

স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ১৪৫তম জন্মজয়ন্তী আজ। প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী ফকির আলমগীরের সেই বিখ্যাত গান, ‘ভাসানীর ভাষা ভেসে আসে ওই মিছিলের গর্জনে/ কিষান-কামার এই বাংলার মেহনতি লাখো জনে।’ আজও শোষিত নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ভাসানীকে বারবার সামনে এনে দাঁড় করায়। যুগে যুগে জনে-জনের অন্তরে জিইয়ে আছেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। যিনি আমৃত্যু কৃষক, শ্রমিক, জেলে, মজুর, কামার, কুমার, তাঁতি ও খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় লড়াই করে গেছেন।
ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির পাবনা জেলার সয়াধানগড়া পল্লীতে (বর্তমানে বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলায়) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হাজী শারাফত আলী। হাজী শারাফত আলী ও বেগম শারাফত আলীর পরিবারে চার সন্তানের জন্ম হয়। এক মেয়ে ও তিন ছেলে। মো. আবদুল হামিদ খান সবার ছোট। তার ডাক নাম ছিল চেগা মিয়া। ছেলেমেয়ে বেশ ছোট থাকা অবস্থায় হাজী শারাফত আলী মারা যান। কিছুদিন পর এক মহামারিতে বেগম শারাফত ও দুই ছেলে মারা যায়। বেঁচে থাকেন ছোট্ট শিশু আবদুল হামিদ খান।
পিতৃহীন ভাসানী প্রথমে কিছুদিন চাচা ইব্রাহিমের আশ্রয়ে লালিত-পালিত হন। ওই সময় ইরাকের প্রখ্যাত সুফি ও ধর্ম প্রচারক হযরত নাসির উদ্দীন বোগদাদি (রহ.) সিরাজগঞ্জে আসেন। ভাসানী তার আশ্রয়ে কিছুদিন কাটান। এরপর ১৮৯৩ সালে তিনি পাঁচবিবির জমিদার শামসুদ্দিন আহম্মদ চৌধুরীর বাড়িতে যান। সেখানে মাদ্রাসার মোদাররেসের কাজ করেন এবং জমিদারের ছেলেমেয়েকে পড়ানোর দায়িত্ব নেন। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে পীর সৈয়দ নাসির উদ্দীন বোগদাদির (রহ.) সঙ্গে আসাম গমন করেন। ১৯০৩ সালে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ইসলামী শিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯০৭ সালে দেওবন্দ যান। দুই বছর সেখানে অধ্যয়ন করে আসামে ফিরে আসেন। ১৯১৭ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ময়মনসিংহ সফরে গেলে তার ভাষণ শুনে ভাসানী অনুপ্রাণিত হন। ১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যোগদান করে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে দশ মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন স্বরাজ্য পার্টি গঠন করলে ভাসানী সেই দল সংগঠিত করার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করেন। ১৯২৫ সালে তিনি জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার জমিদার শামসুদ্দিন মহম্মদ চৌধুরীর মেয়ে আলেমা খাতুনকে বিয়ে করেন। ১৯২৬ সালে তিনি তার সহধর্মিণী আলেমা খাতুনকে নিয়ে আসাম গমন করেন এবং আসামে প্রথম কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। ১৯২৯-এ আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে প্রথম কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেন। এখান থেকে তার নাম রাখা হয় ‘ভাসানীর মওলানা’। এরপর থেকে তার নামের শেষে ভাসানী শব্দ যুক্ত হয়।
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আফ্রো-এশিয়া-লাতিন আমেরিকার মানুষের কাছে ‘মজলুম জননেতা’ হিসেবে পরিচিত। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম তৃণমূল রাজনীতিবিদ ও গণআন্দোলনের নায়ক। বেশ কিছু সাধারণ ও স্থানীয় নির্বাচনে জয়ীও হন। তবে কখনো ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেননি। তার নেতৃত্বের ভিত্তি ছিল কৃষক শ্রমিক জনসাধারণ, যাদের অধিকার এবং স্বার্থরক্ষার জন্য তিনি নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম করে গেছেন। ১৯৪৭-এ সৃষ্ট পাকিস্তান ও ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কৃষক আন্দোলনের নেতা হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু।
মওলানা ভাসানী বাংলার মজলুম জননেতা, যিনি সারাজীবন কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছেন। স্বাধীনতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের এক অনন্য মিশ্রণ তার রাজনৈতিক দর্শন, যা তাকে একজন দূরদর্শী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি কখনোই আপস করেননি, বরং নিজের আদর্শের প্রতি অবিচল থেকেছেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, জমিদারদের নির্যাতন এবং পাকিস্তানি শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম ছিল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। ভাসানী ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা। ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে তিনি পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। তার এই ঘোষণা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
মওলানা ভাসানীর জীবন এবং রাজনীতি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, শোষিত মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য সংগ্রাম অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন এবং বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তার আদর্শ আমাদের ইতিহাসের মূল্যবান অংশ। মওলানা ভাসানীর জন্মবার্ষিকীতে আমরা স্মরণ করি তার অবদান এবং সংগ্রামের ইতিহাস। তিনি ছিলেন এক মহান নেতা, যিনি আজও প্রেরণার উৎস। পৃথিবীর নানা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে তার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে গবেষণা চলছে, যা প্রমাণ করে তার অবদান কতটা গভীর ও বিশাল। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক দিকনির্দেশক, এক সংগ্রামী মহাপুরুষ, যিনি মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জীবনবাজি রেখেছিলেন। তার জীবন ও সংগ্রাম আমাদের শেখায়, কীভাবে দেশ ও জাতির উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করতে হয়।
মওলানা ভাসানী চিরকাল আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন, তার আদর্শ, তার সংগ্রাম ও তার মুক্তিযুদ্ধের পথিকৃৎ হিসেবে।
লেখক: রাজনীতিক ও কলাম লেখক