই সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়ে যাবে। রোহিঙ্গাদের সহানুভূতি নয়—প্রয়োজন খাদ্য, চিকিৎসা, সুরক্ষা এবং তাদের ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই পরিকল্পনার। এ মানবিক সংকট চিরতরে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার আগেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটা গতি করতে হবে।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক; ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের পরিচালক; যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তান সরকারের নীতি ও উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা; জি-৭ আন্তর্জাতিক জোটের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা। আরব নিউজে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন অ্যালেক্স শেখ