কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৫৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষিবিমুখতার অদৃশ্য বিপর্যয়

ড. ইকবাল আহমেদ
কৃষিবিমুখতার অদৃশ্য বিপর্যয়

দেশের সভ্যতার মেরুদণ্ড একসময় ছিল কৃষি। বর্ষার জল, নদীর পলিমাটি, কৃষকের ঘামের সঙ্গে মিশে জন্ম নিত সোনার ধান; সেই ধান দেশের মাটি, অর্থনীতি আর সংস্কৃতিকে সমানতালে ধারণ করত। অথচ আজ মনে হয় আমরা এমন এক সমাজে প্রবেশ করেছি, যেখানে কৃষক-শ্রমিকের ঘামে ভেজা জমির চেয়ে ফেসবুকের স্ক্রলিং অনেক বেশি ‘প্রোডাকটিভ’ বলে বিবেচিত হয়, জমিতে চাষের জ্ঞানের চেয়ে বিদেশে যাওয়ার ভিসা প্রসেসের নিয়ম এখন বেশি পরিচিত। কৃষিভিত্তিক পরিবারের বৃহৎ সম্প্রসারণ আজ যেন অতীতের ফটোগ্রাফ—আলমারিতে বন্দি স্মৃতি। ভেঙে গেছে যৌথ পরিবার, জন্ম নিয়েছে ক্ষুদ্র, বিচ্ছিন্ন, তথাকথিত আধুনিক মাইক্রোপরিবার। যেখানে দাদার হাতে লাঙল আর নাতির হাতে ল্যাপটপের সংলাপের কোনো সুযোগ নেই। সমাজ ক্রমে কৃষিবিমুখ, তরুণরা ক্রমেই বিদেশমুখী আর শস্যক্ষেতের জায়গা নিচ্ছে ইট-পাথরের টাওয়ার—এ যেন আমাদের সময়ের নির্মম সত্য।

কৃষিভিত্তিক বৃহৎ পরিবার ভাঙনের গল্প বাংলাদেশে শুধু সামাজিক পরিবর্তনের কাহিনি নয়; এটি অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীর রূপান্তরেরও প্রতিফলন। একদা কৃষির ওপর ভর করে গড়ে ওঠা পরিবারে ছিল শ্রমের সংহতি—বাবা জমি লাঙল ধরতেন, ছেলে বীজতলা তৈরি করত, মা শস্য শুকাতেন, সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা। কিন্তু আধুনিকতার জোয়ারে পরিবার ছোট হতে হতে একপর্যায়ে পরিণত হয়েছে দুই-তিন সদস্যের ‘পারমাণবিক পরিবারে’। কৃষিকাজ শুধু শ্রম নয়—একের সঙ্গে অন্যের নির্ভরতার বন্ধন। পরিবার ছোট হলে জমির কাজ পরিচালনায় স্বাভাবিকভাবেই দেখা দেয় শ্রম ঘাটতি। ফলত কৃষক অধিক শ্রমিক ভাড়া করতে বাধ্য হয়, এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় আর ফসলের মূল্য বাজারে কম—ফলে লাভের পরিবর্তে লোকসান। লাভ না হলে পরবর্তী প্রজন্মের মনে কৃষির প্রতি উৎসাহ জন্ম নেওয়া তো দূরের কথা, কৃষি তাদের কাছে হয়ে ওঠে দারিদ্র্যের প্রতীক। এমন বাস্তবতায় তরুণরা আর মাটির গন্ধে রোমাঞ্চিত হয় না; বরং মধ্যপ্রাচ্যের রুক্ষ মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলে পাঠায়—‘বাবা, আমি টাকা পাঠাব।’

বিদেশগামী শ্রমিকের এ প্রবাহ—যাকে অর্থনীতিবিদরা একটু কবিত্ব যোগ করে ‘রেমিট্যান্স ইনফ্লো’ বলেন—কৃষিকে আরও দুর্বল করছে। এক সময়ের সক্ষম কৃষক পরিবারের তরুণরা ঋণ নিয়ে দালালের হাতে পাসপোর্ট জমা দেন, ঘরবাড়ি বন্ধক পড়ে, পরিবার লোনে জর্জরিত—এভাবে এক কৃষক পরিবারের শ্রমশক্তি দেশ ছাড়ে। বদলে পরিবার পায় অস্থির ভরসা, বিদেশফেরত অর্থে সুখের স্বপ্ন। কিন্তু গ্রামে মাঠ ফাঁকা হয়, জমি অনাবাদি পড়ে থাকে, বীজ পচে যায়, খালবিল শুকায়। রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা যোগ করে ঠিকই, কিন্তু কৃষিভিত্তিক উৎপাদনশীলতার ধারাবাহিক ক্ষয় ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তোলে। বিদেশি মুদ্রার ঝলকানি কৃষিকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে, যেন খাদ্য আমরা উৎপাদন না করে আমদানিতেই নির্ভর থাকব! প্রশ্ন জাগে—দেশ কি চিরকাল অন্যের ধান ভিজিয়ে ভাত খাবে?

কৃষির অলাভজনক অবস্থা শুধু পারিবারিক পরিবর্তন বা শ্রমের সংকট দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। পেছনে রয়েছে আরও বড় বড় চক্র—বৈশ্বিক বীজ-কার্টেল, রাসায়নিক সার ব্যবসায়ী, ফসলের বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট, যারা কৃষকের উৎপাদিত শস্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করে। বীজ কিনতে গেলে কৃষক জানতে পারে—আগের বছরের দেশি বীজ আর ফোটে না, লাগাতে হবে বহুজাতিক কোম্পানির উন্নত জাতের হাইব্রিড বীজ, যার দাম বেশি, ফলন অনিশ্চিত। কৃষক তাই ঋণ নেন, কিন্তু ঝড়, বন্যা বা বাজারমূল্য কমে গেলে সেই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। কৃষকের ঘর লুট হয়ে যায় বাজারনীতির অদৃশ্য হাতে। আরেকদিকে মধ্যস্বত্বভোগীরা ফসল কিনে মজুত করে, বাজারে সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো যেন তাদের প্রিয় খেলা। কৃষক সে দাম পায় না, নগরবাসী দেয় চড়া মূল্য আর লাভের হাসি হাসে অজ্ঞাত ব্যবসায়ী চক্র!

সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন, যদিও প্রশ্ন তুললে আবার স্মার্ট কৃষিপ্রযুক্তি উন্নয়ন, ডিজিটাল কৃষি প্ল্যাটফর্ম ইত্যাদি শব্দের ফুলঝুরি বেরিয়ে আসার আশঙ্কা থাকে। বাস্তবতা হলো—উৎপাদনশীলতার সত্যিকার সমস্যা সমাধানে নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। কৃষি গবেষণা, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, প্রকৃত কৃষকের জন্য ভর্তুকি, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ—এসবের অধিকাংশ ক্ষেত্রে উদ্যোগ দেখা গেলেও বাস্তবায়ন দুর্বল। কখনো চাষ উপযোগী খালের জায়গায় তৈরি হয় রিসোর্ট, কখনো জলাভূমিতে স্থাপনা নির্মাণ হয় সরকারি-বেসরকারি প্রভাবশালীদের উদ্যোগে; কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় জমি ক্রমেই সংকুচিত। মনে হয় কৃষিপণ্য মাঠ থেকে ওঠানোর আগেই ফাইলের ভেতর আটকে পড়ে যায়—যদি না সরকারের কেউ মনে করিয়ে দেয়, ‘ধান-গমও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অংশ নয় কি?’

তবে এ সংকটকে অপরিবর্তনীয় মনে করার কারণ নেই। গ্রামীণ সমাজকে কৃষিমুখী করার পথ এখনো উন্মুক্ত—শুধু প্রয়োজন দূরদর্শিতা, নীতি-সমন্বয় এবং কখনো কখনো একটু ব্যঙ্গাত্মক স্বীকারোক্তি যে, আমরা কৃষিকে ভুলে গিয়েছিলাম। প্রথমত প্রয়োজন কৃষির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কৃষকের জমি থেকে চাল-কলা-বেগুন-ভুট্টা যে মূল্য নিয়ে শহরে আসে, বাজারে তা দশগুণ বাড়ে; কিন্তু উৎপাদক সেই মূল্য পায় না। সরকার যদি শক্ত হাতে মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ করে এবং কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণে কৃষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, তবে কৃষি পুনরায় লাভজনক পেশায় রূপ নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, কৃষি প্রযুক্তিকরণ প্রয়োজন, কিন্তু তা হওয়া উচিত প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, কম খরচে সেচ, জলবায়ু অভিযোজন প্রযুক্তি—এগুলোর ব্যবহার বাড়লে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। তবে প্রযুক্তি যেন কৃষকের ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করাই হবে মূল নীতি।

তৃতীয়ত, কৃষিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে কৃষিকে আধুনিক পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। কৃষি শুধু জমিতে দাঁড়িয়ে চাষ করা নয়; এর সঙ্গে আছে উদ্যোক্তা হওয়া, মার্কেটিং, সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ, কৃষি-স্টার্টআপ, অ্যাগ্রো-অটোমেশন। বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিশিক্ষাকে চাকরিনির্ভর কাঠামোর বাইরে এনে উদ্যোক্তানির্ভর মডেলে রূপান্তর করা সময়ের দাবি। তরুণরা যদি দেখে—কৃষিও নির্ভরযোগ্য আয়ের পথ, বিদেশপ্রবাস নয় একমাত্র বিকল্প—তবে তারাও মাটির দিকে ফিরবে। এ দেশে মাটির ঘ্রাণ এখনো তরুণের ফুসফুসে পৌঁছায়, শুধু দরকার আত্মবিশ্বাস জাগানোর।

শেষত, গ্রামীণ সংস্কৃতি, স্থানীয় কৃষি-ঐতিহ্য ও পারিবারিক বন্ধনের পুনর্গঠনও জরুরি। যৌথ শ্রমব্যবস্থা, সমবায়ভিত্তিক কৃষি, কমিউনিটি-খামার, বীজ-বিনিময় উৎসব—এগুলো কৃষিকে আবার সামাজিক চেতনায় ফিরিয়ে আনার এক কার্যকর পথ। গৃহস্থের উঠোনে যে আমগাছ একসময় প্রজন্মকে ফল দিত, এখন তা নেই; কিন্তু চাইলে সে আমগাছ আবার লাগানো যায়। আমাদের শুধু মনে রাখতে হবে—‘বাড়ি বড় করলে শহর হয়, কিন্তু খেতে বীজ ফেলা না হলে দেশ হয় না!’

আজ যখন আমরা শহরের আলো ঝলমলে সাইনবোর্ডের নিচে দাঁড়িয়ে আধুনিকতার জয়গান করি, তখন মাটির নিচে সুপ্ত থাকে ক্ষুধার ভবিষ্যৎ। কৃষিকে পেছনে ঠেলে দেওয়া মানে খাদ্যনিরাপত্তাকে দুর্বল করা আর খাদ্যহীন দেশ কখনো উন্নয়নশীল হতে পারে না। তাই প্রশ্ন শুধু কৃষিকে বাঁচানোর নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎকে বাঁচানোর। কৃষিবিমুখ সমাজে খাদ্যসংকট হবে বৈজ্ঞানিক সত্য, ব্যঙ্গ নয়। ব্যঙ্গ শুধু এটাই—আমরা জানি, তবুও ভুলে থাকি। হয়তো একদিন প্যাকেটজাত আমদানি করা চালের গায়ে লেখা থাকবে—‘প্রয়োজনে ফ্রেশ ভাত সার্ভিস।’ তখন আমরা স্মরণ করব, দেশে একসময় ধানের গন্ধ ছিল।

আমাদের দেশের মাটি আজও উর্বর, নদী এখনো বয়ে চলে, কৃষকের হাতে এখনো ক্ষমতা আছে—শুধু প্রয়োজন তাকে আবার সম্মান দেওয়া, লাভের সুযোগ দেওয়া এবং দেশের তরুণকে মাটি চেনানোর। আমরা যদি কৃষিকে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখি, তবে খাদ্যসংকট দূর ভবিষ্যতের আতঙ্ক নয়, বরং ইতিহাসের ভুল চ্যাপ্টার হয়ে থাকবে। কিন্তু যদি অবহেলা অব্যাহত থাকে—তবে কৃষি গবেষণার রিপোর্ট একদিন হয়তো শুধু একটি সতর্ক বার্তায় সীমাবদ্ধ থাকবে—‘কৃষিবিমুখ সমাজ বিনির্মাণে আমরা সফল। এখন খাদ্য কোথা থেকে আনব?’

লেখক: প্রফেসর, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রিয়জন হারানোর শোকে কাতর ব্যক্তিকে এই ৭ কথা বলা উচিত নয়

২০২৫ সালে যুদ্ধে নিহত হয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ মানুষ

মৃত্যুর গুজব ছড়ালেও সুস্থ আছেন অভিনেত্রী তানিয়া বৃষ্টি

স্কুল ফিডিং প্রকল্পে অনিয়ম ও নিম্নমানের খাবার সরবরাহের দায়ে গ্রেপ্তার ২

চলন্ত মাইক্রোবাসে আগুন

‘অবাস্তব কিছু দেখানো হয়নি’ সমালোচনা প্রসঙ্গে নীহা

বিয়ের অনুষ্ঠানে মসজিদে খেজুর ছিটানো যাবে কি

প্রচুর রাগ হলেও শাকিবই আমার রাগ ভাঙায়: বুবলী

তামিম-মোসাদ্দেকে ভর করে অজিদের চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য ছুড়ে দিল টাইগাররা

বিতর্কের মুখে ‘পেদ্দি’ থেকে মুছল জাহ্নবীর আবেদনময়ী দৃশ্য

১০

২ হাজার ২৬৬ কোটি টাকার ৮ প্রকল্প অনুমোদন

১১

১০ লিটার দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনা সমর্থকের ব্রাজিলে যোগদান

১২

ডাকাতি করতে গিয়ে মা-মেয়েকে সঙ্ঘবদ্ধ ‘ধর্ষণ’

১৩

বছরে কতবার পরিষ্কার করা হয় মসজিদে নববী?

১৪

আত্মসমর্পণের পর পাঁচ আ.লীগ নেতা কারাগারে

১৫

সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে রোহিঙ্গা নিহত

১৬

একনেকে ৮ প্রকল্প অনুমোদন

১৭

কিউবায় ১৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প

১৮

পরম আমাকে বিয়ে করেনি বলে তাদের ভীষণ দুঃখ: রাইমা

১৯

চুক্তি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ শুরু

২০
X