

ধরিত্রী ও মানবজাতিকে রক্ষায় করণীয় নিয়ে বিশ্বজুড়ে নিরন্তর আলোচনা হচ্ছে; স্থানীয়, আঞ্চলিক, উপআঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে। আলোচনায় বিশ্বের সাধারণ মানুষসহ নাগরিক সমাজের মধ্যে হতাশা লক্ষণীয়। মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি ও তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর নেতাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্লিপ্ততায় এক অনিবার্য পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ এবং ধরিত্রী। বিশেষ করে সদ্য সমাপ্ত কপ৩০-এ জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন তহবিল ও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত না হওয়ায়, এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থা বলছে, বড় নিঃসরণকারী দেশগুলোর চরম অনীহা ও বিরোধিতায় প্রত্যাশিত অর্জন সম্ভব হয়নি। এমনি অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা ও বিলম্বিত অভিযোজন তহবিল এলডিসি দেশগুলোর জন্য বাড়তি হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে বলে মন্তব্য জলবায়ু বিশ্লেষকদের। শিল্পোন্নত দেশগুলো ডি-কার্বনাইজেশন ত্বরান্বিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এবং পূর্বানুমেয় অভিযোজন তহবিল নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় এ সম্মেলন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, অভিযোজন তহবিলসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাওয়ায় স্বল্পোন্নত দেশগুলো (এলডিসি) মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ, এ দেশগুলো এরই মধ্যে তীব্র জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি।
মনে রাখা দরকার, জলবায়ু অর্থায়নের নিশ্চয়তা ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেই এখনো NDC-০৩ জমা দেয়নি, অথচ তারাই মনিটরিং নিয়ে আলোচনা করছে, যা হাস্যকর। সুনির্দিষ্ট বেসলাইন না থাকায় অর্থায়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো অর্থহীন। অন্যদিকে এবার সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাসের আলোচনা প্রায় নিষিদ্ধ ছিল। জ্বালানি লবির প্রভাবে জলবায়ু আলোচনাগুলো এখন অধিকারভিত্তিক না হয়ে করপোরেটমুখী হয়ে পড়েছে এবং প্রক্রিয়াটি আমলাতান্ত্রিক হয়ে গেছে। তাই সময় এসেছে জলবায়ু ন্যায়ের ভিত্তিতে কপ প্রক্রিয়া পুনর্গঠনের। একই সঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়ের দাবি ও অধিকারভিত্তিক ফ্রেমওয়ার্ক এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাসের দাবিকে অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের জলবায়ু অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে হবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অধিকাংশ জলবায়ু অর্থায়ন আসে ঋণের মাধ্যমে। গবেষণা অনুযায়ী, জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিটি ৫ ডলারের বিপরীতে ৭ ডলার পরিশোধ করতে হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু জলবায়ু ঋণ ৮০ ডলার। তাই ঋণনির্ভর পরিকল্পনা পরিহার করে বাংলাদেশের ‘ব্লু ইকোনমির’ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব অর্থায়ন বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহারের জন্য বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ। জলবায়ু অর্থায়নের স্বচ্ছতা ও প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর দাবি অন্তর্ভুক্ত করে আরও জবাবদিহিমূলক বৈশ্বিক কাঠামো গঠন করা দরকার। যদিও ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলন ঘিরে বিশ্বজুড়ে ছিল ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা। বিশেষ করে অ্যামাজন অঞ্চলে প্রথমবারের মতো এমন উচ্চপর্যায়ের বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনা হওয়ায় আশা করা হয়েছিল, এ সম্মেলন বৈশ্বিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা গেল, বহুক্ষেত্রে অগ্রগতির চেয়ে স্থবিরতা ও আপস-সমঝোতার ছায়াই বেশি ঘনীভূত। বড় বড় নিঃসরণকারী দেশগুলোর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতিতে অনীহা সব মিলিয়ে কপ৩০-এর অর্জনকে শূন্যে নিয়ে গেছে।
নাগরিক সমাজ যারা জলবায়ু ন্যায়বিচার, দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাস, আদিবাসী অধিকার, জীববৈচিত্র্য ও মানবিক সুরক্ষায় কাজ করে, তাদের চোখে কপ৩০-এর এ ফলাফল শূন্য। তাদের মতে, এ সম্মেলন প্রমাণ করেছে বৈশ্বিক নেতৃত্বের অভাব নয়, বরং প্রভাবশালী লবিস্ট গ্রুপগুলোর চাপ এবং জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের রাজনৈতিক প্রভাব আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অনেক দেশ, বিশেষ করে দ্রুত শিল্পায়নশীল রাষ্ট্র, জ্বালানি পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার পক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে পরিবেশবাদী ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশার তুলনায় সিদ্ধান্ত খুবই দুর্বল।
ধনী দেশগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুত ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে অন্তত ২০২৫-এর পর থেকে বছরে ৬০০-৭০০ বিলিয়ন ডলার তহবিলে দিতে হবে। অভিযোজন অর্থায়নকে দ্বিগুণ করতে হবে। সব তহবিল অনুদানভিত্তিক হওয়া উচিত, ঋণ নয়। কোন দেশ কত পাচ্ছে এবং কীভাবে ব্যবহার করছে এ বিষয়ে বৈশ্বিক স্বচ্ছতা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে উল্লেখযোগ্য অর্থ সংগ্রহে বৈশ্বিক কার্বন কর, সমুদ্র পরিবহন কর, বড় দূষণকারী কোম্পানি থেকে অর্থ সংগ্রহে এসব নতুন উৎস থেকে অর্থায়ন করতে হবে। এ তহবিল থকে প্রাপ্ত অর্থ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর হাতে পৌঁছানো দরকার। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও জ্ঞান বিনিময় বাড়ানো বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো বাংলাদেশ, পাকিস্তান, কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাপুয়া নিউগিনিসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বাড়াতে হবে। প্রযুক্তিগত সহায়তা বাধ্যতামূলক করতে হবে। পেটেন্ট শিথিল করা, সবুজ প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বিনিময় কাঠামো তৈরি এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও জ্ঞানের স্বীকৃতি দিতে হবে।
অ্যামাজনসহ বিশ্বের আদিবাসী সম্প্রদায় প্রকৃতি রক্ষার প্রধান অভিভাবক। তাই ভূমির অধিকার সুরক্ষায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরাসরি অংশগ্রহণ, ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে জলবায়ু সমাধানের অংশ করা। অবশ্য এসব তারা ভবিষ্যৎ কপ সম্মেলনে বাধ্যতামূলক করতে চায়। মনে রাখা উচিত, জলবায়ু সংকট শুধু পরিবেশগত নয়; এটি সামাজিক, জীবন-জীবিকা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের সঙ্গে জড়িত। তাই নারী, শিশু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতা, অভিবাসী ও জলবায়ু-উদ্বাস্তুদের ঝুঁকির বিষয়টিকে নীতি প্রণয়নে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
কপ৩০ বহু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কিছু ইতিবাচক বার্তা রেখেছে, যেমন—লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড বাস্তবায়নের চেষ্টা, অ্যামাজন সুরক্ষায় সহযোগিতার অঙ্গীকার কিছুটা হলেও ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু ভবিষ্যতের সমস্যা নয়, এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। প্রত্যাশা ধরিত্রী ও মানবজাতিকে রক্ষায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সরকার, নাগরিক সমাজের জোরালো দাবি ও আন্দোলন ভবিষ্যৎ কপ সম্মেলনগুলোকে কার্যকর, অর্থবহ এবং জনপ্রত্যাশা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম (বিসিসিজেএফ)