

ট্রাম্পের নতুন সহিংস কৌশল বহু বছরের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতা। এ নীতিগুলো সাধারণ ভেনেজুয়েলানদের জীবন ধ্বংস করেছে। বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার উপকূলে একটি তেলবাহী জাহাজ জোর করে দখল করে। এটি দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির বিরুদ্ধে চলমান আগ্রাসনের আরেকটি ধাপ। এই আগ্রাসন চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ান সাগরে ছোট নৌকা উড়িয়ে দিয়েছে। সেসব নৌকায় যাত্রীও ছিল। ট্রাম্প দাবি করেছেন, তারা মাদক পাচারকারী। এ দাবি তিনি করেছেন কোনো প্রমাণ ছাড়াই।
ট্রাম্প অতিরঞ্জিত ভাষায় কথা বলেন। বুধবার তিনি বলেন, ‘জব্দ করা জাহাজটি একটি বড় ট্যাংকার, এটি খুব বড়। এটি এখন পর্যন্ত জব্দ হওয়া সবচেয়ে বড় জাহাজ।’ এক সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক জাহাজটির গন্তব্য পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘একটি হেলিকপ্টার নিন এবং জাহাজটির পিছু নিন।’
ভেনেজুয়েলার আকাশপথে উড়তে মানুষ ভয় পেতে পারে। কারণ ট্রাম্প নভেম্বরে একতরফাভাবে ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা পুরোপুরি বন্ধ। তবু এই আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণা একটি বিষয় থামাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র এখনো ভেনেজুয়েলায় নির্বাসন ফ্লাইট চালাচ্ছে। তেলবাহী জাহাজের মূল্যবান তেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্প কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমি ধরে নিচ্ছি আমরা তেল রেখে দেব।’ যুক্তরাষ্ট্র বলে, তারা ভেনেজুয়েলার তেলের দিকে নজর দেয়নি। ফলে এ মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের দাবিকে শক্তিশালী করে না।
তারা দাবি করে, তারা শুধু গোলার্ধকে রক্ষা করতে চায়। তারা ভেনেজুয়েলার অপরাধীদের হুমকির কথা বলে। এসব অপরাধী ফেন্টানিল ও অন্য মাদক পাঠাতে চায়। ট্রাম্পের কল্পনায় এ মাদক সন্ত্রাসের মূল নেতা একজনই। তিনি হলেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ঢোকার প্রায় কোনো সম্পর্কই নেই। কেননা ভেনেজুয়েলা ফেন্টানিল উৎপাদন করে না। এমন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অতীত আচরণ মনে পড়ে। বিশ শতকের শেষদিকে আরেকটি তেলসমৃদ্ধ দেশের সঙ্গে এমন আচরণ হয়েছিল। সে দেশটি ছিল ইরাক। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশ। তিনি ইরাকে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের একটি অভিযান চালান। এ অভিযানের ভিত্তি ছিল গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা অভিযোগ। এখন ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধের কথা শোনা যাচ্ছে। ট্রাম্প কয়েক মাস ধরে এ যুদ্ধের হুমকি দিয়ে আসছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি তা স্বীকার করেছেন।
তাকে নতুন করে ‘যুদ্ধমন্ত্রী’ বলা হচ্ছে। তিনি ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের নাবিকদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধাপরাধের কথা বলেন। তিনি এটিকে ‘যুদ্ধের কুয়াশা’ বলে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ যুদ্ধ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। এটি এ বছরের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আগের ঘটনা। এটি জেলেদের ভয় দেখানোর আগের বিষয়। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্র একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে সমর্থন দেয়। এ অভ্যুত্থান হয়েছিল হুগো চাভেজের বিরুদ্ধে। তিনি ছিলেন মাদুরোর পূর্বসূরি এবং একজন সমাজতান্ত্রিক নেতা। সাম্রাজ্যবাদের জন্য তিনি ছিলেন একটি কাঁটার মতো।
২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ নিষেধাজ্ঞা ছিল খুবই কঠিন।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্সের তথ্য মতে, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এসব নিষেধাজ্ঞায় ৪০ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। যারা অর্থনৈতিক চাপের মারাত্মক প্রভাব নিয়ে সন্দেহ করেন, তাদের একটি কথা মনে রাখা উচিত। ১৯৯৬ সালে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন ম্যাডেলিন অলব্রাইট। তাকে বলা হয়েছিল, নিষেধাজ্ঞায় পাঁচ লাখ ইরাকি শিশু মারা গেছে। তিনি জবাব দেন, ‘আমরা মনে করি এই মূল্য দেওয়া সঠিক।’
২০১৯ সালে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করেন। এর একটি লক্ষ্য ছিল হুয়ান গুইদোকে সাহায্য করা। তিনি ছিলেন একজন ডানপন্থি নেতা, খুব বেশি পরিচিত ছিলেন না। তিনি নিজেকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। তার লক্ষ্য ছিল নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানো। এ প্রচেষ্টাগুলো সফল হয়নি। গুইদো শেষ পর্যন্ত মিয়ামিতে চলে যান। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা ভয়াবহ ক্ষতি করতে থাকে। ২০১৯ সালের মার্চে ট্রাম্পের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সাংবাদিকদের কথা বলেন। তিনি অর্থনৈতিক যুদ্ধের সাফল্য নিয়ে গর্ব করেন। তিনি বলেন, ‘চাপ বাড়ছে। মানবিক সংকট প্রতি ঘণ্টায় বাড়ছে। ভেনেজুয়েলার মানুষ যে ব্যথা ও কষ্ট পাচ্ছে, তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।’ সরকারি বক্তব্য হলো, নিষেধাজ্ঞা ক্ষমতাসীনদের লক্ষ্য করে। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষই এর মূল্য দেয়।
গুইদোর ব্যর্থ আত্মঘোষিত নির্বাচনের পরের বছরগুলোতে এ কষ্ট আরও স্পষ্ট হয়। ২০২০ সালে জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি আলফ্রেড ডি জায়াস একটি হিসাব দেন। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে এক লাখ ভেনেজুয়েলান মারা গেছে। ২০২১ সালে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ আলেনা দৌহান একটি প্রতিবেদন দেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অবরোধের ফলে ২৫ লাখের বেশি মানুষ চরম খাদ্যসংকটে পড়েছে। এর বাইরে আরও সমস্যা ছিল। আগে নিয়ন্ত্রণে থাকা রোগ আবার ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। পানি ও বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেয়। এর মধ্যেই একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে। ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় কথিত মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। একই সময়ে তিনি হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে ক্ষমা করে দেন। তিনি ছিলেন হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট, একজন ডানপন্থি নেতা। তিনি মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত ছিলেন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। অক্টোবরে ট্রাম্প সিআইএকে ভেনেজুয়েলার ভেতরে গোপন অভিযান চালানোর অনুমতি দেন। এই সিআইএ বহুদিন ধরেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এ কথা অনেকেরই জানা। এখন তেলবাহী জাহাজ ছিনতাইয়ের মাধ্যমে প্রশাসন আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, তারা সভ্য কূটনীতির কোনো তোয়াক্কা করে না।
কিছুদিন আগে আমি এক ভেনেজুয়েলান তরুণের সঙ্গে কথা বলি। আমি তার সঙ্গে ২০২৩ সালে দারিয়েন গ্যাপে দেখা করেছিলাম। সে তখন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যাচ্ছিল। তার মতো আরও লাখ লাখ ভেনেজুয়েলান দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। তারা অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার মতো জীবন খুঁজছিল। মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার সময় সে প্রায় নদীতে ডুবে যাচ্ছিল। পরে তাকে আটক করা হয়। সে এক মাস আটক ছিল। তারপর শর্তসাপেক্ষে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে দেওয়া হয়। দুই বছর পরে ক্যালিফোর্নিয়ায় আইসিই এজেন্টরা তাকে ধরে। তাকে আরও কয়েক মাস আটক রাখা হয়। এরপর তাকে কারাকাসে ফেরত পাঠানো হয়।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, ভেনেজুয়েলা নিয়ে ট্রাম্পের বর্তমান কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সে কী ভাবে। সে শুধু বলে, ‘আমার কোনো কথা নেই।’ যুক্তরাষ্ট্র আবারও এক অদ্ভুত যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। এ যুদ্ধ মিথ্যার ওপর দাঁড়ানো। এমন সময়ে সত্যিই অনেক সময় শব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না।
লেখক: দ্য দারিয়েন গ্যাপ বইয়ের রচয়িতা। তিনি নিউইয়র্ক টাইমসসহ বিভিন্ন পত্রিকায় লেখেন। আলজাজিরায় প্রকাশিত এ নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ